ঈমান-আকীদা

মনসূর হাল্লাজ ও ইসলামে তার অবস্থান

সকল প্রশংসা আল্লাহ তা‘আলার জন্য

হাল্লাজের মূল নাম হলো: হুসাইন ইব্নু মনসূর আল-হাল্লাজ।
উপনাম: আবু মুগীস। কেউ কেউ বলেন: আবূ ‘আব্দিল্লাহ্।

সে বড় হচ্ছে ওয়াসিত্ব শহরে। কেউ কেউ বলেন, তাসতুর শহরে। সে একদল সূফীর সাথে চলাফেরা করত। তাঁদের মধ্যে অন্যতম ছিল সাহল আত-তাসতুরী, জুনাইদ, আবুল হাসান আন-নূরী প্রমূখ।

সে অনেক দেশ ভ্রমন করেছিল। তন্মধ্যে মক্কা, খুরাসান ও ভারত অন্যতম। আর ভারত থেকেই সে জাদু শিক্ষা করেন। জীবনের শেষভাগে বাগদাদে অবস্থান করেন এবং সেখানেই তাকে হত্যা করা হয়।

হাল্লাজ ভারত থেকে জাদুবিদ্যা শিক্ষা করে। সে ছিল কুট-কৌশল ও প্রতারণাকারী লোক। সে এ জাদু, প্রতারণা দ্বারা বহু মূর্খ লোকদের ধোঁকা দিয়েছিল এবং তাদেরকে তার দিকে আকর্ষিত করেছিল। এমনকি তারা তার সম্পর্কে ধারণা করতো যে, তিনি সমস্ত আওলিয়াদের মধ্যে সবচেয়ে বড়।

অধিকাংশ প্রাচ্যবিদের নিকট সে একজন গ্রহণযোগ্য ব্যক্তিত্ব এবং প্রচার করে থাকে যে, তাকে অন্যায়ভাবে হত্যা করা হয়েছে। এর কারণ এই যে, তার আকীদা ছিল খৃস্টানদের আকীদা-বিশ্বাসের মত আর সে বলতো খ্রিস্টানদের কথাই। যার বর্ণনা অচিরেই আসছে।

৩০৯ হিজরী সনে তার স্বীকারোক্তি ও তার বিরুদ্ধে অন্যদের সাক্ষ্য অনুযায়ী তাকে কাফির ও যিনদীক (মুনাফিক/নাস্তিক) সাব্যস্ত করে বাগদাদে হত্যা করা হয় এবং তার যুগের সকল আলিম তাকে হত্যা করার ওপর ঐকমত্য পোষণ করেছেন, কারণ সে কুফরি ও নাস্তিক কর্মকাণ্ড করেছিল।

তার কিছু কথাবার্তা নিম্নরূপ:

প্রথমেই সে নবূওয়াতের দাবি করেছিল, তারপর তার এ অবস্থাটি আরো প্রকট হয়ে গেল যে, সে নিজেকে আল্লাহ্ বলে দাবি করে বসলো। আর সে বলতো : আমিই আল্লাহ্। আর তার স্ত্রী ও সন্তানদেরকে তাকে সিজদা করার নির্দেশ দিত। অতঃপর তার স্ত্রী তাকে বললো : সেকি আল্লাহ্ ব্যতীত অন্য কাউকে সিজদা করবে? তখন সে বলল : আসমানে একজন ইলাহ রয়েছে, আর যমীনের অন্য একজন ইলাহ রয়েছে। সে হুলুল ও ইত্তেহাদের কথা বলতো : অর্থাৎ সে বলতো, আল্লাহ তার মধ্যে প্রবেশ করেছে; ফলে আল্লাহ্ ও সে একই সত্ত্বা হয়ে গেছে। নাউযুবিল্লাহ। সে যা বলত তা থেকে আল্লাহ কতই না উঁচু মর্যাদার অধিকারী।

আর এ কারণেই প্রাচ্যবিদগণ তার অনুসারী হয়েছিল; কেননা তারাও হুলুলী বা আল্লাহ মানুষের মধ্যে প্রবিষ্ট হওয়ার আকীদা-বিশ্বাস পোষণ করতো, সে হিসেবে সে হুলুলের ব্যাপারে খৃষ্টানদের আকীদা-বিশ্বাসের অনুগামী ছিল। কারণ, খৃষ্টানরা ‘ঈসা আ. সম্পর্কে এ বিষয়ে বিশ্বাস করতো যে, আল্লাহ্ তা‘আলা ঈসা আলাইহিস সালামের মধ্যে প্রবেশ করেছেন। এ কারণে হাল্লাজ লাহূত তথা ঐশী সত্তা ও নাসূত তথা মানবিক সত্তার কথা বলেছিল যেমনটি খ্রিস্টানরা বলে থাকে। এ ব্যাপারে তার উল্লেখযোগ্য কবিতা হলো :

سبحان من أظهر ناســــوته + سر لاهوته الثاقب
ثم بدأ في خلقه ظاهرا + في صورة الآكل والشـارب

“ঐ সত্ত্বা কতই মহান, যিনি তার গোপন প্রদিপ্ত ঐশী সত্তাকে মানবিক সত্তায় প্রকাশ করেছে। অতঃপর সে তার সৃষ্টিতে প্রকাশিত হলেন, খাদ্যগ্রহণকারী ও পানকারীরূপে।” [নাউযুবিল্লাহ]

যখন ইব্নু খাফীফ নামক সুফীদের মধ্য থেকে একজন সুফী এ কবিতা শুনলেন তখন বললেন: এ কথার বক্তার প্রতি আল্লাহর অভিশাপ পতিত হোক। অতঃপর তাকে বলা হলো : এটি হাল্লাজের কবিতা। তখন তিনি বললেন, যদি এটি তার বিশ্বাস হয় তাহলে সে কাফির।

৩- সে একবার কোনো একজন পাঠকের মুখে শুনতে পেল যে, সে কুর’আন পাঠ করছে। তখন সে বলল : আমিও অনুরূপ রচনা করতে পারি। (নাউযুবিল্লাহ)।

৪- তার উল্লেখযোগ্য কবিতা হলো:

عقد الخلائق في الإله عقائدا + وأنا اعتقدت جميع ما اعتقدوه.

“সৃষ্টিকুল তাদের ইলাহ সম্পর্কে বহু রকমের আকীদা পোষণ করে থাকে, আমি তাদের সকলের আকীদা-ই পোষণ করে থাকি।” [নাউযুবিল্লাহ]

তার এ কথা এবং তার সাথে বনী আদমের মধ্যেকার সকল ভ্রষ্ট-নষ্ট দল ও ফির্কাসমূহের কুফরী আকীদা বিশ্বাসের মত আকীদা পোষণের স্বীকারোক্তি ও তাদের বিশ্বাসের মত বিশ্বাস পোষণ নিঃসন্দেহে এ সবকিছুই কুফরী। তাছাড়া তার এ কথায় রয়েছে স্ববিরোধিতা; যা কোনো বিবেক গ্রহণ করতে পারে না; কীভাবে তাওহীদের বিশ্বাস ও শির্ক এক সাথে থাকতে পারে? [নাউযুবিল্লাহ]।

৫- তার এমন কিছু কথা রয়েছে যা ইসলামের রুকনগুলোকে বাতিল করে দেয় ও তার ভিত্তি বিনষ্ট হয়ে যায়। আর তা হলো সালাত, যাকাত, সাওম ও হজ্জ। [নাউযুবিল্লাহ]

৬- সে বলত: নবী-রাসূলদের আত্মা তার সঙ্গী-সাথী ও ছাত্রদের শরীরে ফিরে এসেছে। আর এ কারণেই তাদের একজনকে সে বলতো: তুমি নূহ, অন্য একজনকে বলতো : তুমি মূসা, অন্যজনকে বলতো : তুমি মুহাম্মাদ। [নাউযুবিল্লাহ]

৭- যখন তাকে হত্যা করার জন্য নিয়ে যাওয়া হলো তখন সে তার সাথী বা ভক্তদেরকে বলল: তোমরা এতে হতাশ হয়ো না। নিশ্চয়ই আমি তোমাদের নিকট ত্রিশদিন পর আবার ফিরে আসবো। অতঃপর তাকে হত্যা করা হলো। কিন্তু সে আর কখনও ফিরে আসেনি।

আর এ কারণেই তার বিভিন্ন কথাবার্তা ও অন্যান্য কার্যক্রমের কারণে তার যুগের আলিমগণ ঐকমত্যে তাকে কাফির ও নাস্তিক বলে আখ্যায়িত করেছেন। এ কারণেই ৩০৯ হিজরী সনে বাগদাদে তাকে হত্যা করা হয়। তাছাড়া সূফীগণের অধিকাংশই তার নিন্দা করেছেন, তারা তাকে তাদের দলের অন্তর্ভুক্ত করতে অস্বীকার করেছেন। যে সকল সূফী তার নিন্দা করেছেন, তন্মধ্যে অন্যতম হচ্ছেন, জুনাইদা আল-বাগদাদী রহ। আর আবুল কাসিম আল-কুশাইরী তার লিখিত গ্রন্থে অনেক সূফী মাশায়েখদের নাম উল্লেখ করলেও তার নাম উল্লেখ করেন নি।

তাকে হত্যা করার জন্য যিনি প্রচেষ্টা চালিয়েছেন, তার বিরুদ্ধে বিচারের ব্যবস্থা করেছেন এবং তাকে তার উচিত শাস্তিদণ্ড হত্যা করার বিধান দিয়েছেন, তিনি হলেন কাযী আবূ ‘উমর মুহাম্মাদ ইবন ইউসুফ আল-মালেকী (রহ.)। উক্ত কাযী সাহেবের প্রশংসায় আল্লামা ইবন কাছীর (রহ.) বলেছেন: তিনি যে একটি বড় ও সঠিক সিদ্ধান্ত দিয়েছেন সেটি ছিল, হুসাইন ইবন মানসূর আল-হাল্লাজকে হত্যা করার জন্য দেওয়া রায়। (আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া, খ. ১১, পৃ. ১৭২।)

এ প্রসঙ্গে শাইখুল ইসলাম ইব্ন তাইমিয়া (রহ.) বলেন : “যে কারণে হাল্লাজ নিহত হলো; যে কেউ হাল্লাজের সে সব মতবাদের প্রতি বিশ্বাস করবে সে মুসলিমদের ঐকমত্যে কাফির ও মুরতাদ বলে বিবেচিত হবে। কেননা মুসলিমরা তাকে হত্যা করছে তার বিশ্বাসে হুলুল ও ইত্তিহাদ এবং নাস্তিকদের মতবাদ থাকার কারণে। যেমন তার কথা : আমি আল্লাহ্। তার আরো কথা হলো: এক ইলাহ আসমানে, অপর ইলাহ যমীনে। … প্রকৃতপক্ষে হাল্লাজ ছিল ভেল্কীবাজ, তার ছিল কিছু জাদু; আর তার দিকে সম্পৃক্ত করা কিছু কিতাব আছে যাতে জাদুর সমাহার রয়েছে। মোটকথা: উম্মতের মধ্যে এ কথায় কোনো বিরোধ নেই যে, যে কেউ বলবে যে মানুষের মধ্যে আল্লাহর অনুপ্রবেশ ঘটে, মানুষ ও আল্লাহ একীভূত হয়ে যায়, মানুষও ইলাহ হতে পারে, আর এটি ইলাহদের একজন, এ জাতীয় বিশ্বাস যে কেউ পোষণ করবে, সে কাফির হিসেবে সাব্যস্ত হবে, তার রক্ত প্রবাহ বৈধ হয়ে যাবে। বস্তুত এ কারণেই হাল্লাজকে হত্যা করা হয়েছে।” (মাজমূ‘ আল-ফাতাওয়া, খ. ২, পৃ. ৪৮০।)।

তিনি আরো বলেন : “আমরা জানি না যে, মুসলিম ইমামদের কেউ হাল্লাজকে ভালো বলেছেন। আলেমগণের কেউ তো নয়ই এমনকি সূফী মাশায়েখদের কেউও নয়। কিন্তু কিছু মানুষ তার ব্যাপারে মত প্রকাশ থেকে বিরত থেকেছে কারণ, তারা তার কার্যক্রম বুঝতে পারে নি। (মাজমূ‘ ফাতাওয়া, খ. ২, পৃ. ৪৮৩।)

এ ব্যাপারে আরো বিস্তারিত জানার জন্য দেখুন:
খতীব আল-বাগদাদী, তারীখু বাগদাদ, খ. ৮, পৃ. ১১২-১৪১;
ইবনুল জাওযী, আল-মুনতাযাম, খ. ১৩, পৃ. ২০১-২০৬;
আয-যাহাবী, সিয়ারু আ‘লামিন নুবালা’, খ. ১৪, পৃ. ৩১৩-৩৫৪;
ইবন কাছীর, আল-বিদায়াহ ওয়ান নিহায়াহ, খ. ১১, পৃ. ১৩২-১৪৪।

আরও পোস্ট

২ টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

Back to top button
Close