শিশু-কিশোর

শিশুরা আল্লাহর বিশেষ নেয়ামত: আইনী ও ইসলামী দৃষ্টিকোণ

শিশু মানব সভ্যতার রক্ষাকবচ। ইসলামী জীবন দর্শনে মানব সন্তান তথা মানব শিশু হচ্ছে মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে বিশেষ নিয়ামত ও আমানত। এ মানবশিশু পৃথিবীর আলোয় আগমনের পূর্ব থেকেই অনেকগুলো মৌলিক অধিকার নিয়ে জন্মলাভ করে। শিশুর অধিকার প্রদান ও সুরক্ষায় ইসলামী আইন ও দর্শন আপোষহীন। আজকের জাতিসংঘ বা বিশ্ববিবেক শিশুদের যে সব অধিকার ও সুরক্ষার সনদ বা নীতি প্রণয়ন নিয়ে ভাবছে- সে সব বিষয় এবং শিশুর জন্য আরো অনেক কল্যাণকর বিষয় নিয়ে ইসলাম ঈসায়ী সপ্ত শতাব্দীতেই পরিপূর্ণ নীতিদর্শন উপস্থাপন করেছে। আজও বিভিন্ন দেশ-জাতি ও সমাজ শিশুর পরিচয় ও বয়সসীমা নির্ধারণ নিয়ে জটিলতায় ঘুরপাক খাচ্ছে। বক্ষ্যমাণ নিবন্ধে শিশুর পরিচয়, আইনী ও ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে প্রামাণ্য পরিচয় তুলে ধরা হয়েছে। এতে মানব সভ্যতার রক্ষাকবচ হিসেবে শিশুর গুরুত্ব, মর্যাদা ও অবস্থান এবং শিশুর অধিকার প্রতিষ্ঠায় ইসলামের বাস্তবানুগ ভূমিকা প্রমাণ করা হয়েছে।

শিশুর পরিচয়:

প্রত্যেক মানবশিশু মহান সৃষ্টিকর্তা আল্লাহ তাআলার পক্ষ হতে পিতামাতা এবং মানবজাতির জন্য নিয়ামত। পৃথিবীতে মানব জাতি আল্লাহ তাআলার প্রতিনিধি। মানব জাতির বংশধারা সুরক্ষার জন্য মানব-মানবীর বৈধ দাম্পত্য জীবনের ফসল হচ্ছে মানবশিশু। এ শিশুরাই মানব সভ্যতার রক্ষাকবচ, মানব প্রজন্মের ভবিষ্যৎ এবং পিতামাতা ও উম্মাহ’র সমৃদ্ধ জীবনের আশার আলো। পবিত্র কুরআনে বলা হয়েছে- ‘ধন-সম্পদ ও শিশু-সন্তান পার্থিব জীবনের শোভা।’ ‘আল-কুরআন, ১৮:৪৬’

এই মানবশিশু ভূমিষ্ঠ হওয়ার পূর্ব থেকেই কতিপয় মৌলিক অধিকার নিয়ে পৃথিবীতে আসে। ইসলাম শিশুর সেই সব অধিকার সুরক্ষায় নিশ্চয়তা প্রদান করে। শিশুর অধিকার প্রদান ও সংরক্ষণে ইসলামী জীবন-বিধান প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। পবিত্র কুরআন ও হাদীসে তথা ইসলামী জীবন-দর্শনে মানব শিশুর জন্মের পবিত্রতা, নিরাপত্তা, প্রতিপালন, শিক্ষা-প্রশিক্ষণ এবং আদর্শ মানবরূপে গড়ে তোলার ওপর সবচেয়ে বেশি গুরুত্বারোপ করেছে। শিশুর অধিকার বিষয়ে আলোকপাত করার পূর্বে এ শিশুর পরিচয় তথা শিশু কাকে বলে বা কত বছর বয়স পর্যন্ত মানব সন্তানকে শিশু বলা হবে সে সম্পর্কে আলোচনা হওয়া প্রয়োজন। শিশু শব্দের আভিধানিক অর্থ- মানুষের শাবক। ‘জ্ঞানেন্দ্রমোহন দাস-এর ‘বাংলা ভাষার অভিধান’ এবং হরিচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘বঙ্গীয় শব্দকোষ’ প্রভৃতিতে শিশু বলতে বোঝানো হয়েছে অনূর্ধ্ব আট কিংবা ষোল বছরের বালক, পরবর্তীকালে সমবয়সী বালক বালিকাসহ অনূর্ধ্ব ১৬ বছরের মনুষ্য সন্তানকে। তবে উইলিয়াম কেরীর ‘Dictionary of Bengali Language’- এ শিশুকে ‘ইনফ্যান্ট’-এর সমার্থক বলা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, Form kk & to go by leaps, a child, an infant, a boy under eight years of age.’’ লিসানুল ‘আরব’ গ্রন্থে শিশু অর্থ করা হয়েছে ‘প্রত্যেক বস্তুর ছোটকে শিশু বলা হয়।’ পরিভাষায়- ‘মায়ের গর্ভ হতে ভূমিষ্ঠ হওয়ার পর থেকে স্বপ্নদোষ হওয়া পর্যন্ত বয়সকালীন মানবসন্তানকে শিশু বলে।’ ‘ইবনে মানযুর, লিসানুল আরব, প্রাগুক্ত, খ, ১১, পৃ. ৪০১’ বিশ্বে সর্বজন স্বীকৃত Shorter Oxford English Dictionary- তে শিশুর অর্থ বলা হয়- Childhood: The state or stage of life a child. The time during which one is a child the time from birth to puberty. ÔÔShorter Oxfort English Dictionary, Vol-1, 15th Edition, A-M, Newyork. Oxford University Press, 1993. P. 394.’’

শিশুর সামগ্রিক সংজ্ঞা নির্ণয়ে ও নিরূপণে জাতীয় নীতি, ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ এবং জাতিসংঘ প্রদত্ত সংজ্ঞায় পার্থক্য দেখা যায়। জাতিসংঘ সনদের ধারা-১ এ ১৮ বছরের কম বয়সী প্রত্যেককেই শিশু হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে। ‘ইসলাম, ড. সৈয়দ মঞ্জুরুল সম্পাদিত, বাংলাদেশের শিশু ও তাদের অধিকার, ঢাকা: ইউনিসেফ বাংলাদেশ, ১৯৭৭, পৃ. ৯।’ তাই শিশু সম্পর্কিত সকল আইন, নীতি ও অনুশীলন এ বয়সের মানব সন্তানের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে। তাই ১৮ বছরের নিচে শিশু; যদি না দেশের আইন আরো কম বয়সের ব্যক্তিকে সাবালক হিসেবে অনুমোদন করে। ‘ক্লাস্টার, রাইটস, শিশু অধিকার, জাতিসংঘ শিশু অধিকার সনদ, ঢাকা: ইউনিসেফ, ১৯৯২, পৃ. ৮।’

বাংলাদেশে জাতিসংঘ প্রদত্ত সংজ্ঞা অনুযায়ী বর্তমান পরিসংখ্যান অনুসারে মোট জনসংখ্যার শতকরা ৪৮ ভাগ শিশু। অর্থাৎ, বাংলাদেশে শিশুর সংখ্যা প্রায় ৫ কোটি ৯৫ লাখ। এ সংজ্ঞা অনুযায়ী শিশু সম্পর্কিত সকল আইন, নীতি ও চর্চা ১৮ বছর বয়স পর্যন্ত সবার ক্ষেত্রে সমানভাবে প্রযোজ্য হবে। কিন্তু বাংলাদেশে তেমনটি হচ্ছে না। এখানে সকল ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবার মত শিশুর কোনো একক সংজ্ঞা নেই। বিভিন্ন নীতি ও আইনের মধ্যে এ সংজ্ঞায় তারতম্য রয়েছে। উদাহরণ স্বরূপ, বাংলাদেশের জাতীয় শিশু নীতিতে কেবল ১৪ বছরের কম বয়সীদের শিশু ধরা হয়েছে। শিশুদের সুরক্ষাদানকারী সংবিধিবদ্ধ আইনসমূহের (যেমন, কাজ সম্পর্কিত) অধিকাংশতেই যে বয়স পর্যন্ত সুরক্ষার ব্যবস্থা হয়েছে তা ১৮ বছরের বেশ নিচের, কোনো কোনো ক্ষেত্রে মাত্র ১১ বছর পর্যন্ত।

আর একটি বিষয় হচ্ছে, বাংলাদেশের সামাজিক সাংস্কৃতিক ধারণা এই যে, ১৮ বছর বয়সের অনেক আগেই শৈশবকালের সমাপ্তি ঘটে। জাতিসংঘ শিশু অধিকার সনদের সঙ্গে এসব অসামঞ্জস্য এবং সংবিধিবদ্ধ বিভিন্ন আইন ও নীতির মধ্যে এ ধরনের অসঙ্গতির অর্থ হচ্ছে, অনেক শিশুই সনদ অনুসারে সুরক্ষা থেকে বঞ্চিত হবে; যদিও তাদের সেটি পাওয়ার কথা। তাছাড়া বাংলাদেশের শিশু বিষয়ক বিভিন্ন নীতি, সংবিধি ও ধর্র্মীয় আইনে দেয়া শিশুদের বয়সভিত্তিক সংজ্ঞার সাথে গরমিল দেখা যায়।

বাংলাদেশে শিশুদেরকে বিভিন্ন বয়স স্তরে (১৮ বছরের অনেক নিচে) কতিপয় নীতি ও বিধির অধীনে নিম্ন বর্ণিত বিশেষ কিছু সুরক্ষা বা সুযোগ-সুবিধা দেয়া আছে। * ৭ বছরের নিচের শিশু : কোনো অপরাধের দায়িত্ব আরোপ করা হয় না। * ৬-১০ বছরের শিশু : সব শিশুকে স্কুলে পাঠানোর বিধান আছে। * ১২ বছরের নিচের শিশু: দোকান, অফিস, হোটেল বা কোনো ওয়ার্কশপের কাজে ব্যবহার করা যাবে না। শিক্ষানবিশ ব্যতীত) * ১৪ বছরে নিচের শিশু : কলকারখানার কাজে ব্যবহার করা যাবে না।   ভবঘুরেদের প্রাপ্ত বয়স্কদের কাছ থেকে পৃথক রাখতে হবে। জাতীয় শিশুনীতির আওতায় অধিকার সংরক্ষিত।* ১৫ বছরের নিচের শিশু: পরিবহন খাতের কয়েকটি অংশের কাজের ব্যবহার করা যাবে না। * ১৬ বছরে নিচের শিশু: সাধারণ কারাগারে আটক রাখা যাবে না। মৃত্যুদ- দেয়া যাবে না। মেয়েরা যৌন মিলনে সম্মতি দিতে পারবে না। * ১৮ বছরের নিচের শিশু : মেয়ের বিবাহ আইনসিদ্ধ হবে না।* ১৮ বছর বয়সে : প্রাপ্তবয়স্ক হিসেবে বিবেচিত হবে। ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারবে। * ২১ বছরের নিচে: ছেলে বিবাহ আইনসিদ্ধ হবে না। * ধর্মীয় আইনের ক্ষেত্রে: বয়ঃসন্ধি লাভের পর থেকেই অর্থাৎ, মেয়েদের ১২ বছর ও ছেলেদের ১৫ বছর বয়সে শৈশবের সমাপ্তি ঘটে। ‘ইসলাম, ড. সৈয়দ মঞ্জুরুল সম্পাদিত, বাংলাদেশের শিশু ও তাদের অধিকার, প্রাগুক্ত, পৃ. ১০।’

জাতিসংঘ প্রদত্ত এবং বাংলাদেশের জাতীয় শিশুনীতির আলোকে শিশুর সাথে ইসলাম প্রদত্ত শিশুর সংজ্ঞায় আপাত দৃষ্টিতে পার্থক্য দেখা যায়। এ পার্থক্যের ক্ষেত্রটি হচ্ছে- ছেলে-মেয়ের বিবাহের বয়স। এরই নিরিখে ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে ছেলে বা মেয়ের বিবাহের জন্য কোনো নির্দিষ্ট বয়স-পরিমাণ আছে কিনা? বিবাহের জন্য কত বয়স হওয়া উচিত? তাছাড়া সরকারি আইনের মাধ্যমে ছেলে-মেয়েদের বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হওয়ার জন্য নিম্নতম বয়সসীমা নির্দিষ্ট করে দেয়ার ব্যাপারে ইসলামের অভিমত কি? আধুনিক সমাজ-মানসে এ এক জরুরি জিজ্ঞাসা। কুরআন, হাদীস ও ফিকহ শাস্ত্রের কিতাবে শিশুর বয়সসীমার সুস্পষ্ট প্রমাণ পাওয়া যায় না। তবে এ বিষয়ে ইসলামের নির্দেশনা খতিয়ে দেয়া যেতে পারে। আয়েশা (রা.)-এর উক্তি থেকে কিছুটা ধারণা লাভ করা যায়। তিনি বলেন- ‘‘রাসূলুল্লাহ (সা.) আমাকে বিবাহ করেন, যখন আমার বয়স মাত্র ‘ছয়’ বছর। আর আমাকে নিয়ে ঘর বাঁধেন যখন আমি ‘নয়’ বছরের মেয়ে। ‘‘মুসলিম, ইমাম, আস-সহীহ, অধ্যায়: বৈরুত, ইহইয়াউত্ তুরাসিল আরাবি, তা, বি, খ,২, পৃ. ১০৩৯।’

আল্লামা বদরুদ্দীন আইনী লিখেন- ‘‘নবী (সা.) ‘আয়েশা (রা.)-কে বিবাহ করেছিলেন যখন তিনি ছোট ছিলেন। তাঁর বয়স ছিল মাত্র ছয় বছর।’ ‘আইনী, বদরুদ্দীন, উমদাতুলকারী, ইউপি: যাকারিয়া বুক ডিপো, ২০০৩, খ. ২০, পৃ. ৭।’
মহানবী (সা.) নিজে যখন আয়েশা (রা.)-কে ‘ছয়’ মতান্তরে ‘নয়’ বছর বয়সে বিবাহ করলেন, এ থেকে স্পষ্ট বোঝা যায়, ইসলামে ছেলে-মেয়ের বিয়ের জন্য কোনো নিম্নতম বয়স নির্ধারণ করা হয়নি। যে কোনো বয়সের ছেলে-মেয়েকে যে কোনো বয়সে বিবাহ দেয়া যেতে পারে।

এ প্রসঙ্গে ‘আল্লামা আইনী (র.) ইবনে বাত্তালের নিম্নোক্ত অভিমত উদ্ধৃত করেন- ‘ইসলামী আইন বিশেষজ্ঞগণ এ ব্যাপারে একমত হয়েছেন যে, পিতার পক্ষে তার মেয়ের বিবাহ দেয়া সম্পূর্ণ জায়েয-বৈধ, সে মেয়ে দোলনায় শোয়া শিশুই হোক না কেন। তবে তাদের স্বামীদের পক্ষে তাদের নিয়ে ঘর বাঁধা কিছুতেই জায়েয হবে না যতক্ষণ তারা যৌন কার্যের জন্য পূর্ণ পুরুষ গ্রহণ ও ধারণ করার সামর্থ্য সম্পন্ন না হচ্ছে।’’ এ প্রসঙ্গে ইমাম নববী (র.) লিখেন: ‘পিতার পক্ষে তার কুমারী (নাবালেগ) মেয়েকে বিবাহ দেয়া জায়েয হওয়ার ব্যাপারে মুসলমানগণ একমত হয়েছেন।’ ‘ইমাম নববী, আবূ যাকারিয়য়্যাহ মহীউদ্দীন ইবনে শারফ, শারহু সহীহ লি-মুসলিম, তা. বি., খ. ১, পৃ. ৪৫৬।’ কাজেই মেয়েদের বা ছেলেদের বিবাহের ব্যাপারে কোনো বয়স নির্দিষ্ট করা যায় না। এ জন্য যে, সব মেয়ে শারীরিক অবস্থা ও দৈহিক শক্তি-সামর্থ্যরে দিক দিয়ে সমান হয় না। এমনকি বংশ-গোত্র, পারিবারিক জীবন-মান ও আবহাওয়ার তারতম্যের কারণে মেয়েদের মধ্যে যথেষ্ট পার্থক্য হয়ে থাকে।

এ কারণে কোনো এক নীতি বা কোনো ধরাবাঁধা কথা এ ব্যাপারে বলা যায় না। কাজেই ছেলে-মেয়ের বিবাহের জন্য কোনো বয়সসীমা নির্দিষ্ট করে দেয়া এবং ঐ নির্ধারিত বয়স সীমার পূর্বে বিবাহ নিষিদ্ধ করে আইন জারি করা মোটেই যুক্তিসঙ্গত হতে পারে না। তাছাড়া বিয়ে বলতে যদি স্বামী-স্ত্রীর যৌন মিলন ও এতদুদ্দেশ্যে ঘর বাঁধা বোঝায়, তাহলে তা তো ছেলেমেয়েদের পূর্ণ বয়স্ক বালেগ-বালেগা অর্থাৎ সাবালক হওয়ার পূর্বে সম্ভব হয় না। তবে বিবাহ বলতে যদি শুধু আক্দ ও ইজাব-কবুল বোঝায় তাহলে তা যে কোনো বয়সেই হতে পারে। এমনকি দোলনায় শোয়া বা দুগ্ধপোষ্য শিশুরও হতে পারে তা পিতা বা বৈধ অভিভাবকের তত্ত্বাবধানে। ইসলামী শরীয়তে এ বিবাহ নিষিদ্ধ নয় এবং এতে অশোভনও কিছু নেই।

বিশিষ্ট ইসলামী চিন্তাবিদ ড. মুস্তফা আস্-সিবায়ী লিখেন: চারটি মাযহাবসহ অন্যান্য মাযহানের ইজতিহাদী রায় হচ্ছে, ‘বালেগ’ (সাবালক) হয়নি- এমন ছোট ছেলে-মেয়ের বিয়ে শুদ্ধ ও বৈধ’। ‘আস্ সিবায়ী, ড. মুস্তফা, আল্-মারআতু বাইনাল ফিকহি ওয়াল কানুনি, তা. বি., পৃ. ৫৭।’

আল-কুরআনের স্পষ্ট ঘোষণা এবং নবী (সা.)-এর যুগে তাঁর উপস্থিতিতে অনুষ্ঠিত ঘটনাবলীর ভিত্তিতে উপরিউক্ত কথার যৌক্তিকতা ও প্রামাণিকতা অনস্বীকার্য। রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর প্রসিদ্ধ একটি হাদীস থেকে শিশুদের মুকাল্লাফ- শরীয়তের বিধিবিধান পালনে বাধ্য-বাধকতার বয়স সীমা সম্পর্কে ইঙ্গিত পাওয়া যায়। ইবাদত করার উপযুক্ত বয়স প্রসঙ্গে রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেন- ‘তোমাদের সন্তানদের সাত বছর বয়সে পদার্পণ করতেই সালাত আদায়ের আদেশ দাও। দশ বছর বয়সে পদার্পণ করে সালাত আদায় না করলে তাদেরকে প্রহার করো এবং তাদের বিছানা পৃথক করে দাও।’ ‘ আবু দাউস, ইমাম, সুলায়মান ইবনে আল-আশ, আস-সুনান অধ্যায়: আস-সালাত, অনুচ্ছেদ : মাতা ইউমারুল গুলাযু বিস-সালাত, আল-কুতুবুস সিত্তাহ, রিয়াদ: দারুস সালাম, ২০০০, পৃ. ১২৫৯ দারুল ফিক্র তা, বি, খ. ১, পৃ. ১৩৩, হাদীস নং ৪৯৫।’

এ হাদীসের বক্তব্য থেকে শরীয়তের দৃষ্টিতে শিশুর নিম্নতম বয়স সাত বছর এবং দশ বছর বলে বোঝা যায়। অর্থাৎ, শিশু শরীয়ত পালনের জন্য মুকাল্লাফ বা দায়িত্বশীল হবে দশ বছর বয়সে। ফিক্হবিদগণের দৃষ্টিতে মেয়ে শিশু বালিগা বা সাবালকে উপনীত হবে- যখন তার হায়েয (মাসিক ঋতুস্রাব) হওয়া শুরু হবে। আর এর নিম্নতম বয়স সীমা বলা হয়েছে কমপক্ষে ‘নয়’ বছর। নয় বছরের পূর্বে যদি কোনো বালিকার ঋতুস্রাব হয় তাহলে তা হায়েয বলে গণ্য হবে না। ‘সম্পাদনা পরিষদ, আলমগীরী, ঢাকা: ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ, তা. বি. খ. ১, পৃ. ৩৬।’ এ ব্যাখ্যা থেকেও মেয়ে শিশুর মুকাল্লাফ হওয়া বা প্রাপ্ত বয়স্ক বা সাবালকত্বের নিম্নতম বয়স ‘নয়’ বছর। শরীয়তের দৃষ্টিতে ছেলে শিশুর সাবালকত্বে পদার্পণের নিদর্শন হচ্ছে দাড়ি-গোঁফ গজানো এবং স্বপ্নদোষ হওয়া। উপরিউক্ত নিদর্শন দেখা গেলে ছেলে-মেয়ে শিশুত্ব থেকে শরীয়তের মুকাল্লাফ হয়ে থাকে অর্থাৎ সাবালকত্ব লাভ হয় এবং শরীয়তের বাধ্যবাধকতা আরোপ হয়। তখন আর যে শিশু শরীয়তের বাধ্যবাধকতার আওতামুক্ত থাকে না। ‘মুমেন, নূরুল, মুসলিম আইন, একাদশ অধ্যায়, ঢাকা: বাংলা একাডেমী, ১৯৯৪, পৃ. ১৪২-১৪৩।’

সাবালকত্বের সীমা নির্ধারণের আলোচনায় ইমাম আবুল হাসান আল-আশআরী ৭টি মতের উল্লেখ করেছেন-

১. শিশুর বুদ্ধির পরিপক্বতা না হওয়া পর্যন্ত সাবালক হয় না। বুদ্ধির উন্মোষের প্রমাণ হচ্ছে মানুষ ও পশুর মধ্যে ক্ষতি ও উপকারের বিষয়ে পার্থক্য বোঝা। তা ছাড়া বিদ্যা অর্জনে সামর্থ্যবান হওয়া।

২. মনীষী মুহাম্মদ ইবনে আব্দুল ওয়াহাব আল-জাযায়েরী বলেন, শিশুর সাবলকত্ব হচ্ছে বুদ্ধির এমন পরিপক্বতা যার দ্বারা যে নিজেকে পাগল যা করে তা থেকে বিরত রাখতে সক্ষম।

৩. বাগদাদের তৎকালীন প-িতগণ বলেন, সুস্থ ও মুকাল্লাফ হওয়া এবং পাগলের পার্থক্য বোঝার সক্ষমতা শরীয়তে শিশুর সাবালকত্বের নিদর্শন।

৪. আল্লামা চুমামা ইবনে আশরাস আন নুমাইরির মতে, মানব শিশু সাবালকত্ব লাভ করে তখন যখন যে ধর্মীয় জ্ঞান অর্জন করতে সক্ষম হয়। অর্থাৎ, সে আল্লাহ, রসূল, কিতাব প্রভৃতি বিষয়ে বুঝতে সক্ষম হয়- তখন সাবালক হিসেবে পরিগণিত হয়। ৫. অধিকাংশ মুতাকাল্লিমীন (যুক্তিবিদ)-এর মতে, মানব শিশুর মধ্যে বুদ্ধির পরিপূর্ণতাই হচ্ছে সাবালকতের প্রমাণ। ৬. অধিকাংশ ফিকহবিদ-এর মতে, দৈহিক ও মানসিক দিক দিয়ে স্বাভাবিক থাকা অবস্থায় তার স্বপ্নদোষ হওয়া শিশুর সাবালকত্বের নির্দশন অথবা তার বয়স ১৫ বছর হওয়া। তবে কোনো কোনো ফিকহবিদ শিশুর সাবলকত্বের বয়স সীমা ১৭ বছর মনে করেন। ৭. কিছু সংখ্যক প-িতের মতে, তার বুদ্ধি অধিকাংশ প্রতিবন্ধকতা দূর না হওয়া পর্যন্ত বয়স ত্রিশ বছর এবং স্বপ্নদোষ হলেও শিশুত্ব হারাবে না। অর্থাৎ, সাবালকত্ব লাভ করবে না। ‘ইবনে ইসমাঈল, আবুল হাসান আলী (মূল), মুহাম্মদ মুহীউদ্দীন ‘আবদুল হামীদ সম্পাদিত, মাকালাতুল ইসরামিয়্যীন ওয়া ইখতিলাফুল মুসাল্লীন, ২৩৫ আর্টিকেল, মাকতাবাতু আন নাহদাতু আল-মিসরিয়্যাহ, আল-কাহেরা: ১৯৬৯, খ. ২, পৃ. ১৭৫।’

ইসলামী শরীয়তবেত্তাদের মধ্যে যেমন ইবনে শোবরুমা ও আল্-বাত্তী অপ্রাপ্তবয়স্ক শিশুর বিবাহের ব্যাপারে আপত্তি করে বলেন, ছোট বয়সের ছেলে-মেয়ের কোনো রকম বিবাহ প্রদান আদৌ বৈধ নয়। আর তাদের অভিভাবকগণ তাদের পক্ষ থেকে উকিল হয়ে যে সব বিবাহ সম্পন্ন করে থাকেন, তা সম্পূর্ণ বাতিল; তাকে বিবাহ বলে ধরাই যায় না। ‘আব্দুর রহীম, মওলানা মুহাম্মদ, পরিবার ও পারিবারিক জীবন, ঢাকা: খায়রুন প্রকাশনী, ১৯৯৩, পৃ. ১৩৯।’

প্রকৃতপক্ষে শরীয়তে বিবাহের আদেশ এবং এ সম্পর্কিত যাবতীয় বিধান, উপদেশ এ কথারই সমর্থক। অপ্রাপ্ত বয়স্ক ছেলে-মেয়েকে বিয়ে দেয়ায় বাস্তবে কোনো কল্যাণ নেই। বরং আছে অনেক জটিলতা, তিক্ত সমস্যা ও বিপর্যয়।

শিশু বয়সের বিবাহের কারণে ছেলে-মেয়েদের জীবনের যে তিক্ত অভিজ্ঞতা লাভ করা গেছে, সেজন্য বর্তমান সমাজ-মানসে যুক্তিসঙ্গতভাবেই এর প্রতি প্রতিরোধ জেগে উঠেছে। এ কাজকে আজ অনেকে ভাল এবং সমর্থনযোগ্য মনে করতে পারছে না। তাই বলে বিবাহের একটা নির্দিষ্ট বয়স ধার্য করা এবং তার পূর্বে বিয়ে অনুষ্ঠানকে আইনের দ্বারা নিষিদ্ধ করে দেয়া; এমনকি যদি কেউ তা করে সংশ্লিষ্ট আইন ভঙ্গকারী ব্যক্তিদের অভিযুক্ত করে জেল-জরিমানার দণ্ডে দণ্ডিত করা ইসলামী শরীয়তের দৃষ্টিতে মোটেই সমর্থনযোগ্য নয়। মানবীয় নৈতিকতার দৃষ্টিতেও এ কাজ সমীচীন নয়। তবে ধর্মীয় নৈতিক মানের অবক্ষয়ের সাথে এবং অন্যান্য পার্শ্ববর্তী সমাজের প্রভাবে মুসলিম সমাজেও বাল্য বিবাহ এমনকি অসম বিবাহ অর্থাৎ, অল্প বয়সের মেয়েকে বুড়ো বয়সের পুরুষের সাথে বিবাহ দেয়ার এবং বিবাহ করার প্রবণতা ব্যাপক আকার ধারণ করেছে। ফলে সমাজে এর বিরূপ প্রভাব এতই বেড়ে যাচ্ছে যে, সমাজের সুস্থতা এবং শিশুমাতা ও তার স্বাস্থ্য সুরক্ষার তাগিদে আইনের সাহায্যে এ কাজকে নিরুৎসাহিত করার দাবি রাখে।

অনুসিদ্ধান্ত:

উক্ত আলোচনা থেকে এ সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া যায় যে, জাতিসংঘ প্রদত্ত শিশুর সংজ্ঞা বলতে এবং বাংলাদেশের বিভিন্ন শিশু আইনের দৃষ্টিতে যা নির্ধারণ করা হয়েছে তা একেবারে অযৌক্তিক নয়। কিন্তু ইসলামের দৃষ্টিতে শরীয়তের মুকাল্লাফ- দায়িত্বশীল হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত ছেলে-মেয়েকে শিশু বলা যাবে। মোট কথা যার ওপর শরীয়তের বাধ্যবাধকতা নেই সেই শিশু।

রাষ্ট্রীয় বিধানে রাষ্ট্র ও সমাজের প্রয়োজনে এবং সমাজের বিপর্যয় ঠেকানোর জন্য এবং শিশু নির্যাতন বন্ধের জন্য যে আইন করা হয়েছে তা সে ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হতে বাধা নেই; যদি তা ঐ সংশ্লিষ্ট বিষয়ের ও কাজের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে। শরীয়তের বিধি-বিধান পালনের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট শিশু আইনের সংজ্ঞা বাধ না সাধলে তাতে কোনো ক্ষতি নেই। অতএব স্পষ্টতই প্রতীয়মান হচ্ছে, বাংলাদেশের সকল ক্ষেত্রে প্রযোজ্য শিশুর বয়সসীমা নির্ধারণকারী একক কোনো আইনের অস্তিত্ব না থাকায় কেউ শিশু কিনা তা নির্ধারণ করতে হলে সংশ্লিষ্ট আইনের নিরিখেই নির্ধারণ করতে হবে।

ইসলামী নীতি দর্শনে শিশুর অবস্থান ও মর্যাদা : আজকের শিশু মানবতার ভবিষ্যৎ, জাতির আগামী দিনের স্থপতি। সুন্দর ও সভ্য জাতি গঠনের জন্য প্রয়োজন এমন সুন্দর পরিবেশ যেখানে জাতির ভবিষ্যৎ স্থপতিগণ সকল সম্ভাবনাসহ সুস্থ, স্বাভাবিক ও স্বাধীন মর্যাদা নিয়ে শারীরিক ও মানসিক, নৈতিক, আধ্যাত্মিক এবং সামাজিকভাবে পূর্ণ বিকাশ লাভ করতে পারে। আল্লাহ তা’আলা মানব জাতিকে অগণিত নিয়ামত দান করেছেন। এসব নিয়ামতের মধ্যে শিশু-সন্তান অন্যতম শ্রেষ্ঠ নিয়ামত। পবিত্র কুরআনে বলা হয়েছে- ‘আল্লাহ তোমাদের জন্য তোমাদের নিজস্ব প্রজাতি থেকেই জুড়ি সৃষ্টি করেছেন এবং তোমাদের সে জুড়ি থেকে তোমাদের জন্য সন্তান-সন্ততি ও পৌত্র-পৌত্রী সৃষ্টি করেছেন। আর তোমাদের দিয়েছেন উত্তম জীবনোপকরণ। তবুও কি তারা মিথ্যাতে বিশ্বাস করবে এবং তারা কি আল্লাহর অনুগ্রহ অস্বীকার করবে? ‘আল-কুরআন, ১৬:৭২।’

একজন নারী এবং পুরুষের বৈধ দাম্পত্য জীবনের আবেগ উচ্ছ্বাসপূর্ণ প্রেম-ভালবাসা পরিপূর্ণতা লাভ করে মানব শিশুর মাধ্যমেই। তাই শিশু-সন্তান হচ্ছে দাম্পত্য জীবনের পুতপবিত্র পুষ্প বিশেষ। ইসলামের দৃষ্টিকোণ থেকে সন্তান আল্লাহ তাআলার সেরা উপহার। সন্তান ঘরের শোভা, খায়ের ও বরকত এবং দীন-দুনিয়ার কল্যাণের বাহন। শিশু-সন্তান পার্থিব জীবনের মান-মর্যাদা বৃদ্ধি করে এবং জীবনের সাহায্যকারী হিসেবে বিবেচিত হয়। তাই শিশুর মর্যাদা ও মূল্য মানবজীবনের সীমাহীন। পবিত্র কুরআনে ব্যাপারটি এভাবে বলা হয়েছে- ‘ধন-সম্পদ ও সন্তান- সন্ততি পার্থিব জীবনের সৌন্দর্য ও সুখ-সমৃদ্ধির বাহন।’ ‘আল-কুরআন ১৮:৪৬।’

আল্লামা আলূসী (র.) এর ব্যাখ্যায় বলেন- ‘ধন-সম্পদ হচ্ছে প্রাণ বাঁচানোর উপায় আর সন্তান-সন্ততি হচ্ছে বংশ সুরক্ষার মাধ্যম।’ ‘আলুসী, শিহাবুদ্দীন মাহমুদ ইবনে আব্দিল্লাহ আজীম ওয়াস আল-হুসাইনী: রূহুল মাআনী, বৈরূত: দারুস সাদির, তা. বি. খ. ১১. পৃ. ১২৭।’ শিশুদের যথার্থ মর্যাদা দানের মধ্যেই নিহিত হয়েছে শিশু অধিকারের নিশ্চয়তা। এ জন্য শিশুর প্রথম ও গুরুত্বপূর্ণ অধিকার হলো তার সঠিক মর্যাদা ও মূল্য অনুধাবন ও নিরূপণ। শিশুর অস্তিত্বকে জীবনের মুসিবত মনে করে বিরক্ত হওয়া উচিত নয়; সন্তানকে নিজের ও মানবতার জন্য আল্লাহর রহমত ও পুরস্কার মনে করা প্রয়োজন।

শিশুর অস্তিত্বের সঠিক মুল্য দিতে না পারলে অন্যান্য অধিকার কখনই আদায় করা যাবে না অথবা অন্যান্য অধিকার আদায়ের সুযোগই পাওয়া যাবে না। কিংবা সুযোগ এলেও তার অধিকার আদায়ে সফল হওয়া যাবে না। কাজেই শিশুর সঙ্গে সঠিক আচরণের জন্য তার যথার্থ মর্যাদা অবগত হওয়া অত্যাবশ্যকীয় বিষয়। পৃথিবীতে অগণিত মানুষ রয়েছে যাদের সম্পদের অভাব নেই, কিন্তু তা ভোগ করার জন্য কোন সন্তান নেই। হাজার চেষ্টা-সাধনা এবং কামনা না করেও বহু সন্তানের পিতা-মাতা, কিন্তু তাদের কাছে যথেষ্ট পরিমাণ সম্পদ নেই। কাজেই কারো সন্তান হওয়া না হওয়া একমাত্র আল্লাহর পক্ষ থেকে নির্ধারণ হয়। এ প্রসঙ্গে কুরআনের ঘোষণা- ‘নভঃজগৎ ও ভূ-জগতের আধিপত্য কেবলমাত্র আল্লাহরই। তিনি যা ইচ্ছা তাই সৃষ্টি করেন। তিনি যাকে ইচ্ছা কন্যা দান করেন এবং যাকে ইচ্ছা পুত্র সন্তান দান করেন। অথবা দান করেন পুত্র ও কন্যা শিশু উভয়ই। আর যাকে ইচ্ছে তাকে করে দেন বন্ধ্যা। তিনি সর্বজ্ঞ, সর্বশক্তিমান।’ আল-কুরআন, ৪২:৪৯-৫০।

লেখকঃ মুহাম্মদ মনজুর হোসেন খান

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

Back to top button
Close