আল-হাদীস

হাদীসের পরিচয় ও প্রকার

ইসলামী জীবন দর্শনের মৌলিক ভিত্তি হচ্ছে আল কুরআন ও আল হাদীস। কুরআন জীবন বিধানের মৌলিক নীতিমালা উপস্থাপন করেছে আর হাদীস সেই মৌলনীতির আলোকে তার ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ করেছে। তাই হাদীস হচ্ছে কুরআনের নির্ভূল ব্যাখ্যা, কুরআনের বাহক বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর পবিত্র জীবন চরিত, কর্মনীতি ও আদর্শ তথা তাঁর কথা, কাজ , হিদায়াত ও উপদেশবলীর বিস্তৃত উপস্থাপনা। নিম্নে হাদীস সম্পর্কে আরেকটু বিস্তারিত ভাবে আলোকপাত করা হল।

হাদীসের পরিচয়:

(حديث) হাদীস শব্দটি বাবে تفعيل  এর মাসদার। حديث এর আভিধানিক অর্থ- নতুন কথা, বাণী, সংবাদ, খবর, অস্তীত্বহীন জিনিসের অস্তিত্ব লাভ, স্বপ্নকালীন কথা, ব্যাপার, বিষয় এবং চিরন্তনের বিপরীতে নশ্বর।

ইসলামী পরিভাষায় হাদীস হচ্ছে- সাধারণভাবে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর যে কথা, কাজের বিবরণ কিংবা কথা ও কাজের সমর্থন ও অনুমোদন বিশ্বস্ত ও নির্ভরযোগ্য সূত্রে প্রমাণিত, ইসলামী শরীআতে তা ‘হাদীস’ নামে অভিহিত হয়।

হাদীসবিশারদ ইমাম সাখাভী হাদীসের পারিভাষিক সংজ্ঞা হিসেবে উল্লেখ করেন যে-

قَوْلُ رسول الله صلي الله عليه وسلم وفعله وتقريره وصفته حتي الحركات والسكنات في اليقظة والنوم.

হাদীস বলতে বুঝায় রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কথা, কাজ, সমর্থন-অনুমোদন এবং তাঁর গুণ, এমনকি জাগরণ ও নিদ্রাবস্থায় তাঁর গতিবিধি এবং তৎপরতাও  হাদীসের অন্তর্ভুক্ত।

পরবর্তিকালে সাহাবা, তাবিঈ ও তাবে তাবিঈদের কথা, কাজ এবং সমর্থনকেও হাদীস বলা হত। যেমন- হাফেজ ইবনে হাজর আসকালানী বলেন-

إن كثيرامن المقدمين كانوا يطلقون اسم الحديث علي ما يشتمل آثارا الصحابة والتابعين وتابعهم.

পূর্বকালের মনীষীগণ সাহাবা, তাবিঈন ও তাবে তাবিঈনদের মুখের কথা ও কাজের বিবরণ এবং তাদের ফতোয়াসমূহের ওপর হাদীস নাম ব্যবহার করতেন।

হাদীসের প্রকারভেদ:

হাদীসমূহকে সংজ্ঞাগত, বর্ণনাগত এবং বিষয়বস্তুগতভাবেও ভাগ করা হয়েছে।

সংজ্ঞাগতভাবে হাদীস তিন প্রকার:

১। নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মুখ নিঃসৃত কথা বা বাণীকে قَوْلِيْ ‘কওলী’ হাদীস বলা হয়।
২। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাজ, কর্মপন্থা ও বাস্তব আচরণকে  فِعْلِيْ ‘ফিইলী’ হাদীস বলা হয় ।
৩। আর তা সমর্থন ও অনুমোদনপ্রাপ্ত বিষয়গুলোকে বলা হয়  تقريري ‘তাকরীরী’ হাদীস ।

হাদীসের বর্ণনাগত প্রকারভেদ ও হাদীসশাস্ত্রের কতিপয় পরিভাষা:

হাদীস বিশারদগণ বর্ণনাগতভাবে হাদীসমূহকে বিভিন্ন শ্রেণীতে বিভক্ত করেছেন।
নিম্নে ধারাবাহিকভাবে সেগুলো উলেখ করা হলো:

১. খবরে মুতাওয়াতিরঃ সেসব হাদীসকে খবরে মুতাওয়াতির বলা হয়, প্রতিটি যুগেই যে হাদীসগুলোর বর্ণনাকারীদের সংখ্যা ছিল এতো অধিক, যাদের মিথ্যাচারের মতৈক্য হওয়া স্বাভাবিকভাবেই অসম্ভব।
২. খবরে ওয়াহিদঃ সেসব হাদীসকে খবরে ওয়াহিদ বলে, যেগুলোর বর্ণনাকারীদের সংখ্যা মুতাওয়াতির পর্যায়ে পৌঁছায়নি। হাদীস বিশারদগণ এরুপ হাদীসকে তিনভাগে ভাগ করেছেন।
৩. মশহুরঃ যে বর্ণনাকারী সাহাবীর পরে কোনো যুগে যে হাদীসের বর্ণনাকারীর সংখ্যা তিনের কম ছিল না।
৪. আযীযঃ যে হাদীসের বর্ণনাকারী সংখ্যা কোনো যুগেই দুই-এর কম ছিল না।
৫. গরীবঃ যার বর্ণনাকরীর সংখ্যা কোনো কোনো যুগে একে এসে পৌঁছেছে।
৬. মারফুঃ যে হাদীসের বর্ণনাসূত্র (সনদ) রাসূলুলাহ সালালাহু আলাইহি ওয়াসালাম পর্যন্ত পৌঁছেছে তাকে হাদীসে মারফূ’ বলে।
৭. মাওকুফঃ যে হাদীসে বর্ণনা পরস্পরা (সনদ) সাহাবী পর্যন্ত এসে স্থগিত হয়ে গেছে তাকে হাদীসে মাওকুফ বলে।
৮. মাকতুঃ যে হাদীসের সনদ তাবেয়ী পর্যন্ত এসে স্থগিত হয়েছে তাকে মাকতু বলে।
৯. মুত্তাসিলঃ শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত উপর থেকে নিচ পর্যন্ত যে হাদীসের সনদ বা বর্ণনাকারীদের ধারাবাহিকতা সম্পূর্ণ অক্ষুন্ন থেকেছে এবং কোন পর্যায়ে কোন বর্ণনাকারী অনুকল্লেখিত থাকেনি এরূপ হাদীসকে হাদীসে মুত্তাসিল বলে।
১০. মুনকাতিঃ যে হাদীসের বর্ণনাকরীদের ধারাবাহিকতা অক্ষুন্ন না থেকে মাঝখান থেকে কোনো বর্ণনাকারীর নাম উহ্য বা লুপ্ত রয়ে গেছে তাকে হাদীসে মুনকাতি বলে।
১১. মু’আল্লাকঃ  সনদে কোনো বর্ণনাকারীর নাম পড়লে এবং তা যদি প্রথমদিকে হয় অর্থাৎ সাহাবির পর যদি এক বা একাধিক ব্যক্তির নাম বাদ পড়ে তবে তাকে মু’আল্লাক বলা হয়।
১২. মু’দালঃ যে হাদীসে ধারাবাহিকভাবে দুই বা তদুর্রধ বর্ণনাকারী উহ্য থাকে তাকে মু’দাল বলে।
১৩. শাযঃ ঐ হাদীসকে শায বলে যার বর্ণনাকারী বিশ্বস্ত বটে, কিন্তু হাদীসটি তার চাইতে অধিক বিশ্বস্ত বর্ণনাকারীর বর্ণনার বিপরীত।
১৪. মুনকার ও মা’রূফঃ  কোন দুর্বল বর্ণনাকারী যদি কোন বিশ্বস্ত বর্ণনাকারীর বর্ণনার বিপরীত হাদীস বর্ণনা করে, তবে দুর্বল বর্ণনাকারীর হাদীসকে ‘মুনকার’ এবং বিশ্বস্ত বর্ণনাকারীর হাদীসকে মা’রূফ বলে।
১৫. মুয়ালালঃ যে হাদীসের সনদে এমন ত্রু’টি থাকে যা কেবল হাদীস বিশারদগণই পরখ করতে পারেন। এ ধরনের ত্রু’টিপূর্ণ হাদীসকে মুয়ালাল বলে।
১৬. সহীহঃ যে হাদীসের সনদে নিম্নোক্ত বৈশিষ্ট্যসমূহ থাকে, তাকে সহীহ হাদীস বলে  ১) মুত্তাসিল সনদ, ২) বিশ্বস্ত ও নির্ভরযোগ্য বর্ণনাকারী ৩) স্বচ্ছ স্মরণশক্তি ৪) শায নয় এবং ৫) মুয়ালাল নয়।
১৭. মাতরুকঃ যে হাদিসের বর্ণনাকারী হাদিস বর্ণনার ক্ষেত্রে নয়, বরং সাধারণ কাজ-কর্মে মিথ্যার আশ্রয় গ্রহণ করে তার বর্ণিত হাদীসকে মাতরুক বলা হয়। এ ধরনের হাদিস পরিত্যাজ্য।
১৮. মুরহামঃ যে হাদিসের বর্ণনাকারীর পরিচয় পূর্ণভাবে পাওয়া যায়নি, ফলে তার দোষগুণ সম্পর্কেও সঠিকভাবে জানা যায়নি, এরূপ বর্ণিত হাদিসকে হাদিসে মুরহাম বলা হয়।
১৯. মাওযুঃ যে হাদিসের বর্ণনাকারী জীবনে কখনো ইচ্ছাকৃতভাবে রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর নামে মিথ্যা কথা রচনা করেছে বলে প্রমাণিত তার বর্ণিত হাদিসকে ‘মাওযু’ বলা হয়। এসব হাদিস গ্রহণযোগ্য হবে না।
২০. জাঈফঃ যে হাদিসের বর্ণনাকারী কোনো হাসান হাদিস বর্ণনাকারীর গুণসম্পন্ন নয়, তাকে জাঈফ হাদিস বলা হয়।
২১. মুরসালঃ যে হাদিসের সনদে কোনো সাহাবির নাম বাদ পড়েছে এবং তাবেঈ সরাসরি রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) থেকে হাদিসটি বর্ণনা করেছেন, তাকে হাদিসে মুরসাল বলা হয়।
২২. শাহিদা ও মুতাবিঃ  এক বর্ণনাকারীর বর্ণনার অনুরূপ যদি অন্য বর্ণনাকারীর কোনো বর্ণনা পাওয়া যায়, তবে দ্বিতীয় জনের বর্ণিত হাদিসটিকে মুতাবি বলা হয়। যদি উভয় হাদিসের মূল বর্ণনাকারী একই ব্যক্তি না হন, তবে দ্বিতীয় বর্ণনাকারীর হাদিসকে শাহিদ বলা হয়।
২৩. মুদরাজঃ যে হাদিসের মধ্যে বর্ণনাকারী নিজের অথবা অপরের উক্তিকে প্রক্ষেপ করেছেন, সে হাদিসকে মুদরাজ বলা হয়। প্রক্ষেপ করাকে ইদরাজ বলা হয়। ইদরাজ হারাম। ইদরাজ দ্বারা যদি কোনো শব্দ বা বাক্যের অর্থ বুঝা যায় এবং তা সহজে চিহ্নিত করা যায়, তাতে কোন দোষ নেই।
২৪. মুদাল্লাসঃ যে হাদিসের বর্ণনাকারী আপন শায়খের নাম উল্লেখ না করে তার ঊর্ধবতন শায়খের নামে এমনভাবে হাদিস বর্ণনা করেদ যেন তিনি উর্ধবতন শায়খের নিকট থেকেই হাদিসটি শ্রবণ করেছেন, অথচ তিনি তার নিকট থেকে হাদিসটি শ্রবণ করেননি। এ ধরনের হাদিসকে মুদালাস বলা হয়।
২৫. তালিকাঃ কোনো কোনো গ্রন্থকার কোনো হাদিসের পূর্ণ সনদকে বাদ দিয়ে শুধুমাত্র হাদিসটিকেই তথা মতনগুলো বর্ণনা করেছেন। এরূপ করাকে তালিক বলা হয়।
২৬. মুজতারাবঃ যে হাদিসের বর্ণনাকারী হাদিসের মতন বা সনদকে বিভিন্নভাবে গোলমাল করে বর্ণনা করেছেন, সে হাদিসকে মুজতারাব বলা হয়।
২৭. সনদঃ হাদিসের মূল কথাগুলো যেই সূত্র পরম্পরায় হাদিস গ্রন্থ সঙ্কলকের কাছে পৌছেছে, তাকে সনদ বলা হয়। অর্থাৎ হাদিসের বর্ণনাকারীদের ধারাবাহিক ক্রমকে সনদ বলা হয়। অন্যভাবে, যে মাধ্যমে হাদিসের মতনে পৌছা যায়, তাকে সনদ বলা হয়।
২৮. মতনঃ হাদিসের মূল কথাকে মতন বলা হয়। অন্যভাবে, হাদিসের মূলকথা ও তার শব্দ সমষ্টিকে মতন বলা হয়।
২৯. রিওয়ায়াতঃ হাদিস বর্ণনা করাকে রিওয়ায়াত।
৩০. রাবিঃ  যে হাদিস বর্ণনা করে, তাকে রাবি বলা হয়। রাবি শব্দের অর্থবর্ণনাকারী।
৩১. রিজ্বালঃ  হাদিসের রাবি তথা বর্ণনাকারীগণের সমষ্টিকে রিজ্বাল বলা হয়। আর যে শাস্ত্রে রাবিগণের জীবনী লেখা থাকে, তাকে আসমাউর রিজ্বাল’ বলা হয়।
৩২. হাকিমঃ  যিনি সমস্ত হাদিস মুখস্থ বা আয়ত্ত করেছেন, তাকে হাকিম বলা হয়।
৩৩. হুজ্জাতঃ  যিনি সনদ ও মতন সহকারে তিন লাখ হাদিস মুখস্থ করেছেন, তাকে হুজ্জাত বলা হয়।
৩৪. হাফিজঃ  যিনি সনদ ও মতন সহকারে এক লাখ হাদিস মুখস্থ করেছেন, তাকে হাফিজ বলা হয়।
৩৫. শায়খঃ  যিনি হাদিস শিক্ষা দেন, তাকে শায়খ বলা হয়।
৩৬. শায়খাইনঃ  সাহাবাগণের মধ্যে হজরত আবু বকর (রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু) ও হজরত উমর (রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু)-কে একত্রে শায়খাইন বলা হয়। হাদিসশাস্ত্রে ইমাম বুখারি (রহমাতুল্লাহ আলাই) ও ইমাম মুসলিম (রহমাতুল্লাহ আলাইহ)-কে একত্রে শায়খাইন বলা হয় এবং ফিকহশাস্ত্রে ইমাম আবু হানিফা (রহমাতুল্লাহ আলাইহ) ও আবু ইউসুফ (রহমাতুল্লাহ আলাইহ)-কে একত্রে শায়খাইন বলা হয়।
৩৭. মুহাদ্দিসঃ যে ব্যক্তি হাদিস চর্চা করেন এবং বহু সংখ্যক হাদিসের সনদ ও মতন সম্পর্কে বিশেষ জ্ঞান রাখেন, তাকে মুহাদিস বলা হয়।
৩৮. সাহাবিঃ যে ব্যক্তি ঈমানের সাথে রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর সাহচর্য লাভ করেছেন বা তাকে দেখেছেন এবং তাঁর একটি হাদিস বর্ণনা করেছেন অথবা জীবনে একবার তাঁকে দেখেছেন এবং ঈমানের সাথে মৃত্যুবরণ করেছেন, তাকে সাহাবি বলা হয়।
৩৯. তাবেঈঃ যিনি রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর একজন সাহাবিকে জীবনে অন্তত একবার দেখেছেন ঈমান অবস্থায় এবং ঈমানদার অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেছেন, তাকে তাবেঈ বলা হয়।
৪০. সুন্নাহঃ সুন্নাহ শব্দের অর্থ চলার পথ, কর্মের নীতি ও পদ্ধতি। যে পন্থা ও রীতি মহানবী (সাল্লাল্লাহূ আলাইহি ওয়াসাল্লাম) অবলম্বন করতেন তাই সুন্নাহ। অন্যভাবে, রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) কর্তৃক প্রচারিত যে উচ্চতম আদর্শ, তাই সুন্নাহ। ফিকহশাস্ত্রের পরিভাষায়, ফরজ ও ওয়াজিব বাদে ইবাদাতরূপে যা করা হয়, তাই সুন্নাত।
৪১. সহিহ লিজাতিহিঃ এমন খবরে ওয়াহেদকে সহিহ লিজাতিহি বলা হয় যার সনদ মুত্তাসিল, বর্ণনাকারীগণ ন্যায়পরায়ণ ও পূর্ণমাত্রায় ধারণশক্তিসম্পন্ন।
৪২. হাসান লিজাতিহিঃ যে হাদিসের সনদ মুত্তাসিল তবে বর্ণনাকারী কম ন্যায়পরায়ণ ও কম স্মরণশক্তিসম্পন্ন এবং হাদিস মুয়াল্লাল ও শাজমুক্ত সে হাদিসকে হাসান লিজাতিহি বলা হয়।
৪৩. সহিহ লিগায়রিহিঃ সহিহ হাদিসের কোনো রাবির মধ্যে স্মরণশক্তি কিছুটা কম থাকলে, তাকে সহিহ লিগায়রিহি বলা হয়। তবে এ অভাব অন্যভাবে বা অধিক বর্ণনা দ্বারা পূরণ হয়ে যায়।
৪৪. হাসান লিগায়রিহিঃ ঐ দুর্বল হাদিসকে হাসান লিগায়রিহি বলা হয়, যা বিভিন্নভাবে বর্ণিত হয়ে বর্জনের বিপরীতে গ্রহণযোগ্যতা লাভ করেছে।
৪৫. শাজ ও মাহফুজঃ যে হাদিসের বর্ণনাকারী কোনো বিশ্বস্ত বর্ণনাকারীর বর্ণনার বিপরীত হাদিস বর্ণনা করে তাকে শাজ বলে। আর যে হাদিসে কোনো বিশ্বস্ত বর্ণনাকারী তার থেকে অধিক বিশ্বস্ত বর্ণনাকারীর বিপরীত হাদিস বর্ণনা করে, তাকে মাহফুজ বলে।
৪৬. মুয়াল্লালঃ ঐ হাদিসকে মুয়াল্লাল বলা হয়, যাতে আপাতদৃষ্টিতে কোনা দোষ-ত্রুটি পরিলক্ষিত হয় না। পক্ষান্তরে, হাদিসের সনদ বা মতনে দোষ-ত্রুটি থেকে যায়, যা হাদিস বিশারদ ছাড়া বুঝতে পারে না।
৪৭. মাকলুবঃ বর্ণনাকারীর নাম বা হাদিসের মতনে কোনো শব্দাবলি আগে পরে হলে, তাকে মাকলুব বলে।
৪৮. মুসাহহাফ ও মুহাররফঃ হাদিসের সনদ ও মতনে নোক্তার কারণে কোনো পরিবর্তন হলে,  তাকে মুসাহহাফ বলে। অপরদিকে আকৃতি পরিবর্তনের মাধ্যমে কোনো পরিবর্তন হলে, তাকে মুহাররফ বলে।
৪৯. আল-জামেঃ  যে হাদিসের কিতাবে হাদিসমূহকে বিষয় অনুসারে সাজানো হয়েছে এবং যাতে, ১। আকায়েদ, ২, ইতিহাস, ৩. তাফসির, 8. ফেতান, ৫ .আদব, ৬. আহকাম, ৭. আত্মশুদ্ধি, ৮. জীবনী-এ আটটি প্রধান অধ্যায় রয়েছে, তাকে জামে গ্রন্থ বলে।
৫০. সুনানঃ  যে হাদিসের কিতাবে হাদিসসমূহকে বিষয় অনুসারে সাজানো হয়েছে এবং যাতে পবিত্রতা, নামায, রোজা প্রভৃতি আহকামের হাদিসসমূহ সংগ্রহের প্রতি বিশেষভাবে লক্ষ্য রাখা হয়েছে, তাকে সুনান বলা হয়। যেমনঃ ১. সুনানে আবু দাউদ শরিফ, ২. সুনানে ইবনে মাজাহ শরিফ।
৫১.মুসনাদঃ যে কিতাবে হাদিসসমূহকে সাহাবিগণের নামানুসারে সাজানো হয়েছে এবং এক সাহাবি হতে বর্ণিত হাদিসসমূহকে পৃথক পৃথক অধ্যায়ে স্থান দেয়া হয়েছে, তাকে মুসনাদ বলা হয়। যেমন : মুসনাদে ইমাম আহমাদ।
৫২. মুজামঃ যে কিতাবে হাদিসসমূহকে ওস্তাদগণের নামানুসারে সাজানো হয়েছে, তাকে মুজাম বলা হয়। যেমনঃ মুজামে তাবরানি।
৫৩. রিসালাহঃ যে ক্ষুদ্র কিতাবে মাত্র এক বিষয়ের হাদিসসমূহ অথবা শুধুমাত্র একজন রাবির বিভিন্ন হাদিসসমূহ বর্ণিত, তাকে রিসালাহ বলা হয়। যেমন:“কিতাবুত তাওহিদা”। ৫৪. সিহাহ-সিত্তাহঃ  বুখারি শরিফ, মুসলিম শরিফ, তিরমিযি শরিফ, আবু দাউদ শরিফ, নাসাঈ শরিফ ও ইবনে মাজাহ শরিফ-এ ছয়টি বিশুদ্ধ হাদিস গ্রন্থকে একত্রে “সিহাহ-সিত্তাহ’ বলা হয়।
৫৫. মুত্তাফাকুন আলাইহিঃ যে হাদিসটি সহিহ বুখারি ও সহিহ মুসলিম শরিফে স্থান পেয়েছে, তাকে ‘মুত্তাফাকুন আলাইহি’ বলা হয়।
৫৬. সহিহানঃ বুখারি ও মুসলিম শরিফকে একত্রে সহিহান বলা হয়।
৫৭. সুনানে আরবাআঃ আবু দাউদ, তিরমিজি, নাসাঈ ও ইবনে মাজাহ শরিফকে একত্রে সুনানে আরবাআ বলে।
৫৮. আদালতঃ যে সুদৃঢ় শক্তি মানুষকে তাকওয়া ও শিষ্টাচার অবলম্বন এবং মিথ্যা আচরণ থেকে বিরত রাখে, তাকে আদালত বলা হয়। আর এসব গুণাবলি যার মধ্যে থাকবে তাকে আদিল বলা হয়।
৫৯. যাবতুঃ যে স্মৃতিশক্তি দ্বারা মানুষ শ্রুতি বা লিখিত বিষয়কে বিস্তৃতি বা বিনাশ থেকে রক্ষা করতে সক্ষম হয় এবং যখন খুশি তা সঠিকভাবে স্মরণ করতে পারে, তাকে যাবতু বলা হয়।
৬০. সিকাহঃ যে বর্ণনাকারীর মধ্যে আদালত ও যাবতু পূর্ণভাবে বিদ্যমান থাকে, তাকে সিকাহ বলা হয়।
৬১. আল-মুসতাদরাকঃ যেসব সহিহ হাদিস সিহাহসিত্তায় স্থান পায়নি সেসব হাদিস যে গ্রন্থে স্থান পায়, তাকে মুসতাদরাক বলা হয়। যেমন- ইমাম হাকিম নিশাপুরী (রহমাতুল্লাহ আলাইহ)-এর আল-মুসতাদরাক।
৬২. আল-মুতাওয়াচ্ছিতুন:  পাঁচশত থেকে এক হাজার পর্যন্ত হাদিস বর্ণনাকারীগণকে মুতাওয়াচ্ছিতুন বলা হয়।
৬৩. আল-মুকিল্লুনঃ একশত থেকে পাঁচশত পর্যন্ত হাদিস বর্ণনাকারীগণকে আল-মুকিল্লুন বলা হয়।
৬৪. আল-মুকাচ্ছিরুনঃ এক হাজারের বেশি হাদিস বর্ণনাকারীগণকে আল-মুকাচ্ছিরুন বলা হয়।
৬৫. হাদীসে কুদসীঃ  মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রত্যক্ষ ওহী ব্যতীত গোপন ওহীরূপে আল্লাহর নিকট হতে সরাসরি বর্ণনা করতেন; যার ভাষা ছিল রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের, কিন্তু ভাব আল্লাহর। একে “হাদীসে কুদসী” বলা হয়। যেমন-

قال رسول الله صلي الله عليه وسلم قال الله تعالي: الصوم لي وأنا أجزي به

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বাণী প্রদান করেনঃ মহান আল্লাহ তা’আলা বলেছেন, “রোজা আমার জন্য, আমিই এর প্রতিদান দেব।”

হাদীসের অন্যান্য নাম:

হাদীসকে সুন্নাহ, খবর এবং আছারও বলা হয়।

সুন্নাহঃ  সুন্নাহ (سُنّة)হচ্ছে পদ্ধতি, পথ তথা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর তরীকা বা পদ্ধতি। আল-কুরআনের তথা মহান আল্লাহর প্রদত্ত আদেশ-নির্দেশ ও নিষেধসমূহের ব্যক্তি, সমাজ, রাষ্ট্র ও আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে কার্যকর করার জন্য রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যে পদ্ধতি অবলম্বন করেছেন তাই হচ্ছে সুন্নাহ।
আব্দুল হক মুহাদ্দিস দেহল্ভী রহমাতুল্লাহ আলাইহি বলেন- রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছ থেকে যা কিছু ( জীবন চলার যে পদ্ধতি) এসেছে তা-ই সুন্নাত।

খবরঃ  খবর (خَبَر) শব্দের অর্থ- সংবাদ। হাদীসসমূহকে আরবি ভাষায় খবরও বলা হয়। কিন্তু খবর শব্দটি হাদীস অপেক্ষা ব্যাপক অর্থবোধক। খবর শব্দটি দ্বারা একই সাথে হাদীস ও ইতিহাস উভয়কেই বুঝায়।

কারো কারো মতে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কথা, কাজ ও মৌনসম্মতিকেই খবর বলে, যা হাদীসেরই নামান্তর। আবার কারো কারো মতে সাহাবী ও তাবেয়ীদের কথা, কাজ ও মৌনসম্মতিকে খবর বলা হয়।

আছারঃ আছার (آثار) বলতে সাহাবী ও তাবেয়ীদের কথা, কাজ, সমর্থন ও অনুমোদনকে বুঝায়। কিন্তু কেউ কেউ রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাহাবী ও তাবেয়ীদের কথা, কাজ, সমর্থন ও অনুমোদনকে আছার বলে অভিহিত করেছেন।

ওয়েব সম্পাদনা: মুফতি যাকারিয়্যা মাহমূদ মাদানী
প্রধান গবেষক, আস-সুন্নাহ ফাউন্ডেশন
সম্পাদক, ভয়েস অব ইসলাম ও ডেইলি মাই নিউজ।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

Back to top button
Close