তাওবা ও ইস্তিগফার

তাওবা: গুরুত্ব, তাৎপর্য ও ফযিলত

আল্লাহ তাআলার দরবারে বান্দার তাওবা করা অধিক পছন্দনীয়। মানুষ অপরাধ করার পর আল্লাহ তাআলার নিকট তাওবা করা ও গুনাহের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করাকে তিনি অত্যধিক পছন্দ করেন। আল্লাহ তাআলা তাওবা কবুল করেন এবং তাওবার মাধ্যমে বান্দাকে পুত পবিত্র করেন। তবে তাওবা কি বা তাওবা কবুল হওয়ার জন্য শর্তাবলী কি তা আমাদের জানা থাকা জরুরি। তাই নিম্নে এ বিষয়ে একটি সংক্ষিপ আলোচনা তুলে ধরা হল-

তাওবার সংজ্ঞা:

তাওবা শব্দের আভিধানিক অর্থ হল: ফিরে আসা।

ইসলামী পরিভাষায় তাওবা বলা হয়: যেসকল কথা বা কাজ আল্লাহর নৈকট্য থেকে মানুষকে দূরে সরিয়ে দেয় তা থেকে ফিরে এসে ঐ সকল কাজ ও কথায় লিপ্ত হওয়া, যদ্দারা আল্লাহর নৈকট্য লাভ করা যায়। এক কথায়, পাপকর্ম থেকে ফিরে এসে সৎকর্মে লিপ্ত হওয়াকেই তওবা বলে।মানুষ ভুল করে। শয়তানের কুমন্ত্রনায় পড়ে তার ষড়যন্ত্রের শিকার হয়ে ভুলে যায় স্রষ্টার নির্দেশ, ফলে অন্যায় ও পাপকর্মে জড়িয়ে পড়ে নিজেকে কলুষিত করে। তবে যদি নিজের ভুল বুঝতে পেরে ভবিষ্যতে আর কখনো আর তাতে ফিরে যাবেনা বলে দৃঢ় প্রতিজ্ঞা করে তাওবা করে; ফিরে আসে আল্লাহর পথে, তাহলে আল্লাহ তাআলা তাওবাকারীর সকল গুনাহ ক্ষমা করে দেন এবং অত্যান্ত খুশি হন। সম্পর্কের দিক থেকে পাপ দুই প্রকারের হয়ে থাকে।

(১) আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের হক্বঃ  তথা- আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের আদেশ-নিষেধ লঙ্ঘন সংক্রান্ত পাপ। যেমন: নামাজ আদায় না করা, রোজা পালন না করা, মদ্যপান করা ইত্যাদি।

(২) মানুষের অধিকার সংক্রান্ত পাপঃ  যেসকল পাপের দ্বারা মানুষের অধিকার ক্ষুন্ন হয়, মানুষ ক্ষতিগ্রস্থ হয়। যেমন: চুরি করা, ডাকাতি করা, জুলুম নির্যাতন করা, ইভটিজিং করা ইত্যাদি।

পাপের সম্পর্ক যদি আল্লাহর সাথে হয়, তাহলে তা থেকে তওবা করতে হলে তার মাঝে তিনটি শর্ত বিদ্যমান থাকতে হবে বলে ওলামাগণ বলে থাকেন।

১।  পাপ কাজটি পরিহার করতে হবে।
২।  কৃত পাপকর্মের প্রতি আন্তরিকভাবে লজ্জিত বা অনুতপ্ত হতে হবে।
৩।  ভবিষ্যতে আর এপাপকর্মে লিপ্ত হবেনা বলে দৃঢ় সংকল্প করতে হবে।

قَالَ أَبُو هُرَيْرَةَ سَمِعْتُ رَسُوْلَ اللهِ صلى الله عليه وسلم يَقُوْلُ وَاللهِ إِنِّي لأَسْتَغْفِرُ اللهَ وَأَتُوبُ إِلَيْهِ فِي الْيَوْمِ أَكْثَرَ مِنْ سَبْعِينَ مَرَّةً

আবূ হুরাইরাহ বর্ণনা করেন, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -কে বলতে শুনেছিঃ আল্লাহর শপথ! আমি প্রতিদিন আল্লাহর কাছে সত্তরবারেরও অধিক ইস্তিগফার ও তাওবাহ করে থাকি। (বুখারী,হাদীস নং-৬৩০৭)

وَأَنِ ٱسْتَغْفِرُوا۟ رَبَّكُمْ ثُمَّ تُوبُوٓا۟ إِلَيْهِ

আর তোমরা তোমাদের রবের কাছে ক্ষমা চাও। তারপর তার কাছে ফিরে যাও। (সূরা হুদ,আয়াত-৩)

عَنِ الأَغَرِّ الْمُزَنِيِّ، – قَالَ مُسَدَّدٌ فِي حَدِيثِهِ وَكَانَتْ لَهُ صُحْبَةٌ – قَالَ قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم ‏ “‏ إِنَّهُ لَيُغَانُ عَلَى قَلْبِي وَإِنِّي لأَسْتَغْفِرُ اللَّهَ فِي كُلِّ يَوْمٍ مِائَةَ مَرَّةٍ ‏

আল-আগার আল-মুযানী (রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলইহে ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেনঃ অবশ্য  কখনো কখনো আমার ‘ কলব’ পর্দাবৃত হয় (অর্থাৎ মানুষ হিসাবে দুনিয়ার কাজকর্মে লিপ্ত হওয়ার কারণে আল্লাহ্‌র যিকির হতে গাফিল হয়) এবং আমি আল্লাহ্‌র নিকট দৈনিক একশত বার ইস্তিগফার করে থাকি।    (আবু দাউদ,হাদিস নং-১৫১৫)

ابْنَ عَبَّاسٍ يَقُولُ سَمِعْتُ النَّبِيَّ صلى الله عليه وسلم يَقُولُ لَوْ كَانَ لِابْنِ آدَمَ وَادِيَانِ مِنْ مَالٍ لاَبْتَغَى ثَالِثًا وَلاَ يَمْلاَ جَوْفَ ابْنِ آدَمَ إِلاَّ التُّرَابُ وَيَتُوبُ اللهُ عَلَى مَنْ تَابَ

ইবনু ‘আববাস  (রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন যে, আমি নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে বলতে শুনেছি, যদি আদাম সন্তানের দু’ উপত্যকা ভরা মালধন থাকে তবুও সে তৃতীয়টার আকাঙ্ক্ষা করবে। আর মাটি ভিন্ন বানী আদামের পেট কিছুতেই ভরবে না। আর যে তাওবাহ করবে, আল্লাহ্ তার তাওবাহ কবূল করবেন। (বুখারী, হাদীস নং-৬৪৩৬)

অধিকাংশ মানুষ আল্লাহর অনেক আদেশ, অন্তরের কার্যাদি, অঙ্গপ্রত্যঙ্গের আমল বা যিকির ছেড়ে দেয়, অথচ তারা জানেই না যে এগুলো সবই আল্লাহর আদেশের অন্তর্ভুক্ত এবং এ গুলো ছেড়ে দেয়া বা এ সব আমল পালন করা হতে বিরত থাকা অপরাধ ও গুনাহ। অথবা জানা থাকলেও তারা তার পাবন্দি করে না। এবং এগুলো ছেড়ে দেয়াতে যে, তার পাপ হচ্ছে, তা থেকে ফিরে আসা ও তাওবা করা যে গুরুত্বপূর্ণ বা অতীব জরুরী তা তারা বিশ্বাস করে না। ফলে সত্যিকার জ্ঞান না থাকার কারণে তারা হয়ত পথভ্রষ্টদের দলভুক্ত হয় অথবা অভিশপ্ত সম্প্রদায়ের অন্তর্ভুক্ত হয়। সত্যকে সত্য বলে জানা সত্ত্বেও তা হতে বিরত থেকে তারা মন্দ পরিণতির অধিকারীই রয়ে গেল।

মোট কথা,  তাওবা বান্দার জীবনের শেষ ও শুরু। তবে তার প্রয়োজন যেমনিভাবে জীবনের শেষাংশে জরুরী অনুরূপভাবে জীবনের প্রথমাংশেও জরুরী। যেমন আল্লাহ বলেন:

وَتُوبُوٓا۟ إِلَى ٱللَّهِ جَمِيعًا أَيُّهَ ٱلْمُؤْمِنُونَ لَعَلَّكُمْ تُفْلِحُونَ

হে ঈমাদারগণ তোমরা আল্লাহর নিকট খালেস তাওবা কর নিশ্চয় তোমরা কামিয়াব হবে। [সূরা আন নূর-৩১]

উল্লেখিত আয়াতটি মদীনায় অবর্তীণ হয়েছে এ আয়াতে আল্লাহ তায়ালা শুধু ঈমানদার নয় বরং তখনকার সময়ের সবচেয়ে উত্তম মাখলুক যারা জিহাদ, সবর, হিজরতসহ যাবতীয় নেক কাজে কিয়ামত পর্যন্তের জন্য ইতিহাস হয়ে থাকবেন, তাদেরকে তাওবা করার নির্দেশ দেন এবং তারপর তিনি তাওবাকে সফলতা ও কামিয়াবী লাভের কারণ নির্ধারণ করেন। সুতরাং, কামিয়াবী বা সফলতা পাওয়ার একমাত্র উপায় হল আল্লাহর নিকট খালেস তাওবা করা। আল্লাহর দরবারে তাওবা করা ও যাবতীয় গুনাহ হতে ক্ষমা প্রার্থনা ছাড়া কোন ঈমানদারই সফল হতে পারে না।

তাওবাতুন নাছুহা কি?

মনে রাখতে হবে, তাওবা হল মানুষের অন্তরের আন্তরিক প্রচেষ্টা, অনুশোচনা। অর্থাৎ, মানুষের অন্তরে অপরাধবোধ জাগ্রত হওয়া এবং নিজেকে গুনাহের কারণে অপরাধী মনে করা যা বান্দার অন্তরে কখনো কখনো জাগ্রত হয়ে থাকে। অন্তরে এ ধরনের অনুভূতি জাগ্রত হওয়ার অর্থই হল তাওবা বা ক্ষমা প্রার্থনা ও আল্লাহর দিকে ফিরে যাওয়া। এ ধরনের ক্ষমা প্রার্থনা বা তাওবাকে তাওবাতুন নাছুহা বলা হয়। আরও মনে রাখবে, আত্মাকে সকল প্রকার গুনাহ, অন্যায়, পাপাচার ইত্যাদি হতে বিরত রাখার মাধ্যমে একজন বান্দা সফলকাম হতে পারে।

يَٰٓأَيُّهَا ٱلَّذِينَ ءَامَنُوا۟ تُوبُوٓا۟ إِلَى ٱللَّهِ تَوْبَةً نَّصُوحًا عَسَىٰ رَبُّكُمْ أَن يُكَفِّرَ عَنكُمْ سَيِّـَٔاتِكُمْ

হে ঈমানদারগণ, তোমরা আল্লাহর কাছে তাওবা কর, খাঁটি তাওবা; আশা করা যায় তোমাদের রব তোমাদের পাপসমূহ মোচন করবেন। (সূরা আত তাহরিম,আয়াত-৮)

তাওবার ফলাফল:

وَتُوبُوٓا۟ إِلَى ٱللَّهِ جَمِيعًا أَيُّهَ ٱلْمُؤْمِنُونَ لَعَلَّكُمْ تُفْلِحُونَ

হে মুমিনগণ, তোমরা সকলেই আল্লাহর নিকট তাওবা কর, যাতে তোমরা সফলকাম হতে পার। (সূরা আন নুর,আয়াত-৩১)

ইমাম গাজালী রহ. তার কিতাব মিনহাজুল আবেদীনে’ লিখেন “অতপর হে! ইবাদতকারী তোমার উপর কর্তব্য হল তুমি আল্লাহর নিকট তাওবা কর। আর তাওবা করবে তুমি দুইটি কারণে-

(এক) তাওবার কারণে আল্লাহ তোমাকে তার আনুগত্য করা সহজ করে দিবেন এবং তোমার নেক কাজ করার তাওফীক ও সৌভাগ্য লাভ হবে। গুনাহের পরিণতি হল, গুনাহ মানুষকে বঞ্চিত করার অভিবাকত্ব করে এবং লাঞ্ছনা ও বঞ্চনার দিকে ঠেলে দেয়। গুনাহতে আবদ্ধ লোককে আল্লাহর আনুগত্যের পথে চলা ও আল্লাহর দীনের খেদমতে অগ্রসর হতে গুনাহ বারণ করে। গুনাহের বোঝা ভারি হলে সকল প্রকার নেক আমল তার জন্য কঠিন হয়ে পড়ে। তার জন্য আর কোন নেক আমল করা সহজ হয় না ইবাদত বন্দেগীতে সে আর কোন উৎসাহ পায় না। আর সব চেয়ে বিপদজনক কথা হল, যারা সব সময় গুনাহে লিপ্ত থাকে তাদের অন্তর কালো হয়ে যায়, ফলে তারা অন্ধকারে নিমজ্জিত হয়। অন্তর ভাল মন্দের বিচার করতে অক্ষম  হয়ে যায়, তাদের অন্তর পাথরের চেয়েও শক্ত হয়ে যায়। ফলে কোন ভাল কাজ তার অন্তর কবুল করে না। তখন একমাত্র আল্লাহর অনুগ্রহ ছাড়া সে আর কোন মুক্তি বা নাজাতের পথ খুজে পায় না। কোন কিছুতেই তৃপ্তি অনুভব করে না। সে নিজেকে অনিরাপদ মতে করে। নিজের জন্য কোথাও নিরাপদ স্থান খুঁজে পায় না এবং পায় না কোন আশ্রয় কেন্দ্র। পরিণতিতে ধাবিত হয় গভীর অন্ধকার ও ভয়ঙ্কর বিপদের দিকে। ধীরে ধীরে গুনাহ তাকে ঈমান হারা হওয়া এবং শিরক ও কুফরের দিকে টেনে নিয়ে যায়। আরো আশ্চযের্র বিষয় হল, যে ব্যক্তি র্দুভাগা এবং যার অন্তর পাথরের চেয়েও বেশী কঠিন, তাকে কিভাবে আল্লাহর আনুগত্যের তাওফীক দেয়া হবে? তাকে কিভাবে আহবান করা হবে কল্যাণের পথে? অথচ সে গুনাহের কাজেই অবিচল, তার মধ্যে কোন অনুভূতি নাই। সে যে একজন অপরাধী ও অন্যায়কারী এ বিষয়ে তার মধ্যে কোন চেতনা জাগ্রত হয় না।

সুতরাং তাকে কিভাবে কাছে আনা হবে যে নাপাকী ও র্দূগন্ধময় বস্তুর সাথে সর্বদা মাখামাখি করছে, গুনাহের কাজে লিপ্ত থাকে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন : মানুষ যখন মিথ্যা কথা বলে,তার মুখ থেকে র্দূগন্ধ বের হতে থাকে, আর সাথে সাথে তার কাছ থেকে দুই জন ফেরেশতা দূরে সরে যায়। তখন আর তার মুখ ও জিহবা আল্লাহর যিকিরের উপযোগী থাকে না, ফলে গুনাহে লিপ্ত থাকে এ ধরনের খুব কম লোকই আছে যারা পরর্বতীতে আল্লাহর আনুগত্যে ফিরে আসে এবং আল্লাহর ইবাদতে কোন স্বাদ আস্বাদন করে। যদি সে কোন দান-সদকা করে তা অনেক কষ্টে, এতে কোন স্বাদ উপভোগ করে না, আত্মার কোন তৃপ্তি হয় না এগুলো সবই হল গুনাহের পরিণতি এবং তাওবা না করার ফলাফল।  জৈনক লোক সত্য কথাই বলছেন, যদি তুমি দিনে রোজা এবং রাতে ইবাদত করতে না পার, তাহলে মনে রাখবে তুমি একজন হাতে পায়ে কড়া পরিহিত শিকলাবদ্ধ লোক। তোমার গুনাহই তোমাকে এ পরিণতিতে টেনে এনেছে।

(দুই) আর দ্বিতীয় বিষয় হল, তোমাকে যে কারণে আল্লাহর নিকট তাওবা করতে হবে তা হল, যাতে আল্লাহ তোমার ইবাদত বন্দেগীগুলো কবুল করেন। কারণ, পাওনাদার সাধারণত উপঢৌকন গ্রহণ করে না। গুনাহ হতে বিরত থাকা, গুনাহ হতে তাওবা করা এবং প্রতিপালককে সন্তুষ্ট করা হল ফরজ কাজ।  আর অন্যান্য সকল ইবাদত তা সবই নফল। সুতরাং, মূল পাওনা পরিশোধ ছাড়া আল্লাহ তাআলা তোমার থেকে কিভাবে উপঢৌকন গ্রহণ করবেন? তুমি কীভাবে তার সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে বৈধ ও মুবাহ কাজা গুলি ছেড়ে দিবে অথচ তুমি এখনো আল্লাহর নাফরমানী এবং নিষিদ্ধ কাজে লিপ্ত। তুমি কিভাবে আল্লাহকে ডাকবে, তার সাথে মুনাজাত করবে এবং তার প্রশংসা করবে অথচ আল্লাহ তোমার উপর রাগান্বিত। মনে রাখতে হবে যারা আল্লাহর নাফরমানীতে লিপ্ত তাদের অবস্থা উল্লেখিত অবস্থার মোটেই ব্যতিক্রম নয়, তারা আল্লাহর অবাদ্ধতায় লিপ্ত অথচ তারা আল্লাহর নিকট দোয়া করে, আল্লাহর দরবারে মুনাজাত করে এবং তার কাছে সাহায্য প্রার্থনা করে। এর জন্য চারটি র্শত আছে

(১) পূর্বের কৃত কাজের উপর লজ্জিত ও অনুতপ্ত হওয়া।
(২) এমন কাজ দ্বিতীয় বার না করার উপর প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হওয়া।
(৩) আল্লাহর নিকট ক্ষমা প্রার্থনার মাধ্যমে প্রত্যাবর্তন করা।
(৪) কবীরা গুনাহের কারণে আপনার উপর যে কর্তব্য বা ঋণের দায়িত্ব বর্তায় তা পরিশোধ করা, যেমন-

আপনি কাউকে গালি দিয়েছেন অথবা কারো অধিকারে হস্তক্ষেপ করেছেন, তাহলে আপনার কর্তব্য হল, পাওনাদারকে তার পাওনা ফেরত দেয়া এবং তার নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করা। আর যদি আপনি এমন কোন অন্যায় করেন যার মধ্যে অন্যের অধিকারের কোন সম্পর্কে নেই। তাহলে পূর্বের তিনটি শর্ত পূর্ণ করলেই তওবা হয়ে যাবে এবং আল্লাহর দরাবারে আশা করা যাবে যে তিনি আপনাকে ক্ষমা করে দেবেন।

আল্লাহর নিকট প্রার্থনা হলো, আল্লাহ যেন আমাদের ক্ষমা করেন এবং আমাদেরকে তাওবা করার তাওফীক দান করেন। আর আমাদের মধ্যে যারা আল্লাহর দরবারে তাওবা করেন তাদের তওবা যেন তিনি কবুল করেন।

যে কারণে তাওবা করতে হবে:

يَٰٓأَيُّهَا ٱلَّذِينَ ءَامَنُوا۟ تُوبُوٓا۟ إِلَى ٱللَّهِ تَوْبَةً نَّصُوحًا عَسَىٰ رَبُّكُمْ أَن يُكَفِّرَ عَنكُمْ سَيِّـَٔاتِكُمْ

হে ঈমানদারগণ, তোমরা আল্লাহর কাছে তাওবা কর, খাঁটি তাওবা, আশা করা যায় তোমাদের রব তোমাদের পাপসমূহ মোচন করবেন। (সূরা আত তাহরিম,আয়াত-৮)

আর মনে রাখতে হবে তোমাকে দুটি কারণে তাওবা করতে হবে। তার একটি কারণ হল, যাতে তোমার আল্লাহর আনুগত্য করা ও বন্দেগী করার সৌভাগ্য লাভ হয়। কারণ, গুনাহের খারাব পরিণতি হল, গুনাহের কারণে বান্দা যাবতীয় কল্যাণ হতে বঞ্চিত হয়ে যায় এবং অপমান অপদস্থ হয়। গুনাহ একজন মানুষকে আল্লাহ তাআলার আনুগত্যে দিকে অগ্রসর হওয়া ও তাঁর গোলামীর দিকে অগ্রগামী হওয়া থেকে বাধা দেয়। এ ছাড়া যার গুনাহের বোঝা ভারি হয়ে যায়, তার জন্য নেক কাজ করা এবং কল্যাণকর কাজে তৎপর হওয়া আর সহজ থাকে না। সব সময় গুনাহে লিপ্ত থাকার কারণে মানুষের অন্তরসমূহ কালো হয়ে যায়। ফলে অন্তরসমূহ অন্ধকারে নিমজ্জিত হয় এবং তা পাথরের মত কঠিন হয়ে পড়ে। তাতে আর কোন ইখলাস থাকে না ইবাদত বন্দেগীতে কোন মজা ও স্বাদ উপভোগ করে না। আল্লাহ তাআলা যদি তার প্রতি অনুগ্রহ না করে তাহলে গুনাহ গুনাহগার ব্যক্তিকে কুফর ও বেঈমানীর দিকে টেনে নিয়ে যায়। কী আশ্চর্য! যে গুনাহ ও পাপাচারে লিপ্ত তাকে কীভাবে আল্লাহ তার গোলামীর সুযোগ দিবেন। কীভাকে তাকে তার দীনের খেদমতের জন্য ডাকবে যে সর্বদা তার নাফরমানীতে মশগুল এবং অবাধ্যতায় নিমগ্ন। কীভাবে তাকে মুনাজাতের জন্য কাছে টেনে আনবে যে ময়লা আবর্জনা ও নাপাকীতে আকুণ্ঠ নিমজ্জিত।

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হতে বর্ণিত, তিনি বলেন যখন কোন বান্দা মিথ্যা কথা বলে তখন তার মুখ থেকে যে দূগর্ন্ধ বের হয় তাতে তার থেকে দুইজন ফেরেস্তা দূরে সরে যায়। ফলে এ জিব্হা কীভাবে উপযুক্ত হবে আল্লাহর যিকির করার? সুতরাং, এতে বিন্দু পরিমাণও সন্দেহ নাই, যে লোক আল্লাহর নাফরমানী ও তার হুকুমের বিরোধিতার উপর অটল থাকে সে কখনো ভালো কাজের তাওফীক লাভ করতে পারে না এবং তার জন্য নিজ অঙ্গ-প্রত্যঙ্গগুলিকে আল্লাহর ইবাদতে কাজে লাগানো সহজ হয় না। সে যদি খরচ করে তবে তাকে অনেক কষ্টে খরচ করতে হয়, তাতে কোন মানসিক স্বস্তি ও  আন্তরিক তৃপ্তি পায় না এবং কোন স্বাদ উপভোগ করে না। এমন হবার মূল কারণ হচ্ছে, সে সব সময় গুনাহতে নিমগ্ন থাকে এবং আল্লাহর দরবারে তাওবা করা ছেড়ে দেয়া। সুতরাং আপনাকে আল্লাহর  দরবারে বার বার তাওবা করতে হবে এবং গুনাহের কাজসমূহ হতে বিরত থাকতে হবে। আল্লাহ আমাদের তাওফীক দান করুন।

গুনাহের প্রকার:

গুনাহ সাধারণত তিন প্রকারের হয়ে থাকে।

১। আল্লাহ তায়ালা বান্দার উপর যে সকল ইবাদত ফরয করেছেন সে গুলোকে ছেড়ে দেয়া। যেমন নামায, রোজা, যাকাত ইত্যাদি। সালাত আদায় না করা কবীরা গুনাহ অনুরূপভাবে সওম এবং যাকাত আদায় নাকরাও কবীরা গুনাহ। এ ধরনের গুনাহ হতে মাপ পাওয়ার জন্য করণীয় হল, যে সকল ইবাদত ছুটে গিয়াছে তা যথা সম্ভব ক্বাযা আদায় করা। আর যদি ক্বাজা আদায় করা সম্ভব না হয় তার বিকল্প যেমন রোজার ক্ষেত্রে ফিদয়া আদায় করা। আর যদি তাও সম্ভব না হয় তবে তার জন্য আল্লাহর দরবারে কান্নাকাটি করতে হবে। এবং আল্লাহর নিকট হতে মাপ করিয়ে নিতে হবে।

২। আল্লাহ এবং বান্দার মাঝে সংঘটিত গুনাহসমুহ। যেমন: মদ পান করা, গান বাজনা করা, সুদ খাওয়া ইত্যাদি। এ ধরনের গুনাহের কারণে অবশ্যই লজ্জিত হতে হবে এবং মনে মনে পত্যয়ী হতে হবে যে এ ধরনের গুনাহ ও অপরাধ আর কখনো করবে না।

৩। গুনাহের সর্ম্পক বান্দার সাথে। এ ধরনের গুনাহ সবচেয়ে কঠিন ও মারাত্মক। এ ধরনের গুনাহ আবার কয়েক ধরনের হতে পারে,

(ক) ধন সম্পদের সাথে সম্পর্কিত: এ বিষয়ে করণীয় হল যে লোকের কাছ থেকে কর্জ নিয়েছন অথবা যার হক্ব নষ্ট করেছেন কিংবা যার ক্ষতি করেছন, আপনাকে অবশ্যই তার পাওনা পরিশোধ করতে হবে এবং তার ক্ষতিপূরণ দিতে হবে। যদি পরিশোধ বা ফেরত দেয়া সম্ভব না হয়, হয়ত যে সম্পদটি আপনি নষ্ট করেছিলেন তা এখন আর আপনার নিকট অবশিষ্ট নাই, কিংবা আপনি নি:স্ব হয়ে গিয়েছেন তাহলে অবশ্যই আপনাকে ক্ষতিগ্রস্ত লোকটি হতে ক্ষমা চাইতে হবে এবং তার থেকে অনুমতি নিয়ে তা হালাল করে নিতে হবে। আর যদি এ রকম হয় যে লোকটি মারা গিয়েছে অথবা অনুপুস্থিত। যার কারণে ক্ষতিপূরণ দেয়া কিংবা মাফ নেওয়া এর কোনটিই সম্ভব নয় তাহলে তার পক্ষ হতে তা দান করে দিতে হবে। আর যদি তাও সম্ভব না হয়, তবে তাকে অবশ্যই বেশি বেশি নেক আমল করতে হবে, আল্লাহর দরবারে বেশী বেশী তাওবা ও কান্নাকাটি করতে হবে যাতে আল্লাহ ক্বিয়ামত দিবসে লোকটিকে তার উপর রাজি করিয়ে দেয়।

(খ) মানুষের জীবনের সাথে সম্পর্কিত:  যেমন- হত্যা করা বা অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ নষ্ট করা, তাহলে আপনাকে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তি অথবা তার অবিভাবককে ক্বিসাস বা প্রতিশোধ নেয়ার সুযোগ দিতে হবে অথবা তারা আপনাকে ক্ষমা করে দিবে এবং কোনো বদলা নেবে না মর্মে একটি সমঝতায় পৌঁছতে হবে। আর যদি তাও সম্ভব নাহয়, তবে অবশ্যই আল্লাহর দরবারে বেশী বেশী তাওবা ও কান্নাকাটি করতে হবে, যাতে আল্লাহ ক্বিয়ামত দিবসে লোকটিকে আপনার উপর রাজি করিয়ে দেন।

(গ) মানুষের সম্ভ্রম হরণ করা: যেমন- গীবত করা, কারো বিরুদ্ধে অপবাদ দেয়া অথবা গালি দেয়া ইত্যাদি। তখন আপনার করণীয় হল, যার বিপক্ষে এ সকল কথা বলেছিলেন, তার নিকট গিয়ে নিজেকে মিথ্যুক সাব্যস্ত করা এবং বলা যে ভাই আমি মিথ্যুক, আমি আপনার বিরুদ্ধে যে সব অপবাদ বা বদনাম করেছি তা ঠিক নয় আমি মিথ্যা বলেছি। আর যদি ঝগড়া বিবাদ বা নতুন কোন ফাসাদ কিংবা লোকটির ক্রোধ আরো প্রকট আকার ধারণ করার সম্ভাবনা না থাকে তবে তার নিকট সব কিছু প্রকাশ করে ক্ষমা চেয়ে নিতে হবে। অন্যথায় আল্লাহর নিকট অধিক হারে তাওবা করতে হবে। যাতে আল্লাহ তাকে তার উপর রাজি করিয়ে দেন। আল্লাহর নিকট প্রার্থনা আল্লাহ যেন লোকটির জন্য এর বিপরীতে তার জন্য অশেষ কল্যাণ নিহিত রাখ এবং তার জন্য বেশী বেশী প্রার্থনা করবে।

(ঘ) ইজ্জত হরণ: যেমন কারো অনুপস্থিতিতে তার পরিবারের ইজ্জত হরণ অথবা সন্তান-সন্তুতির অধিকার নষ্ট বা খিয়ানত করা।

গুনাহের খারাপ পরিণতি ও ক্ষতিকর দিকসমূহ:

সম্মানিত পাঠকবৃন্দ, মনে রাখতে হবে, গুনাহ মানুষের দুনিয়া ও আখেরাত উভয় জগতের জন্যই ক্ষতিকর। গুনাহের কারণে মানুষ দুনিয়াতে লাঞ্ছনা-বঞ্চনা, অপমান- অপদস্থের শিকার হয়। দুনিয়ার জীবনে তার অশান্তির অন্ত থাকে না। অনেক সময় দুনিয়ার জীবন দুর্বিষহ হয়ে পড়ে। ফলে দুনিয়াতেও গুনাহের কারণে তাকে নানাবিধ শাস্তি ও আজাব-গজবের মুখোমুখি হতে হয় এবং আখেরাতে তো তার জন্য রয়েছে অবর্ণনীয়- সীমাহীন দুর্ভোগ। এ ছাড়া গুনাহ কেবল মানুষের আত্মার জন্যই ক্ষতিকর নয় বরং আত্মা ও দেহ দুটির জন্যই ক্ষতিকর। গুনাহ মানুষের জন্য কঠিন এক ভয়ানক পরিণতি ডেকে আনে। গুনাহ মানুষের আত্মার জন্য এমন ক্ষতিকর যেমনিভাবে বিষ দেহের জন্য ক্ষতিকর। গুনাহের কয়েকটি ক্ষতিকর দিক ও খারাব পরিণতি নিম্নে আলোচনা করা হল। যাতে আমরা এগুলো জেনে গুনাহ হতে বিরত থাকতে সচেষ্ট হই।

১। ইলম তথা দ্বীনি জ্ঞান লাভ থেকে বঞ্চিত হওয়া। কারণ, ইলম হল নূর যা আল্লাহ মানুষের অন্তরে স্থাপন করেন কিন্তু গুনাহ-পাপাচার এ নূরকে নিভিয়ে দেয়। সুতরাং গুনাহে লিপ্ত ব্যক্তি কখনো ইলম তথা শরিয়তের জ্ঞান লাভে ধন্য হতে পারে না। ইলম হল, আল্লাহর নূর আর গুনাহ হলো অন্ধকার। আর এ কথা স্পষ্ট যে, আলো ও অন্ধাকার কখনো একত্র হতে পারে না।

২। রিযিক থেকে বঞ্চিত হওয়া। মুসনাদে বর্ণিত হয়েছে,

إن العبد ليحرم الزرق  بالذنب يصيبه

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, বান্দা গুনাহে লিপ্ত হওয়ার কারণে রিযিক হতে বঞ্চিত হয়। মানুষের রিযিকে সংকীর্ণতা দেখা দেয়। সুতরাং, রিযিকের স্বচ্ছলতা কামনাকারীদের জন্য গুনাহের কাজ ছেড়ে দিতে হবে।

৩। গুনাহ দেহ ও আত্মাকে দুর্বল করে দেয়। ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন- নিশ্চয় নেক আমলের কারণে মানুষের চেহারা উজ্জ্বল হয়, অন্তর আলোকিত হয়, রিযিক বৃদ্ধি পায়, দেহের শক্তি ও মনোবল চাঙ্গা হয়, মানুষের অন্তরে মুহব্বত বৃদ্ধি পায়। পক্ষান্তরে খারাপ কাজে মানুষের চেহারা কুৎসিত হয়, অন্তর অন্ধকার হয়, দেহ দুর্বল হয়, রিযিক সংকীর্ণ হয় এবং মানুষের অন্তরে তার প্রতি ঘৃণা জন্মায়।

৪। আল্লাহ ও তার রাসূলের আনুগত্য হতে বঞ্চিত হয়। যদি গুনাহের কারণে তাকে কোন শাস্তি নাও দেয়া হয়, কিন্তু সে আল্লাহর বিশেষ ইবাদত বন্দেগী হতে বঞ্চিত হবে।

৫। গুনাহকে ঘৃণা বা খারাপ জানার অনুভূতি হারিয়ে ফেলে। ফলে গুনাহের কাজে সে অভ্যস্ত হয়ে যায় এবং সমস্ত মানুষও যদি তাকে দেখে ফেলে বা তার সামলোচনা করে এতে সে লজ্জাবোধ বা গুনাহ করাকে খারাব ও অন্যায় মনে করে না। এ ধরনের মানুষকে আল্লাহ ক্ষমা করেন না এবং তাদের তওবার দরজাও বন্ধ হয়ে যায়।
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন –

كل أمتي معافى إلا المجاهرين ، وإن من المجاهرة أن يعمل الرجل بالليل عملا، ثم يصبح وقد ستر الله عليه ، فيقول : يا فلان ، عملت البارحة كذا وكذا، وقد بات يستره ربه، ويصبح يكشف ستر الله عليه. متفق عليه

‘‘আমার সকল উম্মতকে ক্ষমা করা হবে একমাত্র ঘোষণা দানাকারী ছাড়া। আর ঘোষণা হল,  কোন ব্যক্তি রাতে কোন পাপ করল আর আল্লাহ তার অপকর্মকে গোপন রাখলেন কিন্তু লোকটি সকালে লোকদের ডেকে ঘোষণা করতে লাগল, হে অমুক আমি রাতে এই এই কাজ করেছি। রাতে তার রব তাকে গোপন করল আর সকালে সে আল্লাহর গোপন করা বিষয় প্রকাশ করে দিল। (বুখারী ও মুসলিম)

৬। বান্দা গুনাহ করতে করতে গুনাহ তার জন্য সহজ হয়ে যায়, অন্তরে সে গুনাহকে ছোট মনে করতে থাকে। তার মধ্যে অপরাধ বোধ অবশিষ্ট থাকে না। ফলে সে কোন অপরাধকে অপরাধ মনে করে না। আর এটাই হল একজন মানুষের জন্য ধ্বংসের নিদর্শন। আব্দুল্লাহ  ইবনে মাসউদ রা. হতে বর্ণিত, তিনি বলেন-

إن المؤمن يرى ذنوبه كأنه في أصل جبل يخاف أن يقع عليه وأن الفاجر يرى ذنوبه كذباب رفع على أنفه فقال به هكذا فطار – ذكر البخاري في الصحيح)

“মুমিন নিজ গুনাহগুলোকে এমনভাবে দেখে যে, যেন একটি পাহাড়ের পাদদেশে বসে আছে আশঙ্কা করছে যে সেটি তার উপর পতিত হবে আর পাপী নিজ গুনাহসমূহকে মাছির মত মনে করে যা তার নাকের উপর পড়েছে একটু পর উড়ে গিয়েছে। (সহীহ বুখারী)

৭। গুনাহ লাঞ্ছনা ও অপমানের কারণ হয়ে থাকে।  কারণ হল, সকল প্রকার ইজ্জত একমাত্র আল্লাহর আনুগত্যের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। আল্লাহর আনুগত্যের বাহিরে কোথাও ইজ্জত সম্মান পাওয়া যাবে না। তিনি যাকে ইচ্ছা ইজ্জত দান করেন আর যাকে ইচ্ছা বেইজ্জত করেন। আল্লাহ বলেন-

مَن كَانَ يُرِيدُ ٱلۡعِزَّةَ فَلِلَّهِ ٱلۡعِزَّةُ جَمِيعًاۚ

‘‘কেউ ইজ্জতের আশা করলে মনে রাখতে হবে যে, সমস্ত ইজ্জত আল্লাহরই।’’ (সূরা ফাতের,আয়াত-১০)
অর্থাৎ, ইজ্জত আল্লাহর আনুগত্যের মাধ্যমেই তালাশ করা উচিত, কারণ, আল্লাহর আনুগত্য ছাড়া কোথাও ইজ্জত খুঁজে পাওয়া যাবে না। আল্লাহর আনুগত্যের বাহিরে যে ইজ্জত তালাশ করবে তাকে অবশ্যই বেইজ্জত হতে হবে। তাকে ভোগ করতে হবে লাঞ্ছনা, বঞ্চনা আর হতাশার গ্লানী। তাই আল্লাহর আনুগত্যের মাধ্যমেই ইজ্জত তালাশ করতে হবে।

৮। গুনাহ মানুষের জ্ঞান বুদ্ধিকে ধ্বংস করে দেয়।  কারণ মানুষের জ্ঞান বুদ্ধির জন্য একটি আলো বা নূর থাকে আর গুনাহ ঐ নূর বা আলোকে নিভিয়ে দেয় , ফলে জ্ঞান বুদ্ধি ধ্বংস হয়ে যায়।

৯। গুনাহ গুনাহকারীর অন্তরকে কাবু করে ফেলে এবং সে ধীরে ধীরে অলসদের অর্ন্তভুক্ত হয়। যেমন আল্লাহ বলেন-

كَلَّاۖ بَلۡۜ رَانَ عَلَىٰ قُلُوبِهِم مَّا كَانُواْ يَكۡسِبُونَ

অর্থাৎ ‘‘কখনো না, বরং তারা যা করে তাই তাদের হদয়ে মরিচা ধরিয়ে দিয়েছে।’’ (সূরা তাফফিফীন,আয়াত-১৪)

এ আয়াত সম্পর্কে ওলামায়ে কেরাম বলেন, বার বার গুনাহ করার কারণেই এ অবস্থার সৃষ্টি হয়ে থাকে। তখন তার অন্তর আর ভাল কিছু গ্রহণ করে না। ভাল কাজ, ভাল কোন উপদেশ এবং মনীষীদের বাণী সবই তার কাছে অসহনীয় ও বিরক্তিকর মনে হয়। ফলে সে তার মনের ইচ্ছা ও খেয়াল খুশি মত যা ইচ্ছা তাই করতে থাকে। কোন অন্যায় অপরাধ তার নিকট অন্যায় মনে হয় না। গুনাহ তার নিকট আর গুনাহ বলে বিবেচিত হয় না। এ ধরনের লোকের সংখ্যা বর্তমান সমাজে অসংখ্য রয়েছে। তারা সালাত আদায় করে না, সওম পালন করে না, যাকাত প্রদান করে না। কিন্তু এ সব যে প্রতিটিই মারাত্মক অপরাধ তা তাদের মনে একটুও রেখাপাত করে না। তারা যে অপরাধী, গুনাহগার ও পাপী এ ধরনের কোন অনুভূতি তাদের মনষ্পটে জাগ্রত হয় না এবং তাদের বিবেক বিন্দু পরিমাণও নাড়া দেয় না। ফলে তাদের অন্তর পাথরের চেয়ে বেশি কঠিন হয়ে যায়। তাদের অন্তরসমূহ হককে গ্রহণ করার যোগ্যতা হারিয়ে ফেলে। ফলে এক পর্যায়ে ঈমান হারা হয়ে মারা যায়। আল্লাহ আমাদেরকে এ ধরনের পরিণতি হতে হেফাজত করুন।

১০। গুনাহ বান্দাকে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর অভিশাপের অর্ন্তভুক্ত করে। কারণ, তিনি গুনাহগারদের উপর অভিশাপ দিয়েছেন। যেমন – সুদ গ্রহীতা, দাতা, লেখক ও সাক্ষী- সকলের উপর অভিশাপ করেছেন। এমনিভাবে অভিশাপ করেছেন চোরের উপর। গাইরুল্লাহর নামে জাবেহকারী, জীবের ছবি অংকনকারী, মদ্যপানকারীসহ বিভিন্ন গুনাহের উপর তিনি অভিশাপ করেছেন। সুতরাং, মনে রাখতে হবে, যে গুনাহের কারণে আল্লাহ ও তার রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) অভিশাপ করেছেন সে সব গুনাহে লিপ্ত হলে তাকে অবশ্যই আল্লাহ ও তার রাসূলের অভিশাপের ভাগিদার হতে হবে। আর যে ব্যক্তি আল্লাহ ও তার রাসূলের অভিশাপের ভাগিদার হয় তার পরিণতি যে কী হবে তা বলার অপেক্ষা রাখে না।

১১। গুনাহ আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ও তার ফেরেশতাদের দু’আ হতে বঞ্চিত হওয়ার কারণ হয়। কেননা, আল্লাহ তার নবীকে বান্দা বান্দীদের জন্য দু’আ করার আদেশ দিয়েছেন।

সুপ্রিয় পাঠক, ইবাদত-আনুগত্যের জন্য মহান আল্লাহ আমাদের পৃথিবীতে পাঠিয়েছেন। বাঁচিয়ে রেখেছেন নানা নেয়ামতরাজী দ্বারা। সুতরাং আনুগত্য করাই আমাদের কাজ। কল্যাণ ও কামিয়াবির পথ এটিই। তার পরও নফস-শয়তানের প্রবঞ্চনায় অন্যায়-অপরাধ হতে পারে, হয়ে যায়। কিন্তু রহমানুর রাহীম মহান আল্লাহর করুণা সীমাহীন। তিনি বান্দাকে অপরাধ মুক্ত হিসাবে হাশরে উপস্থিত দেখতে চান। তাই অন্যায় হয়ে গেলেও তার প্রতিকারের সুন্দর ব্যবস্থা রেখেছেন। নবীজী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, পাপ থেকে তওবাকারী এমন হয়ে যায় যেন সে পাপই করেনি। তিনি আরো বলেন, নিশ্চয় আল্লাহ মৃত্যুর লক্ষণ শুরু হওয়া অবধি বান্দার তওবা কবুল করেন। তাই সুবিবেচনা ও নিজের প্রতি ইনসাফের পরিচয় হবে, সর্বদা পাপমুক্ত থাকার সর্বাত্মক চেষ্টা করা। যদি পাপ হয়ে যায় তাহলে অবশ্যই তওবার সুযোগ গ্রহণ করা। তওবাতে আল্লাহ অনেক খুশি হন। আল্লাহ আমাদেরকে ইহলৌকিক ও পারলৌকিক কল্যাণের পথে পূর্ণঅবিচল থাকার তাওফীক দান করুন।

তওবার জন্য কি অযু জরুরি?

তওবা মানে গোনাহ ত্যাগ করে আল্লাহর আনুগত্যের দিকে ফিরে আসা এবং অন্তর থেকে তাঁর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করা। তওবা হল আল্লাহর দিকে প্রত্যাবর্তন। বান্দার যখন গোনাহ হয়ে যায় তখন তার কর্তব্য, আল্লাহর কাছে তওবা-ইস্তিগফার করা। অপরাধটি হক্কুল্লাহ বা আল্লাহর হক সম্পর্কিত হলে চারটি কাজ করতে হবে। তাহলে তওবা পূর্ণাঙ্গ হবে।

১।  গোনাহ ছেড়ে দেওয়া।
২।  লজ্জিত ও অনুতপ্ত হওয়া।
৩। ভবিষ্যতে এই ধরনের গোনাহ না করার দৃঢ় সংকল্প করা।
৪। কোনো ফরয-ওয়াজিব ছুটে গিয়ে থাকলে মাসআলা অনুযায়ী তার কাযা-কাফফারা আদায় করা।  আর অপরাধটি যদি হয় হক্কুল ইবাদ বা বান্দার হক সংক্রান্ত তাহলে আরো একটি কাজ করতে হবে। যার হক্ব নষ্ট করা হয়েছে তার হক্ব আদায় করে কিংবা ক্ষমাগ্রহণ করে দায়মুক্ত হওয়া।

এভাবে আল্লাহর কাছে নিজের কৃতকর্মের জন্য কান্নাকাটি ও অনুতাপের অশ্রু ফেলার নামই তওবা।  আল্লাহর দরবারে রোনাজারি ও ক্ষমাপ্রার্থনা নিজের ভাষায়ও করা যায়। তেমনি হাদীস শরীফে তাওবা-ইস্তিগফারের যে দুআগুলো আছে সেগুলো পড়েও তওবা-ইস্তিগফার করা যায়।

এই সংক্ষিপ্ত আলোচনা থেকে যে কথাগুলো বোঝা যায়, তা এই –

(এক) তওবা করা তারই দায়িত্ব, যে গোনাহ করেছে। নিজের গোনাহর জন্য নিজেকেই অনুতপ্ত হতে হবে এবং আল্লাহর কাছে মাফ চাইতে হবে। যদিও আল্লাহর কোনো নেক বান্দার কাছ থেকে তওবা-ইস্তিগফারের নিয়ম জেনে নিয়ে তার বলে দেওয়া শব্দ উচ্চারণ করেও তওবা করা যায়, কিন্তু তওবার জন্য এটা জরুরি নয়। তাই তওবা নিজে করা যাবে না, কারো মাধ্যমেই করাতে হবে এই ধারণা ঠিক নয়। তদ্রূপ তওবার ক্ষেত্রে উল্লেখিত শর্তগুলো পালন না করে শুধু কারও বলে দেওয়া তওবার বাক্যগুলো উচ্চারণ করলেই তওবা হয়ে যায় না। তওবা হল মুমিন-জীবনের সার্বক্ষণিক আমল। নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিষ্পাপ হওয়া সত্ত্বেও দিনে সত্তর থেকে একশত বার ইস্তিগফার করতেন বলে হাদীসে এসেছে।

(দুই) আরো বুঝা গেল যে, তওবার জন্য অযু অপরিহার্য নয়। তবে কেউ যদি সালাতুত তাওবা বা তওবার নামার আদায় করতে চায়, তাহলে অন্যান্য নামাযের মতোই তাকে অযু করতে হবে। এ প্রসঙ্গে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন, যদি কেউ কোনো গুনাহ করে ফেলে অতপর পূর্ণ পবিত্রতা অর্জন করে নামাযে দাঁড়ায় এবং আল্লাহর কাছে গোনাহ মাফ চায় তাহলে আল্লাহ তার গোনাহ মাফ করে দিবেন। অতপর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কুরআন মজীদের আয়াত তিলাওয়াত করলেন।

قَالَ وَحَدَّثَنِي أَبُو بَكْرٍ وَصَدَقَ أَبُو بَكْرٍ – رضى الله عنه – أَنَّهُ قَالَ سَمِعْتُ رَسُولَ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم يَقُولُ ‏”‏ مَا مِنْ عَبْدٍ يُذْنِبُ ذَنْبًا فَيُحْسِنُ الطُّهُورَ ثُمَّ يَقُومُ فَيُصَلِّي رَكْعَتَيْنِ ثُمَّ يَسْتَغْفِرُ اللَّهَ إِلاَّ غَفَرَ اللَّهُ لَهُ ‏”‏ ‏.‏ ثُمَّ قَرَأَ هَذِهِ الآيَةَ ‏{‏ وَالَّذِينَ إِذَا فَعَلُوا فَاحِشَةً أَوْ ظَلَمُوا أَنْفُسَهُمْ ذَكَرُوا اللَّهَ ‏}‏ إِلَى آخِرِ الآيَةِ ‏.

আলী (রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু) আরো বলেন, আবু বাক্‌র সিদ্দীক (রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু) আমার নিকট একটি হাদীস বর্ণনা করেন এবং হল্‌ফ ছাড়াই আমি তাঁর বর্ণিত হাদীস সত্য বলে গ্রহণ করি। তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়াসাল্লামকে বলতে শুনেছিঃ যদি কেউ গোনাহে লিপ্ত হাওয়ার পর উত্তমরূপে উযূ করে নামাযে দণ্ডায়মান হয়ে দুই রাকাত নামায আদায় করে, অতঃপর ইস্তিগ্‌ফার করে আল্লাহ তাআলা তার ঐ গোনাহ মর্জনা করেন। অতঃপর আবু বাক্‌র (রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু) কুরআনের এই আয়াত তিলাওয়াত করেন: (সুনান আবু দাউদ,হাদিস নং-১৫২১)

وَٱلَّذِينَ إِذَا فَعَلُوا۟ فَٰحِشَةً أَوْ ظَلَمُوٓا۟ أَنفُسَهُمْ ذَكَرُوا۟ ٱللَّهَ فَٱسْتَغْفَرُوا۟ لِذُنُوبِهِمْ وَمَن يَغْفِرُ ٱلذُّنُوبَ إِلَّا ٱللَّهُ وَلَمْ يُصِرُّوا۟ عَلَىٰ مَا فَعَلُوا۟ وَهُمْ يَعْلَمُونَ

অর্থ-এবং তারা সেই সকল লোক, যারা কখনো কোনো মন্দ কাজ করে ফেললে বা নিজেদের প্রতি জুলুম করলে সঙ্গে সঙ্গে আল্লাহকে স্মরণ করে এবং নিজেদের গোনাহর জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করে। আর কে আছে আল্লাহ ছাড়া, যে গোনাহ ক্ষমা করতে পারে? আর তারা জেনেশুনে তাদের কৃত-কর্মের উপর অবিচল থাকে না। (সূরা আলে ইমরানঃ ১৩৫)

عَنْ عَلِيِّ بْنِ أَبِي طَالِبٍ، قَالَ كُنْتُ إِذَا سَمِعْتُ مِنْ، رَسُولِ اللَّهِ ـ صلى الله عليه وسلم ـ حَدِيثًا يَنْفَعُنِي اللَّهُ بِمَا شَاءَ مِنْهُ وَإِذَا حَدَّثَنِي عَنْهُ غَيْرُهُ اسْتَحْلَفْتُهُ فَإِذَا حَلَفَ صَدَّقْتُهُ وَإِنَّ أَبَا بَكْرٍ حَدَّثَنِي وَصَدَقَ أَبُو بَكْرٍ قَالَ قَالَ رَسُولُ اللَّهِ ـ صلى الله عليه وسلم ـ ‏ “‏ مَا مِنْ رَجُلٍ يُذْنِبُ ذَنْبًا فَيَتَوَضَّأُ فَيُحْسِنُ الْوُضُوءَ ثُمَّ يُصَلِّي رَكْعَتَيْنِ – وَقَالَ مِسْعَرٌ ثُمَّ يُصَلِّي – وَيَسْتَغْفِرُ اللَّهَ إِلاَّ غَفَرَ اللَّهُ لَهُ ‏”‏ ‏

আলী ইবনু আবূ তালিব (রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, যখন আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর নিকট হাদীস শুনতাম, তখন আল্লাহ তার দ্বারা আমার যতটুকু উপকার করতে চাইতেন করতেন। আর অন্য কেউ তাঁর থেকে আমার নিকট হাদীস বর্ননা করলে আমি তাকে শপথ করাতাম। সে শপথ করার পর আমি তাকে বিশ্বাস করতাম। আবূ বাকর (রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু)  আমার নিকট হাদীস বর্ননা করতেন এবং তিনি সত্য বলতেন। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ কোন ব্যক্তি গুনাহ করার পর উত্তমরূপে উযূ (ওজু/অজু/অযু) করে দু রাকআত সালাত (নামায/নামাজ) পড়ে আল্লাহ্‌র নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করলে আল্লাহ তাকে ক্ষমা করে দেন। মিসআর (রহমাতুল্লাহ আলাইহি)-এর বর্ণনায় শুধু সালাত (নামায/নামাজ) উল্লেখ আছে (রাকআত সংখ্যা উল্লেখ নাই)। (সুনান ইবনে মাজাহ,হাদীস নং-১৩৯৫) তবে সাধারণ তওবার জন্য অযু জরুরি নয়।

অতএব অযু ছাড়া তওবা হয় না কিংবা অন্যের সহযোগিতা অপরিহার্য ইত্যাদি হচ্ছে কিছু ভ্রান্ত ও ভিত্তিহীন ধারণা। তওবা কী তা জানা থাকলে এ জাতীয় ভুল ধারণা সৃষ্টি হবে না ইনশাআল্লাহ।
তাওবা কবুল হওয়ার আলামত

যখন কোন ব্যক্তি তাওবার যাবতীয় শর্তপূরণ করে খালেসভাবে আল্লাহর দরবারে তাওবা করেন এবং গুনাহ মাপ চান, তখন আল্লাহ তা’আলা অবশ্যই তার তাওবা কবুল করেন এবং তাকে ক্ষমা করে দেন। তবে যখন কোন ব্যক্তি তাওবা করে, তার তাওবা কবুল হল কিনা তার কিছু আলামত আছে। যথা:

(এক) তাওবা করার পর লোকটির মধ্যে পরিবর্তন পরিলক্ষিত হয়। যেমন, সে এখন পূর্বের যে কোন সময়ের তুলনায় অধিক নম্র, ভদ্র ও নমনীয়,  পূর্বের তুলনায় অধিক নেক আমল করে, খারাপ সঙ্গীদের সাথে মিশে না, আলেম ওলামা ও ভালো লোকদের সাথে উঠা-বসা করে এবং গুনাহের কর্ম ও পাপাচার থেকে দূরে থাকতে চেষ্টা করে।

(দুই) সব সময় আল্লাহর পাকড়াও ও আযাবের ভয়ে ভীত সন্ত্রস্ত থাকে। এক মহুর্তের জন্যও সে আল্লাহর পাকড়াও থেকে নিজেকে নিরাপদ মনে করে না। সে মনে করে যে কোন সময় আল্লাহ আমাকে পাকড়াও করতে পারে। মৃত্যুর পূর্ব মুহুর্ত পর্যন্ত আল্লাহর ভয় তার অন্তরে বিদ্যমান থাকে। তার ভয় তখন দূর হয়, যখন মৃত্যুর ফেরেস্তা এসে তাকে বলে-
‘তোমরা ভয় পেয়ো না, দুশ্চিন্তা করো না এবং সেই জান্নাতের সু-সংবাদ গ্রহণ কর তোমাদেরকে যার ওয়াদা দেয়া হয়েছিল’।

(তিন) লোকটি সব সময় ইতিপূর্বে যে সব অপরাধ করেছে, তার উপর অত্যন্ত লজ্জা অনুভব করতে থাকে। সে সব সময় আফসোস করতে থাকে আর বলতে থাকে-  হায় এ অন্যায় কাজটি আমি কেন করলাম! আমি যদি এ কাজটি না করতাম!  কতই না ভালো হত! কারণ যে ব্যক্তি দুনিয়াতে তার অপকর্মের উপর লজ্জিত হবে না এবং আফসোস করবে না, আখেরাতে যখন সে আল্লাহর নেক বান্দাদের আমলের সাওয়াব ও বিনিময় এবং অবাধ্য বান্দাদের শাস্তি দেখতে পাবে, তখন সে লজ্জিত হবে এবং আফসোস করবে। কিন্তু তখন তার লজ্জা ও আফসোস কোন কাজে আসবে না।

তওবা কবুল হওয়ার শর্ত পাঁচটি:

(১) তওবা একনিষ্ঠতার সাথে হওয়া চাই এবং আল্লাহর প্রতি ভালবাসা ও তার মহত্বের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করা এবং তার কাছে কল্যাণের আশা করা এবং তাঁর শাস্তি থেকে ভয় পাওয়া। এ তওবা  দ্বারা পার্থিব কোন বস্তু কামনা অথবা কোন সৃষ্টজীবের কাছে কিছু প্রার্থনা না করা চাই। আর যদি কেউ এমনটি করে তাহলে তার তওবা কবুল হবে না। কেননা সে অসৎ উদ্দেশ্য নিয়ে তওবা করেছে। সে আল্লাহর কাছে তওবা করেনি এবং সে একটা নির্দিষ্ট উদ্দেশ্যে তওবা করেছে।

(২) তার পূর্বকৃত গুণাহর জন্য লজ্জিত ও  হীন হওয়া চাই এবং সে এই আশা করবে যে তার এই তওবা কবুল না হলে সে কিছুই অর্জন করতে পারবে না। আর তার এই তওবা হবে আল্লাহর ডাকে সাড়া দেয়া এবং তার কৃত অপরাধের শাস্তির ভয় স্মরণ করা। তাহলে তার তওবা হবে একান্ত বিশ্বাসের সাথে এবং চাক্ষুষের সাথে।

(৩) অতি তাড়াতাড়ি গুণাহের কাজ থেকে দূরে সরে যাওয়া। কেননা নিষিদ্ধ কাজ দ্বারা যদি অপরাধ হয়ে যায় তাহলে সে উহার মধ্যে ধাবিত হবে। আর তার অপরাধ যদি কোন আবশ্যকীয় কাজ বর্জনের মাধ্যমে হয় তাহলে তা অবশ্যই সাথে সাথে করে নিবে। যতটুকু সম্ভব সাথে সাথে পূরণ করে নিবে। যেমন যাকাত ও হজ্ব। আর কোন ব্যক্তি বারবার কোন অপরাধ করার দ্বারা তওবা করায় কোন লাভ নেই। ধরা যাক, কেউ সুদ খাওয়া থেকে তওবা করল অথচ সে সুদের কাজে কর্মে সর্বদা ব্যস্ত থাকে তাহলে তার এই ধরনের তওবা করার দ্বারা কোন লাভ হবে না। বরং তার তওবা হবে হাসি-ঠাট্টা ও বিদ্রুপ করার ন্যায়। বরং এর দ্বারা সে আল্লাহ তা’আলার আয়াতসমূহের সাথে অবজ্ঞা আচরণ করল। এর দ্বারা তাকে আল্লাহর রহমত থেকে দূরে সরিয়ে দিবে। আবার যদি কেউ তওবা করে যে, জামাতের সাথে নামায পড়া আর কখনো ত্যাগ করবে না, অথচ সর্বদা সে জামাতে নামায ত্যাগ করে চলে, তাহলে তার এই তওবা করার দ্বারা কোন লাভ হবে না। আর যখন সৃষ্টজীবের অধিকারের সাথে সংশ্লিষ্ট কোন ব্যাপারে অপরাধ করে বসে তখন সৃষ্টজীবের অধিকার আদায় না করা পর্যন্ত তার তওবা সঠিক হবে না। আর যখন কোন ব্যক্তি অন্যের সম্পদ অন্যায়ভাবে হস্তগত করে অথবা কারো সম্পদ নিয়ে আবার অস্বীকার করে তাহলে উক্ত ব্যক্তির সম্পদ ফিরিয়ে না দেয়া পর্যন্ত তওবা সঠিক হবে না। আর যদি ইতিমধ্যে উক্ত সম্পদের মালিক আরো পায় তাহলে তার উত্তরাধিকারীদের কাছে ফিরিয়ে দিবে। আর যদি তার কোন উত্তরাধিকারী জীবিত না থাকে তাহলে বাইতুল মালে আদায় করে দিবে। আর যদি এমন হয় যে, কোন ব্যক্তি এই হস্তগত সম্পদের মালিক তাহলে উক্ত সম্পদশীল ব্যক্তির নামে সাদকাহ করে দিবে। আর যদি কোন মুসলিমকে গীবত করার দ্বারা অপরাধ ঘটে যায় তাহলে উক্ত গীবত থেকে মুক্ত থাকা আবশ্যক হয়ে যায়। আর কোন অপরাধ বারবার করার পরও তওবা করা সঠিক হবে। কেননা আমল কোন কোন সময় কম হয়ে থাকে। আর ঈমান (তাওবা) বৃদ্ধি পেয়ে থাকে।

(৪) এ ধরনের সুদৃঢ় সিদ্ধান্ত নেয় যে, এই ধরনের অপরাধ ভবিষ্যতে আর কখনো করবে না। কেননা ইহা তাওবার ফল এবং তওবাকারীর জন্য একটা সত্যতার দলিল। যদি কেউ বলে যে, নিশ্চয় সে তওবা করছে এবং সুদৃঢ় সিদ্ধান্ত নিয়েছে আর কখনো করবে না অথবা তওবা করেছে এই নিয়তে যে সে বারবার এই কাজ করবে আবার  তওবা করবে তাহলে তার তওবা কবূলযোগ্য হবে না। কেননা তাহলে তার এই তওবা হবে সাময়িক যা দ্বারা তার কোন প্রকার দ্বীন ও দুনিয়ার উপকার আসবে না।

(৫) তওবা কবূলের সময় শেষ হবার পর আর কখনো গুণাহর কাজ করবে না। কেননা যদি তওবা কবূলের সময় শেষ হবার পর আবারও উক্ত গুণাহ করে তবে তার তওবা কবূল করা হবে না। আর তওবা কবূলের সময় শেষ হওয়া দু-ধরনের। একটি হলো ব্যাপকভাবে প্রত্যেকের জন্য। আর দ্বিতীয়টি হল প্রত্যেকটি ব্যক্তির নিজস্বতার জন্য।

তাওবার প্রতিবন্ধকতা:

(১) শয়তান মানুষের সামনে গুনাহগুলো সু-শোভিত করে তুলে এবং প্রিয় বানিয়ে দেয়। ফলে বান্দার অন্তর গুনাহের কর্মের দিক অগ্রসর ও ধাবিত হয়। আল্লাহ ও রাসূলের আনুগত্য করা হতে পলায়ন করে এবং ইবাদাত বন্দেগী করা তার নিকট কষ্টকর হয়।

(২) হারামকে হালাল হিসেবে তুলে ধরে এবং হালালকে হারাম হিসেবে তুলে ধরে শয়তান বান্দাকে ধোকায় ফেলে দেয়। এ ছাড়াও ভালো কাজকে খারাপ এবং খারাপ কাজকে ভালো হিসেবে প্রকাশ করে শয়তান মানুষকে ধোকা দেয়। ফলে তার আর তাওবা করার সুযোগ হয় না। সে যে অন্যায় করছে, তা সে বুঝতেই পারে না।

(৩) শয়তান বান্দাকে তাওবা থেকে ফিরানোর জন্য তারা তাকে বিভিন্ন ধরনের আশা দিয়ে থাকে। শয়তান বান্দাকে বলতে থাকে, তুমি তাওবা করতে এত তাড়াহুড়া করছ কেন? তোমারতো তাওবা করার এখনো অনেক সময় আছে। তুমি এখনো যুবক, পড়া লেখা শেষ করোনি, চাকুরি পাওনি ইত্যাদি। এরপর যখন চাকুরি পায় তখন বলে এখনো বিবাহ করোনি ইত্যাদি বলে শয়তান মানুষকে তাওবা থেকে ফিরিয়ে রাখে।  এ ধরনের সমস্য সামনে আসলে মৃত্যুর কথা স্মরণ করবে। কারণ, মৃত্যু ছোট বড় কাউকেই ছাড়ে না। যে কোন সময় যে কোন বয়সের লোকের মৃত্যু এসে যেতে পারে। তখন আর তাওবা করার সুযোগ থাকবে না।

(৪) গুনাহকে ছোট মনে করে তাওবা করা হতে বিরত থাকে। যখন কোন একটি গুনাহ করে, তখন শয়তান এসে বলে, এতো বড় ধরনের কোন অপরাধ নয় যে, তা হতে তাওবা করতে হবে। মানুষ এর চেয়ে আরও বড় বড় গুনাহ করে থাকে।

(৫) তাওবা করার পর গুনাহ ছেড়ে আল্লাহর আনুগত্যের উপর অবিচল থাকা কষ্টকর হওয়ার কারণে তাওবা করতে মনে চায় না। কারণ, যখন তাওবা করে তখন সাথীরা বলে তুমি এত কষ্ট করছ কেন? তোমার থেকে তোমার সাথীরা দূরে সরে যাচ্ছে, সবাই তোমার বিরুদ্ধে ক্ষেপে যাচ্ছে।

(৬) হতাশাও মানুষকে তাওবা থেকে ফিরিয়ে রাখে। কারণ, যখন কোন বান্দাহ গুনাহ করার পর তাওবা করতে চায়, তখন শয়তান এসে বলে, তোমার গুনাহ অনেক বড় যা আল্লাহ কখনোই ক্ষমা করবে না। যদি ক্ষমা নাই করে, তাহলে তাওবা করে লাভ কি? ফলে সে তাওবা করা হতে বিরত থাকে।

উল্লেখিত বিষয়গুলো যখন আপনার সামনে আসবে তখন আমরা আপনাকে বলব, আপনি শয়তানদের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করুন। নিশ্চয় শয়তানদের চক্রান্ত খুবই দুর্বল। আপনি শয়তানের বিরুদ্ধে সোচ্চার হন, এসব শয়তান ও তার দোসররা অবশ্যই থেমে যাবে অতঃপর খুব শীঘ্রই তার ষড়যন্ত্র দূর্বল হয়ে পড়বে এবং মুমিনের ধৈর্য ও দৃঢ়তার সামনে সে পরাজিত হবে।

আপনি নিশ্চিত থাকুন যে, আপনি যদি শয়তানের কথা মত চলেন, তার কাছে মাথা নত করেন, তাহলে সে আরো বেশী বেশী ধোকা আপনার বিরুদ্ধে দাঁড় করাবে। সুতরাং পূর্বে ও পরে সর্বাবস্থায় আপনিই ক্ষতিগ্রস্ত হবেন। অতএব তার অনুসরণ না করে আল্লাহর সাহায্য চান এবং বলুন: “আল্লাহই আমার জন্য যথেষ্ট এবং তিনিই আমার উত্তম অভিভাবক”।

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন কোন সম্প্রদায়ের ক্ষতির আশংকা করতেন তখন বলতেন: “হে আল্লাহ! আমি আপনাকে তাদের গলার উপর ছেড়ে দিচ্ছি এবং আপনার নিকট পরিত্রাণ চাচ্ছি তাদের খারাপী থেকে”।

অনেক সময় দেখা যায় গুনাহের কর্ম ছাড়ার কারণে তার সাথে তার খারাপ বন্ধুরা যাদের সাথে ইতিপূর্বে বন্ধুত্ব ছিল, তারা যোগাযোগ করে তাকে হুমকি দিয়ে বলে, তুমি এতদিন আমাদের সাথে ছিলে এখন কেন আমাদের থেকে দূরে সরে গেলে? আমাদের কাছে তোমার সব গোপন তথ্য আছে যেগুলো আমরা রেকর্ড করে রেখেছি, তোমার ছবিও আমাদের নিকট রয়েছে, তুমি যদি আমাদের সাথে বের না হও তাহলে তোমার পরিবারের নিকট সব ফাঁস করে দিবো! একথা সঠিক যে, আপনার অবস্থান খুবই নাজুক। এ ধরনের কোন পরিস্থিতির স্বীকার হলে, আপনাকে অবশ্যই মনে রাখতে হবে, আল্লাহ মুত্তাকিদের সাথে রয়েছেন, তাওবাকারীদের সাথে রয়েছেন এবং তিনি মুমিনদের অভিভাবক। তিনি তাদেরকে লাঞ্ছিত করবেন না এবং তাদেরকে ছেড়ে দিবেন না। তাঁর নিকট কোন বান্দা আশ্রয় নেয়ার পর সে কখনো অপমানিত হয় না। আপনি জেনে রাখুন, নিশ্চয় কঠিন অবস্থার সাথেই সহজ অবস্থা আসে এবং সংকীর্ণতার পরেই প্রশস্ততা আসে।

إِنَّ ٱللَّهَ يُحِبُّ ٱلتَّوَّٰبِينَ وَيُحِبُّ ٱلْمُتَطَهِّرِينَ

নিশ্চয় আল্লাহ তাওবাকারীদেরকে ভালবাসেন এবং ভালবাসেন অধিক পবিত্রতা অর্জনকারীদেরকে।  (সূরা বাকারা, আয়াত-২২২)

আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হওয়া যাবে না:

আপনি হয়তো আমাকে বলতে পারেন, আমি তাওবা করতে চাই কিন্তু আমার গুনাহের পরিমাণ অনেক বেশী, আমি আমার জীবনে যত রকমের গুনাহ আছে, তা সবই আমি করেছি। আমি জীবনে অনেক বড় বড় পাপ কামাই করেছি। অবস্থা এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, বিগত এত বছরের সব পাপ কি আল্লাহ আমাকে ক্ষমা করবেন?
হে সম্মানিত পাঠক ভাই! আপনাকে আমি বলছি, এটি বিশেষ কোন সমস্যা নয় বরং এটা অনেকেরই সমস্যা যারা তাওবা করতে চায়। গুনাহ যত বড় হোক না কেন, আল্লাহর রহমত ও দয়া তার চেয়ে অনেক বড়। আল্লাহ তা’আলা সব ধরনের পাপকেই ক্ষমা করবেন। আল্লাহ তা’আলা কুরানে করীমে স্বীয় বান্দাদের সম্বোধন করে বলেন,

قُلْ يَٰعِبَادِىَ ٱلَّذِينَ أَسْرَفُوا۟ عَلَىٰٓ أَنفُسِهِمْ لَا تَقْنَطُوا۟ مِن رَّحْمَةِ ٱللَّهِ ۚ إِنَّ ٱللَّهَ يَغْفِرُ ٱلذُّنُوبَ جَمِيعًا ۚ إِنَّهُۥ هُوَ ٱلْغَفُورُ ٱلرَّحِيمُ وَأَنِيبُوٓا۟ إِلَىٰ رَبِّكُمْ وَأَسْلِمُوا۟ لَهُۥ مِن قَبْلِ أَن يَأْتِيَكُمُ ٱلْعَذَابُ ثُمَّ لَا تُنصَرُونَ

“বলে দাও যে, [আল্লাহ বলেন] হে আমার বান্দাগণ! যারা নিজেদের উপর অত্যাচার করেছো, তোমরা আল্লাহ তা’আলার রহমত হতে নিরাশ হয়ো না। নিঃসন্দেহে আল্লাহ অতীতের সমস্ত গুনাহ ক্ষমা করবেন, নিশ্চয়ই তিনি বড়ই ক্ষমাশীল, দয়ালু। আর তোমরা তোমাদের রবের দিকে প্রত্যাবর্তন কর এবং তার নিকট আত্মসমর্পণ কর আযাব আসার পূর্বেই, অতঃপর আর তোমাদেরকে সাহায্য করা হবে না”। (সূরা আয যুমার,আয়াত-৫৩-৫৪)

আল্লাহ তা’আলা বান্দাদের আল্লাহর রহমত থেকে হতাশ হতে নিষেধ করেছেন। আল্লাহ মানুষকে ক্ষমা করবেনই।

حَدَّثَنَا أَنَسُ بْنُ مَالِكٍ، عَنِ النَّبِيِّ صلى الله عليه وسلم صلى الله عليه وسلم‏.‏ وَحَدَّثَنَا هُدْبَةُ، حَدَّثَنَا هَمَّامٌ، حَدَّثَنَا قَتَادَةُ، عَنْ أَنَسٍ ـ رضى الله عنه ـ قَالَ قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم ‏ “‏ اللَّهُ أَفْرَحُ بِتَوْبَةِ عَبْدِهِ مِنْ أَحَدِكُمْ سَقَطَ عَلَى بَعِيرِهِ، وَقَدْ أَضَلَّهُ فِي أَرْضِ فَلاَةٍ ‏”‏‏.

আনাস হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ  সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম  বলেছেনঃ আল্লাহ তা‘আলা বান্দার তাওবাহর কারণে সেই লোকটির চেয়েও অধিক খুশী হন, যে লোকটি মরুভূমিতে তাঁর উট হারিয়ে পরে তা পেয়ে যায়। (সহীহ বুখারী,হাদিস নং-৬৩০৯)

قَالَ أَبُو هُرَيْرَةَ سَمِعْتُ رَسُوْلَ اللهِ صلى الله عليه وسلم يَقُوْلُ وَاللهِ إِنِّي لأَسْتَغْفِرُ اللهَ وَأَتُوبُ إِلَيْهِ فِي الْيَوْمِ أَكْثَرَ مِنْ سَبْعِينَ مَرَّةً

আবূ হুরাইরাহ বর্ণনা করেন, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -কে বলতে শুনেছিঃ আল্লাহর শপথ! আমি প্রতিদিন আল্লাহর কাছে সত্তরবারেরও অধিক ইস্তিগফার ও তাওবাহ করে থাকি।  (সহীহ বুখারী,হাদিস নং-৬৩০৭)

মোট কথা পাপের পরিমাণ যত বেশী হোক না কেন আল্লাহ তা’আলা অবশ্যই ক্ষমা করবেন। কিন্তু তারপরও আমাদের অন্তরে এ অনুভূতি জাগে আল্লাহ আমাদের ক্ষমা করবেন কিনা? এ অনুভূতি জাগ্রত হওয়া কারণ হচ্ছে:

প্রথমত: আল্লাহর রহমত ও ক্ষমার ব্যাপকতা সম্পর্কে বান্দার অন্তরে দৃঢ় বিশ্বাস না থাকা। এর ব্যাখ্যা হিসেবে মহান আল্লাহর এ বাণীই যথেষ্ট হবে:

إِنَّ ٱللَّهَ يَغْفِرُ ٱلذُّنُوبَ جَمِيعًا ۚ إِنَّهُۥ هُوَ ٱلْغَفُورُ ٱلرَّحِيم

“নিঃসন্দেহে আল্লাহ অতীতের সমস্ত গুনাহ ক্ষমা করবেন; নিশ্চয়ই তিনি বড়ই ক্ষমাশীল, দয়ালু”।  (সূরা আযযুমার,আয়াতঃ৫৩)

দ্বিতীয়ত: আল্লাহর রহমত যে কত ব্যাপক সে সম্পর্কে ঈমানে ঘাটতি থাকা। এক্ষেত্রে নিম্নের হাদীসে কুদসীই যথেষ্ট। মহান আল্লাহ বলেন, “যে ব্যক্তি জানলো যে, আমি গুনাহ মাফ করার ক্ষমতা রাখি তাহলে তাকে ক্ষমা করে দেব এ ব্যাপারে কোন কিছুতেই পরওয়া করবো না, যদি সে আমার সাথে কোন কিছু শরীক অংশীদার না করে থাকে”। এটি হবে, যখন বান্দা আল্লাহর সাথে পরকালে সাক্ষাত করবে।

তৃতীয়ত: তাওবার কার্যকর ক্ষমতা সম্পর্কে এ ধারণা না থাকা যে, তা সব গুনাহকেই ক্ষমা করে দিতে পারে। এক্ষেত্রে রাসূলের এ হাদীসই যথেষ্ট, “যে ব্যক্তি তাওবা করবে তার যেন কোন গুনাহ থাকবে না।”

অপরাধ যত বড়ই হোক আল্লাহর ক্ষমা তার চেয়েও বড় অপরাধ ও গুনাহ যত বড় বা বেশি হোক না কেন, যখন বান্দা তাওবা করবেন, আল্লাহ তা’আলা তার অপরাধকে অবশ্যই ক্ষমা করে দেবেন। আমাদের কারো মনে এমন কোন প্রশ্ন  জাগে যে, আল্লাহ তা’আলা কি ছোট বড় সব ধরনের গুনাহ ক্ষমা করবেন?। অপরাধ যদি বড় হয় তাও কি তিনি ক্ষমা করবেন?। তার উত্তর হল হ্যাঁ যত বড় অন্যায় হোক না কেন আল্লাহ অবশ্যই ক্ষমা করে দেবেন। আল্লাহ তা’আলা বলেন,

وَهُوَ ٱلَّذِي يَقۡبَلُ ٱلتَّوۡبَةَ عَنۡ عِبَادِهِۦ وَيَعۡفُواْ عَنِ ٱلسَّيِّ‍َٔاتِ وَيَعۡلَمُ مَا تَفۡعَلُونَ

“আর তিনিই তাঁর বান্দাদের তাওবা কবূল করেন এবং পাপসমূহ ক্ষমা করে দেন। আর তোমরা যা কর, তা তিনি জানেন।(সুরা আশ শুরা,আয়াত-২৫)

আল্লাহ তা’আলা আরও বলেন,

غَافِرِ ٱلذَّنۢبِ وَقَابِلِ ٱلتَّوۡبِ شَدِيدِ ٱلۡعِقَابِ ذِي ٱلطَّوۡلِۖ لَآ إِلَٰهَ إِلَّا هُوَۖ إِلَيۡهِ ٱلۡمَصِيرُ

“তিনি পাপ ক্ষমাকারী, তাওবা কবূলকারী, কঠোর আযাবদাতা, অনুগ্রহ বর্ষণকারী। তিনি ছাড়া কোন সত্য ইলাহ নেই। তাঁর দিকেই প্রত্যাবর্তন”। (সূরা গাফির/ফুসসিলাত,আয়াত-৩)

আল্লাহ তা’আলা আরও বলেন,

وَمَن يَعۡمَلۡ سُوٓءًا أَوۡ يَظۡلِمۡ نَفۡسَهُۥ ثُمَّ يَسۡتَغۡفِرِ ٱللَّهَ يَجِدِ ٱللَّهَ غَفُورٗا رَّحِيمٗا

“আর যে ব্যক্তি মন্দ কাজ করবে কিংবা নিজের প্রতি যুলম করবে তারপর আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাইবে, সে আল্লাহকে পাবে ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু”। (সূরা নিসা,আয়াত-১১০)

যদি আপনি এ পরিমাণ অপরাধ করেন, ফলে আপনার গুনাহ আকাশ ছুঁয়ে গেল, অতঃপর আপনি লজ্জিত হয়ে ফিরে আসলেন এবং আল্লাহর দরবারে তাওবা করলেন, আল্লাহ তা’আলা আপনার তাওবা অবশ্যই কবুল করবেন এবং আপনাকে ক্ষমা করে দেবেন।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

Back to top button
Close