কবরের শান্তি ও জান্নাতের বর্ণনামুফতি যাকারিয়্যা মাহমূদ-এর কলাম

জান্নাত চির শান্তি ও সুখের ঠিকানা

জান্নাত চির শান্তির স্থান ও সুখের ঠিকানা। মানুষ ও জিনদের অন্তহীন চাওয়া-পাওয়া, পরম সুখ-শান্তি এবং ভোগ-বিলাসের অকল্পনীয় পূর্ণতা লাভের একমাত্র স্থান জান্নাত। জান্নাত আসলে কেমন বা এর এর প্রকৃত অবস্থা কি তা বর্ণনা করে শেষ করা যাবেনা। তাই রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহ ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেন, মহান আল্লাহ বলেন, ‘আমি আমার সৎকর্মশীল বান্দাদের জন্য (এমন নিয়ামত) প্রস্তুত করে রেখেছি, যা কোনো চোখ দেখেনি, কোনো কান শোনেনি, এমনকি কোনো মানুষ তা কল্পনাও করতে পারে না।’ (বুখারী ও মুসলিম)।

জান্নাতের সংখ্যা:
জান্নাতের নাম, অর্থ ও শব্দের উৎপত্তি সম্পর্কে আল্লামা ইবনুল কাইয়িম (রহ.) বলেন, জান্নাতের গুণাবলির বিবেচনায় জান্নাতের নাম একাধিক; কিন্তু জান্নাত একাধিক নয় একটিই। সুতরাং এ দিকটির বিবেচনায় একাধিক নামের অর্থ অভিন্ন আর জান্নাতের গুণাবলির দিক বিবেচনায় প্রতিটি নামের অর্থ ভিন্ন। (হাদিউল আরওয়াহ, পৃষ্ঠা: ১১১)।

জান্নাতের অবস্থান:
(১) আল্লাহ তাআলা বলেন: আর আকাশে রয়েছে তোমাদের রিযিক এবং যা কিছুর প্রতিশ্রুতি তোমাদের দেয়া হয়েছে। {সূরা যারিয়াত:২২}

(২) আল্লাহ তাআলা অন্যত্র বলছেন: নিশ্চয় তিনি তাকে আরেকবার দেখেছিলেন, সিদরাতুল মুনতাহার নিকট, যার নিকট অবস্থিত জান্নাতুল মা’ওয়া। { সূরা নাজম:১৩-১৫}

(৩) আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহ ওয়াসাল্লাম থেকে বর্ণনা করছেন, রাসূলুল্লাহ বলেন: যে ব্যক্তি আল্লাহ ও রাসূলের প্রতি ঈমান আনবে, সালাত কায়েম করবে, রমযানের সিয়াম পালন করবে, তাকে জান্নাতে প্রবেশ করানো আল্লাহর দায়িত্ব হয়ে যাবে। সে ব্যক্তি আল্লাহর রাস্তায় হিজরত করুক বা নিজ জন্মভূমিতে অবস্থান করুক। লোকেরা বলল: ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমরা কি এ বিষয়ে অন্যান্য লোকদের সংবাদ দেব না? রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন: নিশ্চয় জান্নাতে একশত স্তর রয়েছে, যেগুলো আল্লাহ তাআলা তাঁর রাস্তায় জিহাদকারী -মুজাহিদদের জন্য তৈরী করেছেন। দুই স্তরের মাঝে দূরত্ব হচ্ছে আকাশ-যমীনের মাঝের দূরত্বের সমান। সুতরাং তোমরা যখন আল্লাহর নিকট জান্নাত প্রার্থনা করবে তখন ফিরদাউস প্রার্থনা করবে। কেননা এটি সর্বোচ্চ স্তরের জান্নাত যা জান্নাতের মধ্যবর্তী স্থানে অবস্থিত। তার উপর রয়েছে দয়াময় মহান আল্লাহর আরশ। এবং জান্নাতের স্রোতস্বিনীসমূহ তার থেকেই প্রবাহিত হয়েছে।(সহীহ বুখারী-৭৪২৩)

(৪) হাদীসে আরো এসেছে. আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, মুমিনের মৃত্যু সময় উপস্থিত হলে রহমতের ফেরেশতাবৃন্দ উপস্থিত হয়। অত:পর তার জান কবজ করা হলে তাকে শুভ্র রেশমী কাপড়ে রাখা হয় এবং আকাশের দরজাপানে নিয়ে যাওয়া হয়। তখন তারা বলাবলি করে, আমরা এর চেয়ে উন্নত সুঘ্রাণ আর কখনো পাইনি। (হাকেম-১৩০৪, ইবনে হিব্বান-৩০১৩, সনদ সহীহ)

জান্নাতের কিছু প্রসিদ্ধ নাম:

১- জান্নাত: আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করছেন: যারা আল্লাহ ও রাসূলের আদেশ মত চলবে, তিনি তাদেরকে এমন জান্নাতে প্রবেশ করাবেন, যেগুলোর তলদেশ দিয়ে স্রোতাস্বিনী প্রবাহিত হবে। তারা সেখানে চিরকাল থাকবে। সেটি বিরাট সাফল্য। {সূরা নিসা-১৩}
২- জান্নাতুল ফিরদাউস: আল্লাহ তাআলা বলেন: নিশ্চয় যারা ঈমান এনেছে এবং সৎকর্ম সম্পাদন করেছে তাদের অভ্যর্থনার জন্য রয়েছে জান্নাতুল ফেরদাউস। {সূরা কাহফ-১০৭}
৩- জান্নাতু আদন: ইরশাদ হচ্ছে: এ এক মহা আলোচনা। তাকওয়া অবলম্বনকারীদের জন্য রয়েছে উত্তম ঠিকানা-জান্নাতু আদন তথা স্থায়ী বসবাসের জান্নাত; তাদের জন্য তার দরজাসমূহ রয়েছে উন্মুক্ত। {সূরা স্বদ-৪৯-৫০}
৪- জান্নাতুল খুলদ: ইরশাদ হচ্ছে: বল, এটা উত্তম না জান্নাতুল খুলদ-চিরকাল বসবাসের জান্নাত। যার প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়েছে মুত্তাকীদের? সেটা হবে তাদের প্রতিদান ও প্রত্যাবর্তন স্থল। {সূরা ফুরকান-১৫}
৫- জান্নাতুন নাঈম: আল্লাহ তাআলা বলেন: যারা ঈমান এনেছে এবং নেক আমল সম্পাদন করে তাদের জন্য রয়েছে জান্নাতুন না’য়ীম তথা নিয়ামতপূর্ণ জান্নাত। { সূরা লোকমান-৮}
৬- জান্নাতুল মাওয়া: ইরশাদ হচ্ছে: যারা ঈমান এনেছে এবং সৎকর্ম সম্পাদন করে তাদের জন্য রয়েছে তাদের কৃতকর্মের প্রতিদান স্বরূপ জান্নাতুল মাওয়া।এটি আতিথীয়তার আঙ্গিকে তাদের প্রদান করা হবে।{সূরা সাজদাহ-১৯}
৭- দারুস সালাম: আল্লাহ বলেন: তাদের জন্য রয়েছে তাদের প্রতিপালকের নিকট দারুস সালাম তথা শান্তি নিকেতন। আর তাদের কর্মের কারণে তিনিই হচ্ছেণ তাদের অভিভাবক। {সূরা আনআম-১২৭}

জান্নাতের প্রবেশদারের সংখ্যা:
১- আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করছেন: আর যারা স্বীয় পালনকর্তাকে ভয় করে চলত, তাদেরক দলে দলে জান্নাতের দিকে নিয়ে যাওয়া হবে। যখন তারা জান্নাতের নিকট উপস্থিত হবে ও এব দ্বারসমূহ খুলে দেয়া হবে এবং জান্নাতের রক্ষীরা তাদেরকে বলবে: তোমাদের প্রতি সালাম, তোমরা সুখে থাক, অত:পর সদা সর্বদা বসবাসের জন্য জান্নাতে প্রবেশ কর। {সূরা যুমার-৭৩}

(২) সাহল বিন সা’দ রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন: জান্নাতে আটটি দরজা রয়েছে, এর একটির নাম হচ্ছে রাইয়ান। রোযাদাররা ব্যতীত অন্য কেউ এটি দিয়ে প্রবেশ করতে পারবে না। (বুখারী-৩২৫৭, মুসলিম-১১৫২)

জান্নাতের প্রবেশদারসমূহের নাম:
আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন: যে ব্যক্তি দুটি প্রিয় বস্তু আল্লাহর রাস্তায় খরচ করবে, জান্নাতের প্রবেশদার সমূহ থেকে আহ্বান করা হবে, হে আল্লাহর বান্দা! এটি উত্তম-কল্যাণকর। সুতরাং যে নামাযী হবে, তাকে নামাযের দরজা থেকে আহ্বান করা হবে। জিহাদে অংশগ্রহণকারী মুজাহিদকে ডাকা হবে জিহাদের দরজা দিয়ে। সিয়াম পালনকারীকে রাইয়ান নামক দরজা থেকে আহ্বান করা হবে। দান-সদকাকারী দানবীরকে সদকার দরজা থেকে ডাকা হবে। আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহু বললেন: ইয়া রাসূলুল্লাহ! আমার পিতা মাতা আপনার তরে উৎসর্গ হোক। উপরোক্ত সকল দরজা দিয়ে একজনকে ডাকা আবশ্যক নয়। তবুও এমন কেউকি আছে? যাকে প্রত্যেক দরজা দিয়ে ডাকা হবে? নবীজী বললেন: হ্যাঁ, আর আমি আশা করছি তুমিও হবে তাদের একজন। (বুখারী-১৮৯৭, মুসলিম-১০২৭)

জান্নাতের দরজাসমূহের প্রশস্ততা:
(১) উতবা বিন গযওয়ান রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: আমাদের বলা হল যে, জান্নাতের দরজার দুই পাল্লার মাঝের দূরত্ব চল্লিশ বছর ভ্রমনপথের দূরত্বের সমান। আর এমন একদিন আসবে যে, ভিড়ের কারণে (মনে হবে)সেটি অতিভোজন করা পেট। (সহীহ মুসলিম-২৯৬৭)

(২) আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: একদা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট গোশত হাদিয়া আসল… হাদীসের শেষাংশে আছে। রাসূলুল্লাহ বলেন: সে সত্তার শপথ যার হাতে আমার জীবন, নিশ্চয় জান্নাতের দরজার দুই পাল্লার মাঝের দূরত্ব মক্কা ও হাজার অথবা মক্কা ও বসরার মাঝের দূরত্বের সমান। (সহীহ মুসলিম-২৯৬৭)

লেখক: মুফতি যাকারিয়্যা মাহমূদ মাদানী
বি.এ. অনার্স, এম.এ, এমফিল (ইসলামী আইন, বিচার ব্যবস্থা ও রাষ্ট্র বিজ্ঞান): মদীনা বিশ্ববিদ্যালয়, সৌদি আরব।
বি.এ. অনার্স (আরবি ভাষা ও সাহিত্য): আন্তর্জাতিক ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় চট্টগ্রাম (IIUC)।
দাওরায়ে হাদীস-এম.এ: জামেয়া কুরআনিয়া লালবাগ, ঢাকা।
ইফতা: জামেয়া মাদানিয়া যাত্রাবাড়ী, ঢাকা।
সহকারী ইনচার্জ ও আলোচক: মা‘রাদুল কুরআনিল কারীম, মসজিদে নববী, মদীনা মুনাওয়ারা, সৌদি আরব। (প্রাক্তন)
প্রতিষ্ঠাতা প্রিন্সিপাল: মাদরাসাতুল মাদীনাহ লিল বানাত, উত্তর বিশিল, মিরপুর-১, ঢাকা-১২১৬।
প্রধান গবেষক: আস-সুন্নাহ ফাউন্ডেশন ও ইন্সটিটিউট, ঢাকা।
পরিচালক: ভয়েস অব ইসলাম।
সম্পাদক ও প্রকাশক: ডেইলি মাই নিউজ ও প্রবাসীকাল ডটকম।
jakariyamahmud@gmail.com

 

আরও পোস্ট

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

Back to top button
Close