কবরের শাস্তি ও জাহান্নামের বর্ণনামুফতি যাকারিয়্যা মাহমূদ-এর কলাম

জাহান্নাম চির দুঃসহ যন্ত্রণাকর এক ভয়ঙ্কর ঠিকানা

জাহান্নাম কি?

পৃথিবীতে মানুষ যে ধরণের কর্ম করবে আখেরাতে সে ধরণের ফল ভোগ করবে। কেউ সৎকাজ করে তার চূড়ান্ত পুরস্কার হবে স্বপ্নের জান্নাত। আর কেউ অসৎ ও মন্দ কাজ করে তার শেষ পরিণতি হবে জাহান্নাম। জাহান্নাম বহু বিচিত্র রকমের অসহনীয় অব্যক্ত যাতনার এক ভয়ংকর ঠিকানা ও পরকালের এক চরম ভয়াবহ, ভীতিকর ও নিকৃষ্ট আবাসস্থল। চির দুঃখ, দুর্দশা, কষ্ট-ক্লেশ, লজ্জা-শরম, অপমান, অসম্মান, পেরেশানী, হতাশ-নিরাশা, অশান্তি, দুর্ভাগ্য, ক্ষুধা-পিপাসা, শারীরিক, মানসিক লাঞ্ছনা-গঞ্জনা, বিড়ম্বনা, আগুন,  চীৎকার-কান্নাকাটি, শাস্তি, অভিশাপ, আযাব-গযব ও অসন্তোষের এক ভিবিষিকাময় স্থানের নাম হল জাহান্নাম। ভয়ংকর এই জায়গায় শান্তির লেশ নেই। জাহান্নামে শুধু আযাব আর আযাব, শাস্তি আর শাস্তি। আগুণ আর আগুণ অথবা তীব্র হিমপ্রবাহ বা প্রচণ্ড ঠাণ্ডা বায়ু।

কুরআন ও হাদীসের বর্ণনা থেকে স্পষ্ট হয় যে, জাহান্নামীদের উপর, নীচ এবং ডান ও বাম থেকে প্রবল অগ্নিশিখা স্পর্শ করবে, জ্বালিয়ে পুড়িয়ে সব ছারখার করে দিবে। ভস্ম করে দিবে পুরো দেহ। একবার চামড়া পুড়ে গেলে পুনরায় নতুন চামড়া লাগানো হবে, যেন ভালো করে আগুনের স্বাদ আস্বাদন করতে পারে জাহান্নামীরা

পিপাসায় কাতর হয়ে যাবে। কলিজা ফেটে যাওয়ায়র উপক্রম হবে। অতি দুর্গন্ধময় যাক্কুম এবং কাঁটাযুক্ত ঘাস ও গিসলিন হবে তাদের খাদ্য। ক্ষুধার তাড়নায় জঠর জ্বালায় তা ভক্ষণ করতে গেলে পেটে ফেরে ভিতর থেকে সব বেরিয়ে যাবে। সে আযাব হবে বড়ই কঠিন! বড়ই করুণ! জাহান্নামীরা এই কঠিন শাস্তির তিব্রতা সহ্য করতে না পেরে মৃত্যু কামনা করবে, কিন্তু জান্নাত-জাহান্নামে কোনো মৃত্যু নেই।অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ, হৃৎপিন্ড, নাড়ী-ভূড়ি, শিরা-উপশিরা, অস্থিমজ্জা ইত্যাদির বিকৃতি ঘটবে, কিন্তু সেই তীব্র যন্ত্রণাকর আযাব হতে মুক্তির কোনো দিশা পাবেনা। নিরুপায় হয়ে তারা জাহান্নাম থেকে বাইরে যেতে চাইবে। পালিয়ে রাস্তা সন্ধান করবে, রাস্তা  কিন্তু সেই সুযোগও তাদের দেয়া হবেনা। তারা না মুক্তি পাবে না পালাতে পারবে। অগত্যা তারা জাহান্নামেই অবস্থান করবে। এভাবেই জাহান্নামীরা কঠিন থেকে কঠিনতর আযাব ভোগ করতে থাকবে।

মোটকথা, আল্লাহ্‌ তাআলা কাফের, মুশরিক, মুনাফিক ও পাপিষ্ঠদের জন্য এই জাহান্নামকে প্রস্তুত করে রেখেছেন। পক্ষান্তরে তাওহীদবাদী মুমিন, মুসলিমদের জন্য তিনি বানিয়ে রেখেছেন অফুরন্ত ও চির সুখ-শান্তির ঠিকানা জান্নাত।  অর্থাৎ মানুষ সৎকর্মশীল হলে জান্নাতে এবং অসৎকর্মশীল হলে জাহান্নামে বসবাস করবে। জান্নাতের সুখ যেমন মানুষের কল্পনার বাইরে। জাহান্নামের শাস্তিও তেমনি মানুষের ধারণার বাইরে। বক্ষমান প্রবন্ধে কুরআন ও সহী হাদীসের আলোকে জাহান্নামের বিভিন্ন অবস্থা সম্পর্কে কিঞ্চিৎ আলোকপাত করা হয়েছে।

জাহান্নামের নাম সমূহ:

কুরআনুল কারীমে জাহান্নামকে বিভিন্ন নামে উল্লেখ করা হয়েছে। এখানে কিছু নাম উল্লেখ করা হল, জাহীম (জ্বলন্ত আগুন), হুতামাহ (চূর্ণবিচূর্ণকারী), হাবিয়াহ (অতল গহবর), সা’ঈর (উজ্জ্বল অগ্নিকাণ্ড), সাকার, আন-নার (অগ্নি)।

জাহান্নামের অস্তিত্বের প্রমাণ:

কুরআন থেকে দলীল:

১- আল্লাহ তা‘আলা বলেন: ‘তোমরা জাহান্নামকে ভয় কর যা প্রস্তুত করা হয়েছে কাফিরদের জন্য’ (সূরা আল-ইমরান-১৩১)

২- আল্লাহ তা‘আলা বলেন: ‘নিশ্চয়ই জাহান্নাম গোপন ফাঁদ। সীমালংঘনকারীদের জন্য প্রত্যাবর্তন স্থল’ (সূরা নাবা-২১-২২)

আয়াত দুটি স্পষ্ট বুঝা গেল জাহান্নামের অস্তিত্ব রয়েছে। আল্লাহ্‌ তাআলা জাহান্নামকে সৃষ্টি করে রেখেছেন। প্রস্তুত করে রেখেছেন অবিশ্বাসী কাফের ও পাপিষ্ঠ বান্দাদের জন্য।

হাদীস থেকে দলীল:

১- আবু হুরায়রাহ রা. হতে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, আল্লাহ তা‘আলা যখন জান্নাত সৃষ্টি করলেন, তখন জিবরাইল আ. কে বললেন, যাও, জান্নাত দেখে আস। তিনি গিয়ে উহা এবং উহার অধিবাসীদের জন্য যেই সমস্ত জিনিস আল্লাহ তাআলা তৈরী করে রেখেছেন, সবকিছু দেখে আসলেন, এবং বললেন, হে আল্লাহ! তোমার ইজ্জতের কসম! যে কেহ এই জান্নাতের অবস্থা সম্পর্কে শুনবে, সে অবশ্যই উহাতে প্রবেশ করবে। (অর্থাৎ, প্রবেশের আকাঙ্খা করবে)। অতঃপর আল্লাহ তাআলা জান্নাতের চারপার্শে কষ্টসমূহ দ্বারা বেষ্টন করে দিলেন, অতঃপর পুনরায় জিবরাইল আ. কে বললেন, হে জিবরাইল! আবার যাও এবং পুনরায় জান্নাত দেখে আস। তিনি গিয়ে উহা দেখে আসলেন এবং বললেন, হে আল্লাহ! এখন যা কিছু দেখলাম, উহার প্রবেশপথ যে কষ্টকর। আমার আশংকা হচ্ছে যে, কোন একজনই উহাতে প্রবেশ করবে না। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, অতঃপর আল্লাহ তা‘আলা যখন জাহান্নামকে সৃষ্টি করলেন, তখন বললেন, হে জিবরাইল! যাও, জাহান্নাম দেখে আস। তিনি দেখে এসে বলবেন, হে আল্লাহ! তোমার ইজ্জতের কসম! যে কেহ এই জাহান্নামের ভয়ংকর অবস্থার কথা শুনবে, সে কখনও উহাতে প্রবেশ করবে না। (অর্থাৎ, এমন কাজ করবে, যাতে উহা হতে বেঁচে থাকতে পারে)। অতঃপর আল্লাহ তাআলা জাহান্নামের চারপার্শে প্রবৃত্তির আকর্ষণীয় বস্তু দ্বারা বেষ্টন করলেন এবং পুনরায় জিবরাইলকে বললেন, আবার যাও এবং দ্বিতীয়বার উহা দেখে আস। তিনি গেলেন এবং এবার দেখে এসে বললেন, হে আল্লাহ! তোমরা ইজ্জতের কসম করে বলছি, আমার আশংকা হচ্ছে, একজন লোকও উহাতে প্রবেশ ব্যতীত বাকী থাকবে না। (আবু দাউদ-৪৭৪৬, তিরমিযী-২৫৬০, নাসাঈ-৩৭৬৩, মিশকাত-৫৪৫২)

২- আব্দুল্লাহ ইবনু আব্বাস রা. হতে বর্ণিত। তিনি বলেন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সময় সূর্যগ্রহণ হল। লোকেরা জিজ্ঞেস করল, হে আল্লাহর রাসূল! আমরা দেখলাম, আপনি নিজের জায়গা হতে কি যেন ধরছেন, আবার দেখলাম, আপনি যেন পিছনে সরে এলেন। তিনি বললেন, আমিতো জান্নাত দেখছিলাম এবং এক গুচ্ছ আঙ্গুরের প্রতি হাত বাড়িয়েছিলাম। আমি তা পেয়ে গেলে দুনিয়া কায়েম থাকা পর্যন্ত অবশ্য তোমরা তা খেতে পারতে। অতঃপর আমাকে জাহান্নাম দেখানো হয়, আমি আজকের মত ভয়াবহ দৃশ্য কখনো দেখিনি। আমি দেখলাম, জাহান্নামের অধিকাংশ বাসিন্দা নারী। লোকেরা জিজ্ঞেস করল, হে আল্লাহর রাসূল! কী কারণে? তিনি বললেন, তাদের কুফরীর কারণে। জিজ্ঞেস করা হল, তারা কি আল্লাহর সাথে কুফরী করে? তিনি জবাব দিলেন, তারা স্বামীর অবাধ্য থাকে এবং ইহসান অস্বীকার করে। তুমি যদি তাদের কারো প্রতি সারা জীবন সদাচারণ কর, অতঃপর সে তোমার হতে (যদি) সামান্য ত্রুটি পায়, তাহলে বলে ফেলে, তোমার কাছ থেকে কখনো ভাল ব্যবহার পেলাম না। (বুখারী-১০৫২, মুসলিম-৯০৭)

৩- আব্দুল্লাহ ইবনু উমার রা. হতে বর্ণিত যে, আল্লাহর রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, তোমাদের কেউ মারা গেলে অবশ্যই তার সামনে সকাল ও সন্ধ্যায় তার অবস্থানস্থল উপস্থাপন করা হয়। যদি সে জান্নাতী হয়, তবে (অবস্থানস্থল) জান্নাতীদের মধ্যে দেখানো হয়। আর সে জাহান্নামী হলে, তাকে জাহান্নামীদের (অবস্থানস্থল দেখানো হয়) আর তাকে বলা হয়, এ হচ্ছে তোমার অবস্থান স্থল, ক্বিয়ামত দিবসে আল্লাহ তোমাকে পুনরুত্থিত করা অবধি। (বুখারী-১৩৭৯, মুসলিম-২৮৬৬)

৪- আবু হুরায়রাহ রা. বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, আমি আমর ইবনু আমির ইবনে লুহাই খুযআহ্‌কে তার বহির্গত নাড়িভুঁড়ি নিয়ে জাহান্নামের আগুনে চলাফেরা করতে দেখেছি। সেই প্রথম ব্যক্তি যে সায়্যিবাহ্ উৎসর্গ করার প্রথা প্রচলন করে। (বুখারী-৩৫২১)

স্বপ্নে আব্দুল্লাহ বিন ওমর রা.-এর জাহান্নাম দর্শন:

আব্দুল্লাহ বিন ওমর রা. হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর বেশ কয়েকজন সাহাবী রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর যুগে স্বপ্ন দেখতেন। অতঃপর তাঁরা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কাছে তা বর্ণনা করতেন। আর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এগুলোর ব্যাখ্যা দিতেন যা আল্লাহ ইচ্ছা করতেন। আমি তখন অল্প বয়সের যুবক। আর বিয়ের পূর্বে মসজিদই ছিল আমার ঘর। আমি মনে মনে নিজেকে সম্বোধন করে বললাম, যদি তোমার মধ্যে কোন কল্যাণ থাকত তাহলে তুমি তাঁদের মত স্বপ্ন দেখতে। আমি এক রাতে বিছানায় শুয়ে শুয়ে বললাম, হে আল্লাহ! আপনি যদি জানেন যে, আমার মধ্যে কোন কল্যাণ আছে তাহলে আমাকে কোন একটি স্বপ্ন দেখান। আমি ঐ অবস্থায়ই (ঘুমিয়ে) থাকলাম। দেখলাম আমার কাছে দু’জন ফেরেশতা এসেছেন। তাঁদের প্রত্যেকের হাতেই লোহার একটি করে হাতুড়ি। তারা আমাকে নিয়ে (জাহান্নামের দিকে) এগোচ্ছে। আর আমি তাঁদের দু’জনের মাঝে থেকে আল্লাহর কাছে দু’আ করছি, হে আল্লাহ! আমি জাহান্নাম থেকে আপনার আশ্রয় প্রার্থনা করছি। এরপর আমাকে দেখানো হল যে, একজন ফেরেশতা আমার কাছে এসেছেন। তাঁর হাতে লোহার একটি হাতুড়ি। সে আমাকে বলল, তোমার অবশ্যই কোন ভয় নেই। তুমি খুবই ভাল লোক, যদি অধিক করে ছালাত আদায় করতে! তাঁরা আমাকে নিয়ে চলল, অবশেষে তাঁরা আমাকে জাহান্নামের কিনারায় দাঁড় কারালেন, (যা দেখতে) কূপের মত গোল আকৃতির। আর কূপের মত এরও রয়েছে অনেক শিং। আর দু’শিং-এর মাঝখানে একজন ফেরেশতা, যার হাতে লোহার একটি হাতুড়ি। আর আমি এতে কিছু লোককে (জাহান্নামে) শিকল পরিহিত দেখলাম। তাদের মাথা ছিল নিচের দিকে। কুরাইশের এক ব্যক্তিকে সেখানে আমি চিনে ফেললাম। অতঃপর তারা আমাকে ডান দিকে নিয়ে ফিরল। এ ঘটনা (স্বপ্ন) আমি হাফছাহ (রা.)-এর নিকট বর্ণনা করলাম। আর হাফছাহ রা. তা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম  এর নিকট বর্ণনা করলেন, তখন রাসূলুল্লাহ (ছা.) বললেন, আব্দুল্লাহ তো নেককার লোক। নাফে’ রহ. বলেন, এরপর থেকে তিনি সর্বদা অধিক করে (নফল) নামায আদায় করতেন। (বুখারী-৭০২৮, ৭০২৯, মুসলিম-২৪৭৯)

জাহান্নামের স্তর:

আল্লাহ তাআলা তাঁর বান্দাদের পাপ অনুযায়ী শাস্তি প্রদান করার জন্য জাহান্নামের বিভিন্ন স্তর এবং স্তরভেদে তাপের তারতম্য সৃষ্টি করেছেন। যেমন- তিনি মুনাফিকদের স্তর উল্লেখ করে বলেছেন, ‘মুনাফিকগণ জাহান্নামের নিম্নতম স্তরে থাকবে’ (সূরা নিসা-১৪৫)

সূরা আনআমে আল্লাহ্‌ তাআলা বলেন: ‘প্রত্যেকে যা করে তদনুসারে তার স্থান রয়েছে।’ (সূরা আনআম-১৩২)

সূরা আলে ইমরানে আল্লাহ্‌ তাআলা বলেন: ‘যে আল্লাহ্‌র সন্তুষ্টির অনুসরণ করেছে সেকি তার মত যে আল্লাহ্‌র ক্রোধ নিয়ে ফিরে এসেছে? আর তার আশ্রয়স্থল জাহান্নাম এবং তা কতই না মন্দ প্রত্যাবর্তনস্থল। তারা আল্লাহ্‌র নিকট বিভিন্ন মর্যাদার। আর তারা যা করে, আল্লাহ তার ওপর সজাগ দৃষ্টি রাখেন।’ (সূরা আলে-ইমরান-১৬২,১৬৩)

জাহান্নামের প্রশস্ততা ও গভীরতা:

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন তাঁর অবাধ্য বান্দাদের শাস্তি দেয়ার জন্য জাহান্নাম সৃষ্টি করেছেন যার প্রশস্ততা বিশাল এবং গভীরতা অনেক যার প্রমাণ নিম্নরূপ:

১- পৃথিবীর অধিকাংশ মানুষ জাহান্নামে প্রবেশ করবে। জাহান্নামীদের সংখ্যার আধিক্য বর্ণনা করতে গিয়ে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, হাজারে নয়শত নিরানব্বই জন মানুষ জাহান্নামে প্রবেশ করবে। এর পরেও আল্লাহ তা‘আলা জাহান্নামীদেরকে বিশাল আকৃতির দেহ দান করবেন। যেমন- তাদের এক একটি দাঁত হবে উহুদ পাহাড়ের সমান, এক কাঁধ থেকে অপর কাঁধের দুরুত্ব একজন দ্রুতগামী অশ্বারোহীর তিন দিনের পথ, চামড়া হবে তিন দিনের পথ পরিমান মোটা। এতো বিশালাকৃতির হাজারে নয়শত নিরানব্বই জন মানুষ জাহান্নামে প্রবেশ করলেও তা পূর্ণ হবে না। শেষ পর্যন্ত আল্লাহ তাআলা তাঁর নিজের পাঁ জাহান্নামে প্রবেশ করাবেন। আল্লাহ তাআলা জাহান্নামকে বলবেন: ‘সেদিন আমি জাহান্নামকে জিজ্ঞেস করব, তুমি কি পূর্ণ হয়ে গেছ? জাহান্নাম বলবে, আরও কিছু আছে কি?’ (সূরা ক্বাফ-৩০)

এই উত্তর শুনে আল্লাহ তা‘আলা তাঁর নিজ পাঁ জাহান্নামের মধ্যে প্রবেশ করাবেন। এ সম্পর্কে হাদীছে এসেছে, আনাস ইবনে মালেক রা. হতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, জাহান্নামে অনবরত (জ্বিন-মানুষ) কে নিক্ষেপ করা হবে। তখন জাহান্নাম বলতে থাকবে, আরো অধিক কিছু আছে কি? এভাবে ততক্ষণ পর্যন্ত বলতে থাকবে, যতক্ষণ না আল্লাহ তা‘আলা তাঁর নিজ পাঁ প্রবেশ করাবেন। তখন জাহান্নামের একাংশ অপর অংশের সাথে মিলে যাবে এবং বলবে, তোমার মর্যাদা ও অনুগ্রহের কসম! যথেষ্ট হয়েছে, যথেষ্ট হয়েছে। (বুখারী-৬৬৬১, মুসলিম-২৮৪৮, মিশকাত-৫৪৫১)

২- আবু হুরায়রাহ রা. হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, একদা আমরা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সাথে ছিলাম। যখন তিনি একটি শব্দ শুনলেন তখন বললেন, তোমরা কি জান এটা কি? তখন আমরা বললাম, আল্লাহ ও তাঁর রাসূলই ভাল জানেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, এটি এক খন্ড পাথর যা জাহান্নামের মধ্যে নিক্ষেপ করা হয়েছে ৭০ বছর পূর্বে, এখন পর্যন্ত সে নিচের দিকে অবতরণ করছে জাহান্নামের তলা খুজে পাওয়া অবধি। অন্য হাদীছে এসেছে, আনাস রা. হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একদা একটি বড় পাথর খন্ডের দিকে ইশারা করে বলেন যে, যদি এই পাথরটি জাহান্নামের কিনারা দিয়ে তার ভিতরে নিক্ষেপ করা যায়, তবে ৭০ বছরেও সে তলা পাবেনা। [মুছান্নাফ ইবনে আবী শায়বাহ-হা/৩৫২৮৪, ছহীহ আল-জামে’ আছ-ছাগীর- হা/৫২১৪]

৩- জাহান্নাম এতো বিশাল যে, ক্বিয়ামতের দিন তাকে টেনে আনতে বিপুল পরিমাণ ফেরেশতার প্রয়োজন হবে। হাদীছে এসেছে, আব্দুল্লাহ ইবনে মাস’উদ (রা.) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (ছা.) বলেছেন, ক্বিয়ামতের দিন জাহান্নামকে এমন অবস্থায় উপস্থিত করা হবে, যার ৭০ টি লাগাম হবে এবং প্রতিটি লাগামের সাথে ৭০ হাজার ফেরেশতা থাকবে, তাঁরা তা টেনে আনবে। (মুসলিম-২৮৪২, মিশকাত-৫৪২২)

৪- ক্বিয়ামতের দিন আল্লাহর দু’টি বিশাল সৃষ্টি চন্দ্র-সূর্যকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে, যার প্রমাণে বায়হাক্বীতে বর্ণিত হয়েছে: হাসান বাছরী (রহ.) বলেন, আবু হুরায়রাহ (রা.) আমাদেরকে রাসূল (ছা.) হতে বর্ণনা করেন, তিনি বলেছেন, ক্বিয়ামতের দিন সূর্য ও চন্দ্রকে দুটি পনিরের আকৃতি বানিয়ে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে। তখন হাসান বাছরী জিজ্ঞেস করলেন, তাদের অপরাধ কি? জবাবে আবু হুরায়রাহ বললেন, আমি রাসূল (ছা.) হতে এ ব্যাপারে যা কিছু শুনেছি, তাই বর্ণনা করলাম, এই কথা শুনে হাসান বাছরী নীরব হয়ে গেলেন। (সিলসিলাতুল আহাদীছ আস ছহীহাহ-১২৪, মিশকাত-৫৪৪৮)

উপরোল্লিখিত আলোচনা সমূহ থেকে প্রতীয়মাণ হয় যে, জাহান্নামের বিশালত্ব অকল্পনীয়। কারণ এত বিশালাকৃতির হাজারে নয়শত নিরানব্বই জন জাহান্নামী এবং পৃথিবী থেকে ১৩ লক্ষ গুণ বড় সূর্যকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করার পরেও যদি তার পেট পূর্ণ করার জন্য আল্লাহ তাআলার নিজের পাঁ প্রবেশ করানোর প্রয়োজন হয়, তাহলে তা কত বিশাল হতে পারে তা আমাদের কল্পনার বাইরে। আল্লাহ আমাদের জাহান্নাম হতে রক্ষা করুন।

চিরস্থায়ী জাহান্নামী কারা?

কাফের, মুশরিক, কপট মুনাফিক, মুরতাদ ও রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে অবিশ্বাসী কাফেররাই হবে চিরস্থায়ী জাহান্নামী। আর তাওহীদবাদী পাপিষ্ঠ মুসলিমর  তথা আল্লাহ তাআলার ওপর বিশ্বাস স্থাপনকারী গুনাহগার ব্যক্তিরা আল্লাহ্‌ তাআলার ইচ্ছাধীন থাকবে। তিনি চাইলে তাদেরকে মাফ করে দিবেন অথবা তাদের পাপের সমান শাস্তি দেয়ার পর জান্নাতে প্রবেশ করাবেন।

১- কাফেররা চিরস্থায়ী জাহান্নামী:
কাফেরগণ অন্তনকালের জন্য জাহান্নামে অবস্থান করবে। মহান আল্লাহ বলেন: ” আল্লাহ তাআলা বলেন: ‘আল্লাহ তাআলা ওয়াদা করেছেন মুনাফিক নারী-পুরুষ এবং কাফেরদের জন্য জাহান্নামের আগুনের; তাতে পড়ে থাকবে সর্বদা। সেটাই তাদের জন্য যথেষ্ট। আর আল্লাহ তাদের প্রতি অভিসম্পাত করেছেন এবং তাদের জন্য রয়েছে চিরস্থায়ী আযাব।’ (সুরা তাওবা-৬৮)

আল্লাহ্‌ তাআলা সূরা বাকারায় বলেন,” আর যারা অবিশ্বাস করবে ও আমার নিদর্শনসূহে মিথ্যা প্রতিপন্ন করবে তারাই জাহান্নামের অধিবাসী, সেখানে তারা সর্বদা অবস্থান করবে।”  “(সূরা আল-বাকারা-৩৯)

২- মুশরিকরা চিরস্থায়ী জাহান্নামী:
মহান আল্লাহ বলেন: “আহলে কিতাবদের মধ্যে যারা কুফরী করে থাকে তারা এবং মুশরিক, তারা জাহান্নামে আগুনের মধ্যে স্থায়ীভাবে অবস্থান করবে- তারাই সৃষ্টির নিকৃষ্ট জাতি।” (সূরা  বাইয়্যিনাহ-৬)

সূরা নিসায় আল্লাহ তাআলা বলেন: ‘নি:সন্দেহে আল্লাহ তাআলা তাকে ক্ষমা করবেন না, যে আল্লাহর সাথে শরিক করে। তিনি ক্ষমা করবেন এর চেয়ে নিম্ন পর্যায়ের পাপ, যাকে তিনি ইচ্ছা করেন।’ (সূরা নিসা-৪৮)

৩- মুনাফিকরা চিরস্থায়ী জাহান্নামী:
মুনাফিকরা চিরস্থায়ীভাবে জাহান্নামে অবস্থান করবে। মহান আল্লাহ বলেন:
“আল্লাহ মুনাফিক নারী-পুরুষদের কাফেরদের সাথে জাহান্নামের আগুনের অঙ্গীকার করেছেন, সেখানে তারা চিরকাল থাকবে। এটা তাদের জন্য যথেষ্ট, আর আল্লাহ তাদের লা’নত করেছেন এবং তাদের জন্য রয়েছে চিরস্থায়ী আযাব।” (সূরা আত-তাওবাহ-৬৮)

৪- মুরতাদগণ চিরস্থায়ী জাহান্নামী:
যারা নিজ র্ধম ত্যাগ করে মুরতাদ হয়ে তারা চিরস্থায়ী জাহান্নামী।
মহান আল্লাহ বলেন: “আর তোমাদের মধ্যে থেকে কেউ যদি দ্বীন থেকে ফিরে যায় এবং ঐ কাফের অবস্থায় তার মৃত্যু হয় তবে তার ইহকাল সংক্রান্ত ও পরকাল সংক্রান্ত সকল সাধনাই ব্যর্থ হয়ে যাবে। তারাই অগ্নির অধিবাসী ও তারই মধ্যে তারা চিরকাল অবস্থান করবে।” (সূর আল-বাক্বারা-২১৭)

৫-আহলে কিতাবসহ অন্যান্য অমুসলিমদের মধ্যে যারা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর উপর ঈমান আনবে না তারা চিরস্থায়ী জাহান্নামী:

আবূ হুরাইরা রা হতে বর্ণিত তিনি বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ঐ সত্তার শপথ! যার হাতে আমার প্রাণ, এই উম্মাতের মধ্যে যে ব্যক্তি আমার কথা মানবে, চাই সে ইহুদী হোক আর নাসারা, সে আমি যা নিয়ে প্রেরিত হয়েছি তার প্রতি ঈমান না এনে মৃত্যুবরণ করলো সে জাহান্নামের অন্তরবূক্ত হবে।
(মুসলিম: কিতাবুল ঈমান)

অন্যান্য গুনাহের কারণে যারা জাহান্নামে যাবে:

হারাম খাদ্য গ্রহণকারী: জাবের ইবনে আবদুল্লাহ রা. রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে বর্ণনা করেন, ‘যে দেহ হারাম খাদ্য দ্বারা লালিত-পালিত হয়েছে, তা জান্নাতে প্রবেশ করবে না।’ (বায়হাকি-৫৫২০)

আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্নকারী: জুবাইর ইবনে মুতইম রা. বলেন, আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন, ‘আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্নকারী ব্যক্তি জান্নাতে প্রবেশ করবেন না।’ (বুখারি-৫৫২৫)

প্রতিবেশীকে কষ্টদাতা: আবু হুরাইরা রা. রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে বর্ণনা করেছেন, ‘যার অত্যাচার (আচরণ) থেকে প্রতিবেশীরা নিরাপদ নয়, তিনি জান্নাতে প্রবেশ করবেন না।’ (মুসলিম-৬৬)

ওয়ারিশকে বঞ্চিতকারী: রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, ‘যে ব্যক্তি কোনো ওয়ারিশকে তার অংশ (প্রাপ্য) থেকে বঞ্চিত করল, আল্লাহ তাআলা তাকে জান্নাতের অংশ থেকে বঞ্চিত করবেন।’ (সুনানে ইবনে মাজাহ-২৬৯৪)

অশ্লীলভাষী ও উগ্র মেজাজি: হারেছা বিন ওহাব রা. বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন, ‘অশ্লীলভাষী ও উগ্র মেজাজি লোক জান্নাতে যাবেন না।’ (আবু দাউদ-৪১৬৮)

দাম্ভিক ও অহংকারকারী: আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রা. রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে বর্ণনা করেন, ‘যার অন্তরে অণু পরিমাণ অহংকার রয়েছে, তিনি জান্নাতে প্রবেশ করবেন না।’ (মুসলিম-১৩১)

অবাধ্য সন্তান ও ‘দাইয়ুস’: রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, ‘তিন শ্রেণির লোক জান্নাতে যাবেন না—মাতা-পিতার অবাধ্য সন্তান, দাইয়ুস (অর্থাৎ যে ব্যক্তি তার স্ত্রী-বোন প্রমুখ অধীনস্থ নারীকে বেপর্দা চলাফেরায় বাধা দেন না) এবং পুরুষের বেশ ধারণকারী নারী।’ (মুসতাদরাকে হাকেম- ২২৬)

প্রতারণাকারী শাসক: মাকাল বিন ইয়াসার রা. বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলতে শুনেছি, ‘মুসলমানদের ওপর প্রতিনিধিত্বকারী শাসক যদি এ অবস্থায় মারা যায় যে, সে তার অধীনস্তদের ধোকা দিয়েছে। তাহলে আল্লাহ তাআলা তার জন্য জান্নাত হারাম করে দেবেন।’ (বুখারি-৬৬১৮)

অন্যের সম্পদ আত্মসাৎকারী: আবু উমামা রা. থেকে বর্ণিত হাদিসে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, ‘যে ব্যক্তি কসম করে কোনো মুসলমানের সম্পদ আত্মসাৎ করে, আল্লাহ তাআলা তার জন্য জাহান্নাম ওয়াজিব করে দেন এবং জান্নাত হারাম করেন। এক ব্যক্তি বললেন, হে আল্লাহর রাসুল! যদি সামান্য কোনো জিনিস হয়? তিনি বললেন, পিপুল গাছের একটি ছোট ডাল হলেও।’ (সহিহ মুসলিম-১৯৬)

খোঁটাদাতা, অবাধ্য সন্তান ও মদ্যপ: আবদুল্লাহ বিন আমর রা. বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামবলেছেন, ‘উপকার করে খোঁটা দানকারী, মাতা-পিতার অবাধ্য সন্তান, সর্বদা মদপানকারী, এই তিন শ্রেণির মানুষ জান্নাতে প্রবেশ করবেন না।’ (সুনানে নাসাঈ-৫৫৭৭)

‘চোগলখোর’ (যারা মানুষের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টির উদ্দেশে কুৎসা রটায়): হুজাইফা রা. থেকে বর্ণিত, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, ‘চোগলখোর জান্নাতে প্রবেশ করবেন না।’ (মুসলিম-১৫১)

অন্যকে নিজের পিতা পরিচয়দাতা: সাদ রা. ও আবু বাকরাহ রা. থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, ‘যে ব্যক্তি জেনে শুনে নিজেকে অন্য পিতার সঙ্গে সম্পর্কিত করে, অর্থাৎ নিজেকে অন্য পিতার সন্তান বলে পরিচয় দেয়, তার জন্য জান্নাত হারাম।’ (বুখারি-৬২৬৯)

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নাফরমান: আবু হুরাইরা রা. থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, ‘আমার সব উম্মত জান্নাতে যাবে, কিন্তু যে (জান্নাতে যেতে) অস্বীকার করেছে সে নয়। সাহাবারা জিজ্ঞেস করলেন, হে আল্লাহর রাসুল! কে অস্বীকার করেছে? তিনি বললেন, যে আমার আনুগত্য করেনি সে জান্নাতে যাবে না। আর যে আমার নাফরমানি করে সে (জান্নাতে যেতে) অস্বীকার করেছে।’ (বুখারি-৬৭৩৭)

দুনিয়াবি উদ্দেশে ইলম শিক্ষাকারী: আবু হুরাইরা রা. থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, ‘যে ইলম দ্বারা আল্লাহর সন্তুষ্টি অন্বেষণ করা হয়, সেই ইলম যদি কোনো ব্যক্তি দুনিয়াবি স্বার্থ-সম্পদ হাসিলের উদ্দেশে শিক্ষা করেন, তিনি জান্নাতের ঘ্রাণও পাবেন না।’ (আবু দাউদ-৩১৭৯)

যে নারী অকারণে তালাক চান: সাওবান রা. থেকে বর্ণিত হাদিসে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, ‘যে নারী তার স্বামীর কাছে অকারণে তালাক কামনা করেন, তিনি জান্নাতের ঘ্রাণও পাবেন না।’ (তিরমিজি-১১০৮)

কালো কলপ ব্যবহারকারী: আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা. রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে বর্ণনা করেন, ‘শেষ যুগে কিছু লোক কবুতরের সিনার মতো কালো কলপ ব্যবহার করবেন। তারা জান্নাতের ঘ্রাণও পাবেন না।’ (নাসাঈ-৪৯৮৮)

লৌকিকতা প্রদর্শনকারী: আবু হুরাইরা রা. থেকে বর্ণিত এক হাদিসে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, ‘কিয়ামতের দিন সর্বপ্রথম একজন শহীদকে ডাকা হবে। অতঃপর একজন কারিকে। তারপর একজন দানশীল ব্যক্তিকে হাজির করা হবে। প্রত্যেককে তার কৃতকর্ম সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হবে। অতঃপর শহীদকে বীর-বাহাদুর উপাধি লাভের উদ্দেশে জিহাদ করার অপরাধে, কারি সাহেবকে বড় কারির উপাধি ও সুখ্যাতি লাভের জন্য কেরাত শেখার অপরাধে এবং দানশীলকে বড় দাতা উপাধি লাভের উদ্দেশে দান-সদকা করার অপরাধে উপুড় করে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে।’ (মুসলিম-৩৫২৭)

কুরআনে জাহান্নামের ভয়াবহ শাস্তির বর্ণনা:

মহান আল্লাহ্‌ বলেন: “আর তুমি কি জানো, জাহান্নাম কি? তা শান্তিতে থাকতে দেয় না আবার ছেড়েও দেয় না। চামড়া ঝলসে দেয়। উনিশজন ফেরেশতা তার প্রহরী হবে।’’ (সূরা মুদ্দাসসির-২৭-৩০)

সূরা আ’লায় আল্লাহ্‌ বলেন:  ‘‘হে (জাহান্নামে) মরবেও না আবার জীবিতও থাকবে না।’’ (সূরা আ’লা-১৩)

সূরা নাবায় আল্লাহ্‌ বলেন: ‘‘নিশ্চয় জাহান্নাম একটি ঘাঁটি। আল্লাহদ্রোহীদের জন্য আশ্রয়স্থল। সেখানে তারা যুগ যুগ ধরে অবস্থান করবে।’’ (সূরা নাবা-২১-২৩)

সূরা মুলকে আল্লাহ্‌ বলেন: ‘‘তারা (জাহান্নামীরা) যখন সেখানে নিক্ষিপ্ত হবে, তখন তার ক্ষিপ্রতার তর্জন-গর্জন শুনতে পাবে এবং তা উত্থাল-পাতাল করতে থাকবে, ক্রোধ আক্রোশে এমন অবস্থা ধারণ করবে, মনে হবে তা গোস্বায় ফেটে পড়বে।’’ (সূরা মুলক-৭,৮)

সূরা ফুরকানে আল্লাহ্‌ বলেন: ‘‘জাহান্নাম যখন দূর হতে তাদেরকে (জাহান্নামীদের) দেখতে পাবে তখন তারা তার ক্রোধ ও তেজস্বী আওয়াজ (অর্থাৎ তর্জন-গর্জন) শুনতে পাবে। আর যখন তাদেরকে হাত-পা বাধা অবস্থায় জাহান্নামের কোন সংকীর্ণ স্থানে নিক্ষেপ করা হবে তখন তারা সেখানে কেবল মৃত্যুকে ডাকতে থাকবে।’’ (সূরা ফুরকান-১২,১৩)

হাদীসে জাহান্নামের ভয়াবহ শাস্তির বর্ণনা:

আনাস ইবনু মালিক রা. হতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, কাফিরদেরকে হাশরের মাঠে মুখের মাধ্যমে হাঁটিয়ে উপস্থিত করা হবে। তখন এক ব্যক্তি বলল, হে আল্লাহ্‌র রাসূল! মুখের ভরে কাফিরদেরকে কিভাবে হাশরের ময়দানে উঠানো হবে? তিনি বললেন, দুনিয়াতে যে সত্তা দু’পায়ের উপর হাঁটান, তিনি কি ক্বিয়ামতের দিন মুখের ভরে হাঁটাতে পারবেন না? তখন কাতাদাহ রা. বললেন, আমাদের প্রতিপালকের ইয্‌যতের কসম! অবশ্যই পারবেন। (বুখারী-৬৫২৩)

আয়েশা রা. হতে বর্ণিত, তিনি বলেন। রাসূলুল্লাহ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, মানুষকে হাশরের মাঠে উঠানো হবে শূন্য পা, উলঙ্গ দেহ এবং খাৎনা বিহীন অবস্থায়। আয়েশা রা. বলেন, আমি তখন বললাম, হে আল্লাহ্‌র রাসূল রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম! তখন তাহলে পুরুষ ও নারীগণ একে অপরের দিকে তাকাবে। রাসূলুল্লাহ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, হে আয়েশা! এরকম ইচ্ছে করার চেয়ে তখনকার অবস্থা হবে অতীব সংকটময়। (কাজেই কি করে একে অপরের দিকে তাকাবে)। (বুখারী- ৬৫২৭)

পাথর ও কাফিরগণ হবে জাহান্নামের জ্বালানী:

মহান আল্লাহ তা‘আলা বলেন: ‘হে মুমিনগণ! তোমরা নিজেদেরকে এবং তোমাদের পরিবার-পরিজনকে জাহান্নামের আগুন থেকে রক্ষা কর, যার ইন্ধন হবে মানুষ এবং পাথর, যাতে নিয়োজিত আছে নির্মমহৃদয়, কঠোরস্বভাব ফিরিশতাগণ, যারা অমান্য করেনা তা, যা আল্লাহ তাদেরকে আদেশ করেন। আর তারা যা করতে আদিষ্ট হয় তাই করে’ (সূরা আত-তাহরীম-৬)

অত্র আয়াতে মানুষ বলতে কাফির-মুশরিকদেরকে বুঝানো হয়েছে যারা জাহান্নামের আগুনে জ্বলবে। আর পাথর বলতে কোন প্রকারের পাথর তা আল্লাহ তাআলাই ভাল জানেন। কেউ কেউ কাফেররা যেসব মূর্তির পূজা করে সেসব মূর্তির কথা বলেছেন। নিচের আয়াতটি থেকে এ কথার কিছু ইঙ্গিতও পাওয়া যায়। যেমন-

আল্লাহ তাআলা বলেন: ‘তোমরা এবং আল্লাহর পরিবর্তে তোমরা যাদের ইবাদত কর সেগুলিতো জাহান্নামের ইন্ধন, তোমরা সকলে তাতে প্রবেশ করবে। যদি তারা ইলাহ হতো তবে তারা জাহান্নামে প্রবেশ করত না, তাদের সকলেই তাতে (জাহান্নামে) স্থায়ী হবে’ (সূরা আম্বিয়া-৯৮,৯৯)

জাহান্নামের দরজা সমূহ:

এখানে দরজা বলতে স্তরকে বুঝানো হয়েছে। অর্থাৎ, জাহান্নামের সাতটি স্তর রয়েছে যা একটি অপরটির উপর অবস্থিত এবং তা পর্যায়ক্রমে পূর্ণ হবে।

জাহান্নামের দরজা মোট সাতটি যা আল্লাহ তা‘আলা পবিত্র কুরআন মাজীদে ইরশাদ করেছেন, ‘অবশ্যই জাহান্নাম তাদের সকলেরই প্রতিশ্রুত স্থান, উহার সাতটি দরজা আছে, প্রত্যেক দরজার জন্য পৃথক পৃথক শ্রেণী আছে’ (সূরা হিজর-৪৩,৪৪)

যখন কাফিরদেরকে জাহান্নামের নিকটে নিয়ে আসা হবে তখন তার দরজা সমূহ খুলে দেয়া হবে, অতঃপর তারা চিরস্থায়ীভাবে বসবাসের জন্য সেখানে প্রবেশ করবে।

আল্লাহ তাআলা বলেছেন: ‘কাফিরদেরকে জাহান্নামের দিকে দলে দলে তাড়িয়ে নিয়ে যাওয়া হবে, যখন তারা জাহান্নামের নিকটে উপস্থিত হবে তখন ইহার প্রবেশদ্বারগুলি খুলে দেয়া হবে এবং জাহান্নামের রক্ষীরা তাদেরকে বলবে, তোমাদের নিকটে কি তোমাদের মধ্য হতে রাসূল আসেনি যারা তোমাদের নিকট তোমাদের প্রতিপালকের আয়াত তেলাওয়াত করত এবং এই দিনের সাক্ষাত সম্বন্ধে তোমাদেরকে সতর্ক করত? তখন তারা বলবে অবশ্যই এসেছিল। বস্তুত কাফিরদের প্রতি শাস্তির কথা আজ বাস্তবায়িত হয়েছে’ (সূরা যুমার-৭১)

অতঃপর আল্লাহ তাআলা কাফিরদেরকে লক্ষ করে বলবেন: ‘জাহান্নামের দ্বারসমূহে প্রবেশ কর স্থায়ীভাবে বসবাসের জন্য। কত নিকৃষ্ট অহংকারীদের আবাসস্থল।’ (সূরা যুমার-৭২)

জাহান্নামীদেরকে জাহান্নামে নিক্ষেপের পর তার দরজাসমূহ এমনভাবে বন্ধ করে দেয়া হবে যা হতে বের হওয়ার কোন অবকাশ থাকবে না।

আল্লাহ তাআলা বলেন: ‘আর যারা আমার নিদর্শন প্রত্যাখ্যান করেছে, তারাই হতভাগ্য। তারা পরিবেষ্টিত হবে অবরুদ্ধ অগ্নিতে’ (সূরা বালাদ-১৯,২০)

আল্লাহ তাআলা বলেন: ‘দুর্ভোগ প্রত্যেকের, যে পশ্চাতে ও সম্মুখে লোকের নিন্দা করে, যে অর্থ জমায় ও তা বার বার গননা করে, সে ধারণা করে যে, তার অর্থ তাকে অমর করে রাখবে, কখনও না, সে অবশ্যই নিক্ষিপ্ত হবে হুতামায়, তুমি কি জান হুতামা কি? ইহা আল্লাহর প্রজ্জ্বলিত হুতাশন, যা হৃদয়কে গ্রাস করবে, নিশ্চয়ই ইহা তাদেরকে পরিবেষ্টন করে রাখবে দীর্ঘায়িত স্তম্ভসমূহে’ (সূরা হুমাযাহ্-১-৯)

জাহান্নামের প্রহরী নির্দয় ১৯ ফেরেশতা:

নির্মমহৃদয়, কঠোরস্বভাব ফেরেশতাগণ হবে জাহান্নামের প্রহরী। যারা আল্লাহর আদেশ পালনে সদা প্রস্তুত, কখনোই তা অমান্য করে না।

আল্লাহ তাআলা বলেন: ‘আমি তাদেরকে নিক্ষেপ করব সাকার-এ। তুমি কি জান সাকার কি? উহা তাদেরকে জীবিত অবস্থায় রাখবে না এবং মৃত অবস্থায়ও ছেড়ে দেবে না। ইহা গাত্রচর্ম দগ্ধ করবে। সাকার-এর তত্ত্বাবধানে রয়েছে উনিশজন প্রহরী’(সূরা মুদ্দাছছির-৬-৩০)

আল্লাহ তাআলা আরো বলেন: ‘আমি ফেরেশতাগণকে জাহান্নামের প্রহরী নিযুক্ত করেছি, কাফিরদের পরীক্ষাস্বরূপই আমি তাদের এই সংখ্যা উল্লেখ করেছি যাতে কিতাবীদের দৃঢ় প্রত্যয় জন্মে, বিশ্বাসীদের বিশ্বাস বৃদ্ধি হয় এবং বিশ্বাসীরা ও কিতাবীগণ সন্দেহ পোষণ না করে’ (সূরা মুদ্দাছছির-৩১)

আল্লাহ তাআলা আরো বলেন: ‘হে মু’মিনগণ তোমরা নিজেদেরকে এবং তোমাদের পরিবার-পরিজনকে জাহান্নামের আগুন থেকে রক্ষা কর, যার ইন্ধন হবে মানুষ ও পাথর, যাতে নিয়োজিত আছে নির্মমহৃদয়, কঠোরস্বভাব ফেরেশতাগণ, যারা অমান্য করে না আল্লাহ তাঁদেরকে যা আদেশ করেন তা পালনে। আর তাঁরা যা করতে আদিষ্ট হয় তাই পালন করে’ (সূরা আত-তাহরীম-৬)

জাহান্নামের আগুন, ধোঁয়া ও শাস্তির আধিক্য:

আল্লাহ তাআলা বলেন: ‘অতঃপর তোমরা আস্বাদ গ্রহণ কর, আমি তো তোমাদের শাস্তিই শুধু বৃদ্ধি করব’ (সূরা নাবা-৩০)

সূরা বনী ইসরাঈলে আল্লাহ্‌ তাআলা বলেন: ‘যখনই উহা (জাহান্নামের আগুন) স্তিমিত হবে আমি তখনই তাদের জন্য অগ্নিশিখা বৃদ্ধি করে দেব’ (সূরা বানী ইসরাঈল-৯৭)

সূরা ওয়াকিআয় আল্লাহ্‌ তাআলা বলেন: আল্লাহ তা‘আলা বলেন, ‘আর বাম দিকের দল, কত হতভাগ্য বাম দিকের দল! তারা থাকবে তীব্র গরম হাওয়া এবং প্রচন্ড উত্তপ্ত পানিতে, আর প্রচন্ড কালো ধোঁয়ার ছাঁয়ায়, যা শীতলও নয়, সুখকরও নয়’(সূরা ওয়াকিআহ-৪১-৪৪)

আবু হুরায়রাহ রা. হতে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, তোমাদের আগুন জাহান্নামের আগুনের সত্তর ভাগের এক ভাগ মাত্র। বলা হল, হে আল্লাহ্‌র রাসূল! জাহান্নামীদেরকে শাস্তি প্রদানের জন্য দুনিয়ার আগুনই তো যথেষ্ট। তিনি বললেন, দুনিয়ার আগুনের উপর জাহান্নামের আগুনের তাপ আরো উনসত্তর গুণ বাড়িয়ে দেয়া হয়েছে, প্রত্যেক অংশে তার সমপরিমাণ উত্তাপ রয়েছে। (বুখারী-৩২৬৫, মিশকাত-৫৪২১)

জাহান্নামীরা কখনো সামান্যটুকু বিশ্রামের অবকাশ পাবে না এবং তাদের থেকে শাস্তির কিছুই কমানো হবে না। আল্লাহ তা‘আলা বলেন: ‘সুতরাং তাদের শাস্তি লাঘব করা হবে না এবং তারা কোন সাহায্যপ্রাপ্ত হবে না’ (সূরা বাক্বারা-৮৬)

আল্লাহ্‌ তাআলা আমাদেরকে জাহান্নামের আযাব থেকে রক্ষা করুন, গুনাহ থেকে হেফাজত করুন, ইহকাল ও পরকালে আমাদের জন্য কল্যাণের ফয়সালা করুন। আমীন।

লেখক: মুফতি যাকারিয়্যা মাহমূদ মাদানী
বি.এ. অনার্স, এম.এ, এমফিল (ইসলামী আইন, বিচার ব্যবস্থা ও রাষ্ট্র বিজ্ঞান): মদীনা বিশ্ববিদ্যালয়, সৌদি আরব।
বি.এ. অনার্স (আরবি ভাষা ও সাহিত্য): আন্তর্জাতিক ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় চট্টগ্রাম (IIUC)।
দাওরায়ে হাদীস-এম.এ: জামেয়া কুরআনিয়া লালবাগ, ঢাকা।
ইফতা: জামেয়া মাদানিয়া যাত্রাবাড়ী, ঢাকা।
সহকারী ইনচার্জ ও আলোচক: মা‘রাদুল কুরআনিল কারীম, মসজিদে নববী, মদীনা মুনাওয়ারা, সৌদি আরব। (প্রাক্তন)
প্রতিষ্ঠাতা প্রিন্সিপাল: মাদরাসাতুল মাদীনাহ লিল বানাত, উত্তর বিশিল, মিরপুর-১, ঢাকা-১২১৬।
প্রধান গবেষক: আস-সুন্নাহ ফাউন্ডেশন ও ইন্সটিটিউট, ঢাকা।
পরিচালক: ভয়েস অব ইসলাম।
সম্পাদক ও প্রকাশক: ডেইলি মাই নিউজ ও প্রবাসীকাল ডটকম।
jakariyamahmud@gmail.com

আরও পোস্ট

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

Back to top button
Close