বরেণ্যদের জীবন ও কর্ম

শায়খ মুহাম্মাদ বিন সালেহ আল-উসাইমীন রহ.

সঊদী আরবের খ্যাতিমান আলেম, ফকীহ, মুফতী ও সঊদী সর্বোচ্চ ওলামা পরিষদ সদস্য শায়খ উসাইমীন (রহঃ) আধুনিক মুসলিম বিশ্বের এক উজ্জ্বল নক্ষত্র। wikipedia-তে তাঁর সম্পর্কে বলা হয়েছে, Uthaymeen is regarded as one of the greatest scholars during the later part of the twentieth century, along with Muhammad Nasir ad-Deen al-albani and Abdul Azeez ibn Abdullah ibn baaz. ‘মুহাম্মাদ নাসিরুদ্দীন আলবানী ও আব্দুল আযীয বিন আব্দুল্লাহ বিন বায-এর সাথে উসাইমীনকেও বিংশ শতকের শেষার্ধের শীর্ষস্থানীয় বিদ্বান হিসেবে গণ্য করা হয়ে থাকে’।

আজীবন দরস-তাদরীস ও দাওয়াতী কাজে নিবিষ্টচিত্ত এই খ্যাতিমান আলেম ইসলাম ও মুসলিম উম্মাহর খেদমতের স্বীকৃতি স্বরূপ ১৪১৪ হিজরী/ ৮ই ফেব্রুয়ারী ১৯৯৪ খৃষ্টাব্দে বাদশাহ ফয়ছাল আন্তর্জাতিক পুরস্কারে ভূষিত হন।

জন্ম : মুহাম্মাদ বিন সালেহ আল-উসাইমীন ১৩৪৭ হিজরীর ২৭শে রামাযান মোতাবেক ১৯২৭ খ্রিস্টাব্দে আধুনিক সঊদী আরবের ‘আল-কাছীম’ প্রদেশের ‘উনায়যা’ নগরীতে এক ধার্মিক পরিবারে জনমগ্রহণ করেন। তাঁর চতুর্থ ঊধর্বতন পুরুষ উসমান ‘উসাইমীন’ রূপে পরিচিত ছিলেন। পরবর্তীতে এ শব্দটি উসাইমীনের নামের সাথে যুক্ত হয় এবং তিনি মুসলিম বিশেব ‘শায়খ উসাইমীন’ রূপেই সমধিক পরিচিত হন।[1]

শৈশব ও শিক্ষা-দীক্ষা : নানা আব্দুর রহমান বিন সুলায়মান আলে দামিগ (রহঃ)-এর কাছে কুরআন মাজীদ পাঠের মাধ্যমে তাঁর ইলমে দ্বীনের হাতেখড়ি হয়। ১৪ বছর বয়সে মাত্র ছয় মাসে তিনি সম্পূর্ণ কুরআন মাজীদ মুখস্থ করেন। এ সময়ের মধ্যে তিনি হাতের লেখা, অংক ও আরবী সাহিত্যের প্রাথমিক জ্ঞান লাভ করেন। শায়খ মুহাম্মাদ বিন আব্দুল আযীয আল-মুতাওয়া (রহঃ)-এর কাছে তাওহীদ, ফিকহ ও আরবী ব্যাকরণ শিক্ষা অর্জনের পর তিনি উনায়যার খ্যাতিমান আলেম, মুফাসসির শায়খ আব্দুর রহমান বিন নাছির আস-সা‘দীর (মৃঃ ১৩৭৬ হিঃ) দরসে বসেন। সুদীর্ঘ ১৬ বছর যাবৎ তিনি তাঁর কাছে তাফসীর, হাদীছ, সীরাত, তাওহীদ, ফিকহ, উছূলে ফিকহ, ফারায়েয, নাহু প্রভৃতি বিষয়ে জ্ঞানার্জন করেন। তাছাড়া শায়খ আব্দুর রহমান বিন আলী বিন আওদান (রহঃ)-এর নিকট ফারায়েয ও ফিকহ এবং শায়খ আব্দুর রাযযাক আফীফীর নিকট নাহু ও বালাগাত (অলংকার শাস্ত্র) অধ্যয়ন করেন।[2]

উচ্চশিক্ষার্থে রিয়াদ গমন : এরপর উচ্চশিক্ষা লাভের উদগ্র বাসনায় ১৩৭২ হিজরীতে তিনি রিয়াদের ‘আল-মা‘হাদুল ইলমী’তে ভর্তি হন। এখানে তিনি তাফসীর ‘আযওয়াউল বায়ান’-এর লেখক শায়খ মুহাম্মাদ আল-আমীন আশ-শানকীতী (মৃঃ ১৩৯৩ হিঃ), শায়খ আব্দুল আযীয বিন নাছির বিন রশীদ, আব্দুর রহমান আফ্রিকী (মৃঃ ১৩৭৭ হিঃ) প্রমুখের কাছে বিভিন্ন বিষয়ে শিক্ষা গ্রহণ করেন। এ সময় তিনি সঊদী আরবের সাবেক গ্র্যান্ড মুফতী, বিশ্ববরেণ্য আলেমে দ্বীন শায়খ আব্দুল আযীয বিন আব্দুল্লাহ বিন বায (১৩৩০-১৪২০ হিঃ/১৪মে ১৯৯৯ খৃঃ)-এর কাছে ছহীহ বুখারী, ফিকহ ও ইমাম ইবনু তায়মিয়া (রহঃ)-এর কতিপয় গ্রন্থ অধ্যয়ন করেন। শায়খ উসাইমীনের জীবনে শায়খ আব্দুর রহমান বিন নাছির আস-সা‘দী ও শায়খ বিন বায-এর প্রভাব ছিল অপরিসীম।[3] পাশাপাশি তিনি রিয়াদের ইমাম মুহাম্মাদ বিন সঊদ ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের শরী‘আহ অনুষদ থেকে ১৩৭৭ হিজরীতে উচ্চতর ডিগ্রী অর্জন করেন।

কর্মজীবন : ছাত্র জীবনেই তিনি ১৩৭০ হিজরীতে উনায়যার ‘আল-জামিউল কাবীর’-এ শিক্ষকতার মাধ্যমে কর্মজীবন শুরু করেন। রিয়াদের ‘আল-মা‘হাদুল ইলমী’ থেকে ফারেগ হওয়ার পর তিনি ১৩৭৪ হিজরীতে উনায়যার ‘আল-মা‘হাদুল ইলমী’তে শিক্ষক হিসাবে নিযুক্ত হন। ১৩৯৮-৯৯ হিজরী শিক্ষাবর্ষ থেকে আমৃত্যু তিনি ইমাম মুহাম্মাদ বিন সঊদ ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘আল-কাছীম’ শাখার শরী‘আহ অনুষদে পাঠদান করেন। তাছাড়া তিনি উনায়যার ‘আল-জামি আল-কাবীর’ (গ্র্যান্ড মসজিদ)-এ প্রত্যেক দিন দরস প্রদান করতেন।

দাওয়াতী কর্মতৎপরতা : পাঠদান ছিল শায়খের দাওয়াতী কর্মতৎপরতার কেন্দ্রবিন্দু। হজ্জের মওসুমে বিভিন্ন তাঁবুতে হাজীদের উদ্দেশ্যে দিকনির্দেশনামূলক বক্তব্য প্রদান, সঊদী আরবের বিভিন্ন শহরে দাওয়াতী সফর, গ্রন্থ প্রকাশ, টেলিফোনের মাধ্যমে ইউরোপ-আমেরিকা সহ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে বক্তব্য পেশ, রামাযান মাস ও গ্রীষ্মকালীন ছুটির সময় মসজিদে নববী ও মসজিদে হারামে দরস প্রদান, বিভিন্ন বিষয়ে ফৎওয়া প্রদান, ‘নূরুন আলাদ দারব’ শীর্ষক বেতার অনুষ্ঠানের মাধ্যমে শ্রোতাদের বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর প্রদান, ‘আল-কাছীম’ এলাকার বিচারক, উনায়যার ‘সৎ কাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ পরিষদের ’ সদস্য ও খতীবদের সাথে এবং বুরায়দা অঞ্চলের দাঈদের সাথে ইলমী আলোচনা প্রভৃতিভাবে তিনি দাওয়াতী কর্মতৎপরতা অব্যাহত রাখেন।[4]

বিভিন্ন পরিষদের সদস্য : শিক্ষাদান ও দাওয়াতী কাজের প্রচন্ড ব্যস্ততার মাঝেও তিনি ১৪০৭ হিজরী থেকে আমৃত্যু সঊদী আরবের সর্বোচ্চ ওলামা পরিষদ সদস্য, ইমাম মুহাম্মাদ বিন সঊদ ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা পরিষদ সদস্য, একই বিশ্ববিদ্যালয়ের আল-কাছীম শাখার শরী‘আহ অনুষদের সদস্য সহ বিভিন্ন পরিষদের সদস্য হিসাবে দায়িত্ব পালন করেন।

শায়খের মাযহাব : শায়খ উসাইমীন (রহঃ) মাসআলা ইস্তিম্বাতের ক্ষেত্রে ফকীহ ও মুহাদ্দিছগণের নীতির সমন্বিত রূপের বহিঃপ্রকাশ ঘটিয়েছেন। তিনি হাম্বলী মাযহাবের মুকাল্লিদ ছিলেন না; বরং দলীলের আলোকে যে মতটি প্রাধান্যযোগ্য মনে করেছেন সেটিকেই প্রাধান্য দিয়েছেন। হাম্বলী মাযহাবের ‘যাদুল মুসতাকনি’ গ্রন্থের ভাষ্য ‘আশ-শারহুল মুমতি’-এর শুধু ‘পবিত্রতা’ অধ্যায়ে ৮৯টি মাসআলায় হাম্বলী মাযহাবের বিপরীত মত প্রকাশ করেছেন। উক্ত গ্রন্থের শুধু ৮ম খন্ড পর্যন্ত মোট ৯৫০টি মাসআলায় তিনি হাম্বলী মাযহাবের বিরোধিতা করেছেন। তিনি বলতেন, ‘শায়খুল ইসলাম ইবনু তায়মিয়া আমাদের প্রিয়পাত্র। কিন্তু হক তাঁর চেয়ে আমাদের নিকট আরো বেশি প্রিয়’।[5]

রচনাবলী : শায়খ উসাইমীন রচিত গ্রন্থ সংখ্যা শতাধিক। তন্মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল- মাজমূউ ফাতাওয়া ও রাসাইল (৪২ খন্ড), আশ-শারহুল মুমতি (১৬ খন্ড), আল-কাওলুল মুফীদ আলা কিতাবিত তাওহীদ (৩ খন্ড), শারহু রিয়াযিছ ছালেহীন (৭ খন্ড), শারহুল আকীদা আল-ওয়াসিতিয়্যাহ (২ খন্ড), মাজালিসু শাহরি রামাযান, আল-মানহাজ লিমুরীদিল ওমরা ওয়াল হজ্জ প্রভৃতি।

মৃত্যু : বিশ্ববরেণ্য এই আলেমে দ্বীন ১৪২১ হিজরীর ১৫ই শাওয়াল মোতাবেক ২০০১ সালের ১০ই জানুয়ারী রোজ বুধবার মাগরিবের কিছুক্ষণ পূর্বে ৭৪ বছর বয়সে জেদ্দা নগরীতে ইন্তেকাল করেন। পরদিন মসজিদে হারামে ছালাতে জানাযা শেষে তাঁকে মক্কার ‘আল-আদল’ কবরস্থানে স্বীয় শিক্ষক শায়খ বিন বাযের পাশে দাফন করা হয়।[6]


[1] ওয়ালীদ বিন আহমাদ হুসাইন, আল-জামি লিহায়াতিল আল্লামা মুহাম্মাদ বিন ছালেহ আল-উছায়মীন (মদীনা মুনাওয়ারা : ১৪২২হিঃ/২০০২খৃঃ), পৃঃ ১০; www.wikipedia.org
[2] মাজমূউ ফাতাওয়া ও রাসায়িলু ফাযীলাতিশ শায়খ মুহাম্মাদ বিন ছালেহ আল-উছায়মীন (রিয়াদ : দারুছ ছুরাইয়া, ২য় প্রকাশ, ১৪১৪ হিঃ/১৯৯৪ খৃঃ), ১/৯; আল-জামি, পৃঃ ৪৮-৪৯।
[3] আব্দুর রহমান বিন ইউসুফ আর-রহমাহ, আল-ইনজায ফী তারজামাতিল ইমাম আব্দুল আযীয বিন বায (রিয়াদ : দারু ইবনিল জাওযী, ১৪২৮ হিঃ), পৃঃ ৯৫; আল-জামি, পৃঃ ৪৮; মাজমূউ ফাতাওয়া ও রাসাইল ১/১০; www.ibnothaimeen.com।
[4] আল-জামি, পৃঃ ১১৩-২২, ১৪২-৪৬।
[5] ঐ, পৃঃ ৭৬, ১০৩-১০৪।
[6] আল-জামি, পৃঃ ১৭৯; www.ibnothaimeen.com।

আরও পোস্ট

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

Back to top button
Close