প্রবন্ধ-নিবন্ধমুফতি যাকারিয়্যা মাহমূদ-এর কলাম

সুখি পরিবার ও সন্তানের ভবিষ্যৎ বিনির্মাণে যা প্রয়োজন

সাফল্যের বহু রকমের ধারা ও বিভিন্ন স্তর আছে। এই সাফল্যকে কেন্দ্র করে আছে মানুষের জীবনে বিভিন্ন চিন্তা-চেতনা, টার্গেট ও সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য। আমরা যদি পরিবারের সাফল্যের কথা বলি তো এখানেও দেখবো, কোন পরিবার একটি সুন্দর, সুখি ও দ্বীনদার হিসাবে জীবন যাপন করতে চায়। আবার কোনো পরিবার তার বিপরীতে বিলাস জীবন যাপন করতে চায়। পরিবারেরে সন্তানদের কথা বললে দেখা যায়, কোনো পরিবার তার সন্তানদের ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, উকিল বা ব্যারিস্টার বানাতে চায়। তাদের কেউ কেউ ভাবে ধর্মীয় শিক্ষা একটি পশ্চাৎমুখী শিক্ষা। এ শিক্ষা দিয়ে মানুষের কোনো উপকার হবে না। একমাত্র জাগতিক শিক্ষাই জগতে সফলতা বয়ে আনতে পারে। সুতরাং বোঝাই যায় যে, ধর্মকর্ম বা ধর্মীয় শিক্ষার কোনো আবেদন তাদের কাছে নেই।

আবার কোনো কোনো পরিবার তাদের সন্তানদের মডারেট মুসলিম বানাতে চায়। তারা বলে এতো ধর্মকর্ম করার কী দরকার, শুধু পাঁচ ওয়াক্ত সালাত আদায় ও রমযানে সিয়াম পালন করলেই হবে। এর চেয়ে বেশিকিছুর প্রয়োজন নেই। আবার কোনো পরিবার এসবকিছুর বিপরীতে সন্তানদের শুধু সাধারণ একজন মুসলিম নয় বরং একজন সুদক্ষ হাফেয ও আলেম বানাতে চায়। দাঈ ইলাল্লাহ হিসাবে গড়ে তুলতে চায়। তারা তাদের সন্তানদের জগতের শ্রেষ্ঠ মানুষ হিসাবে দেখতে চায়। তবে যে যাই করুক আর বলুক একটি জায়গায় সবাই একমত যে, সন্তানের সু-শিক্ষা ও সফলতাই একটি পরিবারের চূড়ান্ত সফলতার স্বাক্ষর বহন করে। সেই পরিবারকে সুখিময় করে তোলে টেকসই দাম্পত্য, স্বামী-স্ত্রীর পারস্পরিক সুসম্পর্ক ও বোঝাপড়া। আদর্শিক করে তোলে সুচিন্তিত পরামর্শ ভিত্তিক কর্মপন্থা ও পারিবারিক ঐক্য। একটি সুখি, সুন্দর ও সফল পরিবার বিনির্মাণের এটাই কার্যকর ও গোপন সুত্র।

সাফল্যের এই বিভিন্ন চিন্তা, ধারা ও স্তর মানব জীবনের অন্যতম লক্ষ্য। তবে এখানে মনে রাখতে হবে, নির্দিষ্ট লক্ষ্য বা টার্গেটে পৌঁছার প্রসেস ও পদ্ধতিটি ঠিক আছে কি না তা নিশ্চিত হতে হবে। দ্বিতীয়ত যেটি মনে রাখতে হবে সেটি হল, কখনো তাড়াহুড়ো করা যাবে না। একদিনেই সুখের পায়রা আপনার হাতে এসে ধরা দিবে ব্যাপারটি এমন নয়। কখনো কখনো কাংখিত সাফল্য পেতে তার জন্য নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে। ধরুন আপানার ছেলেকে হাফেয বানাবেন তাই মাদরাসায় ভর্তি করে দিলেন। এখন প্রতিদিন এসে হাফেয সাহেবকে জিজ্ঞেস করেন, হুজুর আর কত দেরি! আমার ছেলে হাফেয হচ্ছে না কেন?! এখানে আপনি হয়তো ধরেই নিয়েছেন যে, মাদরাসায় ভর্তি করে দিলেই বোধয় অটোমেটিক আপনার ছেলে হাফেয হয়ে যাবে। না ভাই, আদৌ বিষয়টি এমন নয়। ছেলেকে হাফেয বানাতে হলে অবশ্যই আপানাকে একটি সম্ভাব্য নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে। আবার সন্তানকে মাদরাসায় দিয়ে নিশ্চিন্ত হয়ে বসে থাকারও সুযোগ নেই। হাফেয হওয়ার ক্ষেত্রে যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হচ্ছে কি না এটাও মূল্যায়ন করে দেখতে হবে। এভাবে তদারক ও মূল্যায়নব্যবস্থা চলমান থাকলে কোনো সমস্যা ধরা পড়বে, হিফযে বিলম্ব হলে তার কারণ জানা যাবে। এবং সমস্যা  নিরূপণ ও সমাধান কল্পে প্রয়োজনে মাদরাসা পরিবর্তন করাও সম্ভব হবে। এভাবেই একটি সুস্থ ও স্বচ্ছ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে আপানার প্রিয় সন্তান একদিন ঠিকই হাফেয হয়ে যাবে ইনশা আল্লাহ্‌।

তৃতীয়ত যে বিষয়টি একজন মুমিন হিসাবে অবশ্যই মনে রাখতে হবে তা হচ্ছে, সন্তানের সফলতা, পরিবারের সুখ-শান্তি, একমাত্র এক আল্লাহ্‌র হাতে। আমরা যতই চাই তিনি না চাইলে কিছুই হবে না। কারণ আমরা কোনোকিছুরই চূড়ান্ত পরিণতি সম্পর্কে অবগত নই। আমি জানিনা, যে জিনিসটি আমরা চাচ্ছি আদৌ তা আমাদের জন্য কল্যাণকর কি না। কিন্তু মহান আল্লাহ্‌ সে সম্পর্কে পূর্ণ অবগত রয়েছেন। তিনি যা জানেন আমরা তা জানিনা। মহান আল্লাহ্‌ বলেন,

عَسَى أَن تَكْرَهُواْ شَيْئًا وَهُوَ خَيْرٌ لَّكُمْ وَعَسَى أَن تُحِبُّواْ شَيْئًا وَهُوَ شَرٌّ لَّكُمْ وَاللّهُ يَعْلَمُ وَأَنتُمْ لاَ تَعْلَمُونَ

“তোমাদের কাছে হয়তো কোো একটা বিষয় পছন্দসই নয়, অথচ তা তোমাদের জন্য কল্যাণকর। আর হয়তোবা কোনো একটি বিষয় তোমাদের কাছে পছন্দনীয় অথচ তোমাদের জন্যে অকল্যাণকর। বস্তুত: আল্লাহই জানেন, তোমরা জান না।” (সুরা বাকারা-২১৬)

অতঃএব, সংসারে কোনো অশান্তি সৃষ্টি হলে, জীবনের কোনো টার্গেট মিস হলে, কোনো লক্ষ্য পূরণ না হলে, কাংখিত কোনো বস্তু অর্জন না হলে, সন্তানরা ভালো মানুষ না হলে বা সংসারে কোনোভাবেই ভেঙ্গে পড়া যাবে না। সবশেষে, এ কথাও মনে রাখতে হবে, জীবনের সব চাওয়া কখনো পূরণ হয়না, পূরণ হওয়ার নয়। মানুষ যা চায় সবসময় তা পায় না। আবার যা পায় তা সবসময় চায় না। চাওয়া-পাওয়া নিয়েই মানুষের জীবন। এটাই আমাদের মানবজীবনের বৈশিষ্ট্য। তবে পাই আর না পাই এ জন্য থমকে গেলে চলবে না, প্রচেষ্টা চালিয়েই যেতে হবে। উদ্দেশ্য সফল হোক আর না হোক, মহান আল্লাহ্‌র দরবারে তার প্রতিদান পাওয়া যাবে ইনশা আল্লাহ্‌। পরিবারের সুখ-শান্তি ও সফলতার ধাপ ও ধারাগুলো এমনই। বিশ্বাস, যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ ও মূল্যায়ন এবং সবর বা ধৈর্যের পরীক্ষায় উন্নীত হবে। এতে একদিন না একদিন সুখি ও সফল পরিবার গড়ে ওঠবেই ইনশা আল্লাহ্‌।

লেখক: মুফতি যাকারিয়্যা মাহমূদ মাদানী
বি.এ. অনার্স, এম.এ, এমফিল (ইসলামী আইন, বিচার ব্যবস্থা ও রাষ্ট্র বিজ্ঞান): মদীনা বিশ্ববিদ্যালয়, সৌদি আরব।
বি.এ. অনার্স (আরবি ভাষা ও সাহিত্য): আন্তর্জাতিক ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় চট্টগ্রাম (IIUC)।
দাওরায়ে হাদীস-এম.এ: জামেয়া কুরআনিয়া লালবাগ, ঢাকা।
ইফতা: জামেয়া মাদানিয়া যাত্রাবাড়ী, ঢাকা।
সহকারী ইনচার্জ ও আলোচক: মা‘রাদুল কুরআনিল কারীম, মসজিদে নববী, মদীনা মুনাওয়ারা, সৌদি আরব। (প্রাক্তন)
প্রতিষ্ঠাতা প্রিন্সিপাল: মাদরাসাতুল মাদীনাহ লিল বানাত, উত্তর বিশিল, মিরপুর-১, ঢাকা-১২১৬।
প্রধান গবেষক: আস-সুন্নাহ ফাউন্ডেশন ও ইন্সটিটিউট, ঢাকা।
পরিচালক: ভয়েস অব ইসলাম।
সম্পাদক ও প্রকাশক: ডেইলি মাই নিউজ ও প্রবাসীকাল ডটকম।
jakariyamahmud@gmail.com

আরও পোস্ট

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

Back to top button
Close