নারী অঙ্গনমুফতি যাকারিয়্যা মাহমূদ-এর কলাম

ইসলামে নারীর উপার্জন

ইসলাম-পূর্ব যুগে নারীরা ছিল অসহায়, নিপীড়িত ও নির্যাতিত। তাদের কোনো সম্মান ও অধিকার ছিল না। ছিল না পিতার উত্তরাধিকারে নারীর কোনো অধিকার ও অংশীদারিত্ব। মানবতার মুক্তির মহান দূত বিশ্বনবী মুহাম্মাদ  সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নারী জাতির প্রকৃত মুক্তি ও স্বাধীনতা দিয়েছেন। দিয়েছেন পূর্ণ অধিকার ও মর্যাদা। একমাত্র ইসলামই সর্বপ্রথম নারীদের সমাজে স্বাধীন, সুস্থ ও সুন্দরভাবে বেঁচে থাকার অধিকার প্রদান করেছে, এমনকি সূরা নিসা নামে পবিত্র কুরআনুল কারীমে একটি পূর্ণাঙ্গ সূরাও নাযিল করা হয়েছে।

ইসলাম সবসময়ই নারীকে গুরুত্ব দিয়েছে, কোথাও নারীকে ঘরে বন্দী করে রাখতে বলেনি। চার দেওয়ালে শিকলে আটকে রাখতে নির্দেশ করেনি। ইসলাম সবসময়ই সুস্থ, শালীন ও নিরাপদ পরিবেশে নারীদের শিক্ষা-দীক্ষা, কাজ-কর্ম ও চলাফেরার কথা বলে। সুতরাং শরীয়ত নির্ধারিত গন্ডির মধ্যে থেকে নারীরা অবশ্যই চাকরি, ব্যবসা-বাণিজ্যসহ যেকোনো অর্থনৈতিক ও সামাজিক কর্মকান্ডে অংশগ্রহণ করতে পারে। ইসলাম একজন পুরুষকে যেমন অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের অনুমতি দিয়েছে, অনুরুপভাবে নারীকেও অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হতে কাজ-কর্ম ও ব্যবসা-বাণিজ্যে বা যেকোনো বৈধ উপার্জনের অধিকারও প্রদান করেছে।

কুরআনুল কারীমে আল্লাহ্‌ তাআলা বলেন, ‘আমি ব্যবসাকে হালাল করেছি এবং সুদকে হারাম করেছি।’ (সূরা আল বাকারা-১৮৬)

এই আয়াতে ব্যবসা হালাল হওয়া এবং সুদ হারাম হওয়া নারী-পুরুষ সকলের জন্য সমভাবে প্রযোজ্য। একজন পুরুষ হালাল পন্থায় যেসব ব্যবসা-বাণিজ্য করতে পারে একজন নারীও সেসব ব্যবসা করতে পারে। সে বিবাহিত হোক কিংবা অবিবাহিত হোক। এবং সেই সাথে সে তার অর্জিত সকল সম্পদের ওপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণকারী। কোনো বিধি নিষেধ ছাড়াই সে তার সম্পত্তির ব্যাপারে সব ধরনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে পারে, যা একজন পুরুষের জন্যও প্রযোজ্য। নারীর অর্জিত অর্থে তার ইচ্ছার বিরুদ্ধে কারো হস্তক্ষেপ করার আইনগত কোনো অধিকার বা ক্ষমতা নেই। আল্লাহ্‌ তাআলা বলেন: ‘যা কিছু পুরুষরা অর্জন করবে, তা তাদেরই অংশ হবে; আবার নারীরা যা কিছু উপার্জন করবে, তাদেরই অংশ হবে।’ (সূরা নিসা-৩২)

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর যুগেও নারীরা পর্দা ও সম্ভ্রম রক্ষা করে বিভিন্ন কাজ-কর্ম করতেন বলে প্রমাণ পাওয়া যায়। যেমন, আসমা বিনতে আবু বকর রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, ‘যখন যুবায়ের আমাকে বিয়ে করেন, তখন তাঁর কোনো ধন-সম্পদ ছিল না, এমনকি কোনো স্থাবর জমিজমা, দাস-দাসীও ছিল না; শুধু কুয়া থেকে পানি উত্তোলনকারী একটি উট ও একটি ঘোড়া ছিল। আমি তাঁর উট ও ঘোড়া চরাতাম, পানি পান করাতাম এবং পানি উত্তোলনকারী মশক ছিঁড়ে গেলে সেলাই করতাম, আটা পিষতাম, কিন্তু ভালো রুটি তৈরি করতে পারতাম না। … রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যুবায়েরকে একখণ্ড জমি দিলেন। আমি সেখান থেকে মাথায় করে খেজুরের আঁটির বোঝা বহন করে আনতাম। ওই জমির দূরত্ব ছিল প্রায় দুই মাইল। একদিন আমি মাথায় করে খেজুরের আঁটি বহন করে নিয়ে আসছিলাম। এমন সময় রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সঙ্গে সাক্ষাৎ হলো, তখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সঙ্গে কয়েকজন আনসারও ছিলেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে ডাকলেন এবং তাঁর উটের পিঠে বসার জন্য উটকে আখ্! আখ্! বললেন, যাতে উটটি বসে এবং আমি তার পিঠে আরোহণ করতে পারি।’ (সহীহ বুখারী-৫২২৪)

অতএব এটি স্পষ্ট যে, পবিত্র কুরআন ও হাদীসের কোথাও নারীর কাজ-কর্ম, ব্যবসা-বাণিজ্যে ও চাকরি-বাকরির ব্যাপারে কোনো বিধি নিষেধ আরোপিত হয়নি। তাই নারীরাও জরুরী প্রয়োজনে কিছু শর্তের আলোকে অনলাইন, অফলাইনে যেকোনো চাকরি ও ব্যবসা-বাণিজ্য ইত্যাদি করতে পারে।

১. ব্যবসা বা কর্মটি হতে হবে হালাল ও হালাল পদ্ধতিতে ও শরীয়ত নির্ধারিত সীমারেখার মধ্যে।
২. সম্পূর্ণ শরয়ী পর্দা রক্ষা করতে হবে। মুখমণ্ডল ঢেকে রাখতে হবে।
৩. বিবাহিত হলে স্বামী আর অবিবাহিত হলে পিতা বা তার স্থলাভিষিক্ত অভিভাবকের অনুমতি লাগবে।
৪.  কর্মস্থলটি শুধুমাত্র নারীদের জন্যই হতে হবে, সেখানে ভিন পুরুষের সাথে মেলামেশার কোনো সুযোগ থাকবে না।
৫. ফেতনা-ফ্যাসাদে জড়িয়ে পড়ার ব্যাপারে সর্তক থাকতে হবে।
৬. পরপুরুষের সাথে কথা বলার ক্ষেত্রে প্রয়োজনের অতিরিক্ত কথা বলা যাবে না, এবং কোমল কণ্ঠ পরিহার করতে হবে।
৭. বাহিরে যাওয়ার সময় সুগন্ধি ব্যবহার করবে না।
৮. পর পুরুষের সামনে নিজের সৌন্দর্য প্রকাশ করবে না।
৯. অনলাইন ব্যবসা হলে লাইভ করবে না, কারণ এতে ফেতনার আশঙ্কা রয়েছে।
১০. পর্যাপ্ত নিরাপত্তা থাকতে হবে।
১১. ব্যবসা বা চাকুরি হতে হবে জীবন ও জীবিকার প্রয়োজনে। বিনা প্রয়োজনে শুধুমাত্র শখের বসে বা বিলাসিতার জন্য হবে না।
১২. তার কাজ তাকে মাহরাম ছাড়া ভ্রমনে বাধ্য করবে না।
১৩. নারীর উপর ন্যস্ত দায়িত্ব পালনে বাঁধার সৃষ্টি করে এমন কাজ হতে পারবে না। যেমন, গৃহের দেখাশোনা, স্বামীর খেদমত ও সন্তানের যত্ন নেওয়া, ইত্যাদি।

নারীদের উপার্জন সম্পর্কে শায়খ মুহাম্মাদ বিন সালেহ আল উসাইমীন রহ. বলেন, “নারীদের কর্মক্ষেত্র শুধুমাত্র নারীদের জন্যই হতে হবে। যেমন, মেয়েদের শিক্ষাদান, নারীদের কারিগরি সহায়তা প্রদান, কাপড় সেলাই করা ইত্যাদি। পুরুষদের সাথে মাঠে কাজ করা নারীদের জন্য জায়েয নয়, কারণ তা মারাত্মক ফিতনা (কুকর্মে প্ররোচনা এবং নানা সমস্যার উৎস) তাই এটা উপেক্ষা করা উচিত।

তবে এখানে এ কথাও মনে রাখতে হবে, ইসলামের পারিবারিক ব্যবস্থায় নারীর আয়ের উৎসের বৈধতা থাকলেও ব্যয়ের বাধ্যতামূলক কোনো খাত নেই। কেননা ইসলাম নারীর উপর অর্থনৈতিক কোনো দায়-দায়িত্ব আরোপ করেনি। পরিবারের সকল আর্থিক দায়-দায়িত্ব বহন করা পুরুষের উপর অর্পিত হয়েছে। সেহেতু নারীকে তার জীবিকার জন্য ব্যবসা বা চাকরির প্রয়োজন নেই। হ্যাঁ যদি পুরুষের উপার্জিত অর্থে সংসার না চলে, পরিবারে অভাব ও সংকট দেখা দেয় তখন নারী চাইলে ব্যবসা বা চাকরি করতে পারে, না চাইলে নাও করতে পারে। এ জন্য তাঁকে কেউ জোর করতে পারে না। অন্যায়ভাবে তার কাঁধে কিছু চাপিয়ে দিতে পারে না। কারণ এখানে সে স্বাধীন। কোনো কাজ না করেও পুরুষের উপার্জন ভোগ করা তার আইনি ও ধর্মীয় অধিকার। আল্লাহ্‌ প্রদত্ত এ অধিকার থেকে বঞ্চিত করে তার ঘাড়ে উপার্জনের বোঝা চাপিয়ে দেওয়া যুলুম ও অন্যায়।

আল্লাহ তা‘আলা বলেন, পুরুষ নারীর ব্যবস্থাপক। কারণ আল্লাহ তাদের এক জনকে আরেক জনের উপর মাহাত্ম্য দান করেছেন। এবং তারা তাদের ধনসম্পদ (নারীদের উপর) ব্যয় করে। সুতরাং সতী সাধ্বী নারীরা হয় অনুগতা এবং আল্লাহ তা‘আলা যেসব বিষয় হিফজতযোগ্য করেছেন লোকচক্ষুর অন্তরালে তারা তার হিফাজত করে। (‘সূরা নিসা-৩৪)

অন্যত্র আল্লাহ তা‘আলা বলেন, আর পিতার উপর কর্তব্য, বিধি মোতাবেক তাদের (স্ত্রীদের) ভরণ-পোষণ করা। কাউকেও তার সাধ্যাতীত কার্যাভার দেয়া হয় না। (‘সূরা আল বাকারা-২৩৩)

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে স্ত্রীর প্রতি পুরুষের দায়িত্ব সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি বলেন, যখন তুমি আহার করবে তখন তাকেও (স্ত্রী) আহার করাবে, যখন তুমি বস্ত্র পরিধান করবে তখন তাকেও বস্ত্র পরিধান করাবে। (সুনানে আবু দাঊদ-২১৪২)

অন্য এক হাদীসে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, তোমরা তোমাদের স্ত্রীদের ব্যাপারে আল্লাহ তা‘আলাকে ভয় করো। কারণ তোমরা তাদেরকে আল্লাহর নিরাপত্তা সূত্রে গ্রহণ করেছো। এবং তোমরা তাদের সতীত্বকে আল্লাহর বিধানের বিনিময়ে বৈধ করে নিয়েছো। তোমাদের উপর তাদের সঙ্গত ভরণ পোষণের ব্যবস্থা গ্রহণ করা আবশ্যক। (সহীহ মুসলিম-১২১৮)

উল্লেখ্য যে, স্বামীর এ সম্মান, শ্রেষ্ঠত্ব অধিকতর ক্ষমতা চর্চা কিংবা ব্যাপক প্রভাব বিস্তার ও দাপটের কোনো বিষয় নয়; বরং এটা তার নারীকে সযতনে আগলে রাখার দায় ও আবশ্যিক কর্তব্যের বিষয়, তাই পুরুষের প্রজ্ঞাপূর্ণ অভিভাবকত্ব, দায়িত্বপূর্ণ শ্রেষ্ঠত্বকে তার পেশী শক্তির ক্ষমতা ভাবার সুযোগ নেই। হাদীসে নববীর ভাষ্য এ ব্যাপারে বেশ স্পষ্ট ও যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ।

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, তোমার উপর তোমার স্ত্রীর পূর্ণ অধিকার রয়েছে। (সহীহ বুখারী-১৯৭৪)

অন্য দিকে পুরুষ যাতে এই সাময়িক শ্রেষ্ঠত্বের অহমিকায় নারীর প্রতি কঠোর ও রুঢ় না হয়,  তার প্রতি সদাচারণ ও ইনসাফ বহির্ভূত অন্যায় আচরণ না করে তাই তার শ্রেষ্ঠত্বের মানদণ্ডরূপে ঘোষণা করা হয়েছে নারীর স্বীকৃতিকে। নারীর স্বীকৃতির বাইরে পুরুষের কোনো শ্রেষ্ঠত্ব নেই।

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, তোমাদের মধ্য হতে যে ব্যক্তি তার স্ত্রীর নিকট শ্রেষ্ঠ সেই তোমাদের মধ্যে সর্বোত্তম। (সুনানে তিরমিযী; হা.নং ৩৮৯৫)

ইসলাম নারীর জীবন ও জীবিকার প্রয়োজনে ব্যবসা-বাণিজ্য, চাকরি-বাকরি ও উপার্জনের অনুমতি দিয়েছে। কেননা ইসলাম একটি বাস্তব ও মানবিক ধর্ম। যে নারীটির স্বামী মারা গেছে বা দৈব দুর্ঘটনায় কর্তাপুরুষটি কর্মক্ষমতা লোপ পেয়েছে, আর তার কোনো পুরুষ কর্তাও নেই, সে তার ও তার এতীম সন্তানদের জীবন ধারণের জন্য যেকোনো বৈধ কাজ করতে পারে। যে দরিদ্র মেয়েটির বিয়ে হচ্ছে না সেও প্রয়োজনে বাইরে কাজ করতে পারে। আবার যে মেয়েটির পিতা মারা গেছে, ভাই না থাকলে বৃদ্ধা মায়ের মুখে দু মুঠো ভাত তুলে দেওয়ার অসম সওয়াবের কাজটিও সে করতে পারে। কিন্তু যাদের সংসার সচ্ছল, পিতা, ভাই বা স্বামী ব্যবসা-বাণিজ্য বা চাকরি করে, তাদের ব্যবসা বা চাকরি করার কী দরকার! তাদের সংসারেই তো প্রচুর কাজ। যেখানে তাদেরকেই লোক রেখে কাজ সামাল দিতে হয় সেখানে তাদের বাইরে কাজ করার সুযোগ কোথায়?

এ ছাড়া মাতা-পিতার সেবা, স্বামীর খেদমত করা, ঘরে সুন্দর ও শান্তিপূর্ণ পরিবেশ তৈরি করা, বাড়ী-ঘর সুন্দর ও পরিপাটি করে গুছিয়ে রাখা, ঘরের আসবাবপত্র পরিস্কার-পরিচ্ছন্ন রাখা, রান্না-বান্না করা, মেহমানদারী করা, কাপড়-চোপড় সেলাই করা ইত্যাদি নানা কমের গৃহস্থালি কাজের দায়িত্বও প্রকৃতিগতভাবে মূলত নারীর উপরই ন্যস্ত করা হয়েছে। তাকে সারাদিন এসব কাজেই ব্যস্ত থাকতে হয়। ইসলামের দৃষ্টিতে এগুলো একজ নারীর প্রধানতম কাজ। এর বাইরেও তাকে আরোও অনেক কাজ করতে হয়। পুরুষের কাজ একসময় শেষ হয়ে গেলেও শেষ হয় না নারীর কাজ। সেই সকাল থেকে অর্ধ রাত পর্যন্ত চলে তার ডিউটি। একটার পর একটা করে যেতে হয় তাকে অবিরামভাবে। তার কাজের যেন শেষই নেই। এতো এতো দায়িত্বের উপর যদি তার কাঁধে আবার নিজের ভরণ-পোষণ, পরিবার ও সন্তানাদির উপার্জনের বোঝাও চাপিয়ে দেওয়া হয়, তবে তা হবে নারীর প্রতি একটি চরম অন্যায় ও অবিচার।

দ্বিতীয়ত ইসলাম বলে নারীদের জন্য তার ঘরই উত্তম। তাই সে তার গৃহে অবস্থান করবে এবং প্রয়োজনীয় উদ্দেশ্যে ছাড়া বাইরে যাবে না। আল্লাহ্‌ তাআলা বলেন: “আর তোমরা গৃহে অবস্থান করো এবং জাহিলী যুগের মতো নিজেদেরকে প্রদর্শন করে বেড়াবে না।” (সূরা আহযাব-৩৩)

যদিও এখানে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর পত্নীদেরকে সম্বোধন করা হয়েছে, তবে এটি  মু’মিন নারীদের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। এখানে নবীপত্নীদেরকে সম্বোধন করার কারণ, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাথে তাদের সম্মান ও অবস্থান জড়িত এবং তাঁরা মু’মিন নারীদের জন্য উদাহরণ স্বরুপ। নিম্মোক্ত হাদীসগুলোও এ বিষয়ে খুবই প্রাসঙ্গিক।

প্রত্যেক নারী তার স্বামীর গৃহের ব্যাপারে দায়িত্বশীল। আর কিয়ামতের দিন সে তার এ দায়িত্ব সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হবে। (সহীহ বুখারী-৮৯৩)

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, “নারীরা হচ্ছে চাদর এবং যদি সে গৃহের বাইরে যায় তবে শয়তান খুশি হয় (তাকে বিভ্রান্ত করতে পারবে বলে)। সে (নারী) আল্লাহর নৈকট্য লাভ করতে পারে না যতটা সে গৃহে থেকে করতে পারতো।” (ইবনে হিব্বান ও ইবনে আবী খুযাইমাহ, শায়খ আলবানী এটিকে সহীহ বলেছেন, সিলসিলা আস সহীহাহ-২৬৮৮)

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরোও বলেন, “আমি পুরুষের জন্য নারীর চেয়ে বড় আর কোনো ফিতনা রেখে যাচ্ছি না। আর বনী ইসরাইলের প্রথম ফিতনা ছিলো নারী সংক্রান্ত। সুতরাং লোকদের উচিৎ তাদের পরিবারকে ফিতনা এবং ফিতনার উপকরণ থেকে দূরে রাখা। (ফাতাওয়া আল-মার’আহ আল মুসলিমাহ: ২/৯৮১)

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নারীদের মসজিদে সালাত আদায়ের ব্যাপারে উদ্বিগ্ন হয়ে বলেন, “তাদের গৃহই তাদের জন্য উত্তম।” (আবু দাঊদ-৫৬৭)

ইসলামের অসাধারণ সৌন্দর্যগুলোর মধ্যে এটিও একটি যে, পুরুষকে উপার্জন, রক্ষণাবেক্ষণ ও নারীর ভরণ-পোষণের কাজে নিয়োজিত রেখে নারীকে এ সকল দায়িত্ব থেকে মুক্তি দেওয়া হয়েছে। আর পুরুষের ঘর-সংসার রক্ষণাবেক্ষণ, বাড়ীতে শান্তিপূর্ণ আবহ সৃষ্টি, সন্তান জন্মদান ও সুচারুরূপে তাদের পরিপালন, চরিত্র গঠন ও শিক্ষা-দিক্ষা দিয়ে তাদের আদর্শ মানুষ ও সুনাগরিক হিসেবে গড়ে তোলা ইত্যাদি কাজের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে নারীকে। কিন্তু দুঃখের বিষয় হল, ভোগবাদী পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদীরা ইসলামের মজবুত পারিবারিক ব্যবস্থাকে ভেঙ্গে দিয়ে তথাকথিত নারী স্বাধীনতার নামে নারীকে ঘর থেকে বের করে আনতে চায়। বস্তুবাদীরা নারীকে ব্যবসার পণ্য বানাতে চায়। বস্তুত তারা স্বাধীনতার নামে নারীকে উপভোগ করতে চায়। নারীবাদীরা নারীদের এ কথা বোঝাতে চায় যে, নারীকে কেন একজন লোকের উপর নির্ভরশীল হয়ে থাকতে হবে?! কেন একজনের উপার্জনে গোটা পরিবার চলবে?! পুরুষ বাইরে বেরুতে পারলে, ব্যবসা-বাণিজ্য, চাকরি-বাকরি করতে পারলে নারী কেন নয়? নারীরাও ভাবছে ঠিকই তো, মেয়েরা কি পড়াশোনা করছে ঘরে হাত পা গুটিয়ে বসে থাকার জন্য?, আর  হিজাব পরে মেয়েরা কেন বাহিরে কাজ করতে পারবে না? আমরা এতো পড়াশোনা, এতো ডিগ্রি অর্জন করেও কিছু করবো না তা কি করে হয়! আমাদেরও তো কিছু করা উচিৎ। এতে করে একদিকে পারিবারিক প্রয়োজন পূরণে পুরুষকে যেমন সহযোগিতা করা হবে, অপরদিকে জীবনযাত্রার মানও হবে উন্নত। এ হচ্ছে বর্তমান নারীদের ভাবনা।

ইদানীং অনলাইনে, বিভিন্ন ফেসবুক গ্রুপে, নারী ব্যবসায়ী, উদ্যোগতাদের ব্যাপক উপস্থিতি লক্ষ করা যায়। দ্বীনদার নারীরাও এ ময়দানে পিছিয়ে নেই। সর্বত্রই চলছে অনলাইন ব্যবসার এক নিরব প্রতিযোগিতা। বোরকা, থ্রি পিস, ওড়না, জামা, জুতা, বই-পুস্তক, মধু, সরিষার তেল, কালোজিরার তেল, বাদাম, ঘি, হোম মেড ফুডসহ প্রায় সবকিছুই এখন নারীরা অনলাইনে বিক্রি করছেন। নারীরা এখন আর পিছিয়ে নেই। সবখানেই তারা অবদান রাখছে। ভালো।

তবে যখন এ ব্যবসাকে নিজেদের মনগড়া খোঁড়া যুক্তি দিয়ে, হালাল মোড়কের আবরণ পরিয়ে ধর্মীয় ফ্লেভার মিশিয়ে প্রচার করা হয় তখন আর তা বিতর্কমুক্ত থাকে না। যেমন কিছু কিছু নারীকে বলতে দেখা যায়, আমরা উপার্জন করছি দান-সদকা করার জন্য। গরীব দুঃখীদের পাশে দাঁড়ানোর জন্য। এটা তো দোষের কিছু নয়। আমিও বলছি না যে এটা দোষের কিছু, কিন্তু এটা বলবো যে, নারীকে উপার্জন করে এভাবে দান-সদকা করার কথা ইসলাম বলেনি। নবী ও সাহাবী পত্নীগণ কেউ এ কাজ করেন নি। পরবর্তী সালাফদের থেকেও এর কোনো প্রমাণ পাওয়া যায় না। যা পাওয়া যায় তা হল, নারী তার ব্যক্তিগত সম্পদ থাকলে সেখান থেকে দান করবে। স্বামীর অনুমতি সাপেক্ষে তার সম্পদ থেকেও দান করতে পারে, এতে করে দুজনেই সওয়াবের অধিকারী হবে। সম্পদ না থাকলে সবর করবে। ব্যক্তিগত আমলে মনোযোগী হবে। সালাফদের অনুস্মরণার্থে গরীব, এতীমদের দান-সদকা করার অন্তরালে নিজেদের প্রবৃত্তির অনুস্মরণ করবে না।  

আমাদের মনে রাখতে হবে, মানবতার মুক্তির কাণ্ডারি রাসূলে আরাবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর ঘরে কোনো সম্পদ ছিল না। তথাপিও তাঁর স্ত্রীরা ঘরে থাকতেন। মাসকে মাস তাদের উনুনে আগুণ জ্বলত না, তবুও তারা কেউ উপার্জন করতেন না। চাকরি বা ব্যবসা-বাণিজ্য করে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে সংসার পরিচালনায় সাহায্য করেননি। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁদের জন্য যা ব্যবস্থা করতেন তাতেই তাঁরা সন্তুষ্ট থাকতেন।

কিন্তু বর্তমান নারীরা ইসলামের এই সুন্দরতম পারিবারিক ব্যবস্থায় বোধয় সন্তুষ্ট হতে পারছে না। ফলে আজ দেখা যাচ্ছে, নারীরা ঘর ছেড়ে বাইরে বেরিয়ে পড়ছে। অফিসে, কল-কারখানা, মিল, ইন্ডাস্ট্রি, ব্যবসা-বাণিজ্য, বিপণী বিতান, পরিবহন, হাসপাতাল, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, উড়োজাহাজ, রেডিও, টিভিসহ সর্বত্রই আজ নারীদের প্রচন্ড ভীড়। এভাবে নারীরা যখন শান্তির ঘর ছেড়ে বাইরে ভীড় করছে তখন ঘর, পরিবার ও সমাজে কী ধরণের প্রভাব পড়ছে তা আমাদের একটু গভীরভাবে ভেবে দেখার প্রয়োজন রয়েছে।

নারীরা নিজেদের অবুঝ শিশু সন্তানকে ঘরে রেখে ব্যবসায়, চাকরিতে, অফিসে যাচ্ছে। ফলে শিশুরা মায়ের আদর, স্নেহ ও ভালোবাসা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। তারা প্রকৃত পক্ষে লালিত-পালিত হচ্ছে, চাকর-চাকরানির হাতে। সঠিক পরিচর্যা, তত্ত্বাবধান ও শিক্ষা-দীক্ষার অভাবে শিখছে নিম্ন মানসিকতা, ভাষা ও কালচার। প্রভাবিত পরিবর্তন হচ্ছে দারুণভাবে। মায়ের প্রতি সন্তানের ভালোবাসা হ্রাস পাচ্ছে। হ্রাস পাচ্ছে সন্তানের প্রতি মায়ের ভালোবাসা। অপরদিকে স্বামীও উপার্জনের জন্য বের হয়ে যাচ্ছে, যাচ্ছে স্ত্রীও। স্বামী এক অফিসে, স্ত্রী অপর অফিসে, স্বামী এক কারখানায়, স্ত্রী অপর কারখানায়। স্বামী এক দোকানে, স্ত্রী অপর এক দোকানে। স্বামী এক জায়গায় ভিন মেয়েদের সঙ্গে পাশাপাশি বসে কাজ করছে, স্ত্রী কাজ করছে অপর এক স্থানে ভিন পুরুষের সঙ্গে। এভাবে

জীবনের বড় একটি সময় স্বামী আর স্ত্রী বিচ্ছিন্ন থাকছে। বাড়ছে পারিবারিক অশান্তি ও দাম্পত্য কলহ। স্বামী স্ত্রীকে বিশ্বাস করছে না, স্ত্রী স্বামীকে বিশ্বাস করছে না। পরিবারগুলো ভেঙ্গে যাচ্ছে। সম্পর্কগুলো ঠুনকো হয়ে যাচ্ছে। সম্ভাবনাগুলো নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। যখন নারী-পুরুষ উভয়ই নিজেদেরে চাকরি-বাকরি, উপার্জন, অবস্থান ও ক্যরিয়ার নিয়ে ব্যস্ত, দুজনেই যখন স্বয়ংসম্পূর্ণ ও আত্মনির্ভশীল হতে মরিয়া তখন দুজনের মধ্যে স্বতন্ত্র চিন্তা-চেতনা, ব্যক্তিত্ব ও ইমেজ গড়ে ওঠে, সেই সাথে বাড়তে থাকে উভয়ের মাঝে দূরত্ব। এই সুযোগে অনেকেই জড়িয়ে পড়ে পরকিয়ার মতো ভয়ঙ্কর সামাজিক ব্যাধিতে। ফলশ্রুতিতে পারস্পরিক ভালোবাসা, হৃদ্যতা ও আকর্ষণ হারিয়ে যায়। একজনকে আরেকজনের ভালো লাগে না। মেজাজ খিটখিট হয়ে যায়। সংসারে সারাক্ষণ ঝগড়া-বিবাদ লেগে থাকে।

যারা কোনরকমে পরকিয়ার এই অভিশাপ থেকে বেঁচে যায় তারাও যখন নিজেকে ঘিরেই মশগুল থাকে, তখন স্বাভাবিকভাবেই একে অন্যের প্রতি প্রীতি, সম্মান ও দায়বদ্ধতার জায়গাটা হারিয়ে ফেলে। সবশেষে বাকি থাকে শুধু শারীরিক চাহিদার পূরণের কাজটুকু। কিন্তু কথা হল অর্থনৈতিক, সামাজিক ও রাজনৈতিক স্বয়ংসম্পূর্ণতা লাভের পর এ সাধারণ কাজে পরস্পরের প্রতি নির্ভরশীল হওয়া কতটুকু সম্ভব? বিশেষত বাইরে যখন অবারিত সুযোগ। পকেটে যখন টাকা। মূলত যখন অবস্থা এমনই হয় তখন পরিচয়ের ক্ষেত্রে তারা পরস্পর স্বামী-স্ত্রী হলেও কার্যত তারা এক ঘরে রাত্রি যাপনকারী দুই জন নারী পুরুষ মাত্র। শেষ পর্যন্ত চূড়ান্তভাবে এ সম্পর্কও একসময় বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া তাদের ক্ষেত্রে বিচিত্র কিছু নয়।

শেষকথা, আল্লাহ্‌র চিরচারিত বিধানের বাইরে গিয়ে যারা ইচ্ছেমত নিজেদের জীবন পরিচালনা করতে চায় তারা দৃশ্যত সাময়িক ভালো থাকলেও পক্ষান্তরে আল্লাহ্‌র অবারিত রহমত ও সুখ-শান্তি থেকে তারা বঞ্চিত হয়। পারিবারিক শান্তি-শৃঙ্খলা, সম্প্রীতি, বন্ধন, গভীর প্রেম ও ভালোবাসা শূন্য অর্থোপার্জনের বিশেষ এই যন্ত্রমানবদের কর্মফলের এ এক করুন পরিণতি বৈ কিছুই নয়!

সুত্র: আল কুরআন, সহীহ বুখারী, সুনানে আবূ দাঊদ, সহীহ ইবনে হিব্বান, সহীহ ইবনে খুযাইমাহ, তাবয়ীনুল হাকায়েক ৬/১১৭, আলবাহরুর রায়েক ১/২০০, আদ্দুররুল মুখতার ৬/৫৫, ফিকহুন নাওয়াযিল ৩/৩৫৯, ফাতাওয়া আল-মার’আহ আল মুসলিমাহ ২/৯৮১, আল মাউসূআতুল ফিকহিয়্যাহ আল কুয়েতিয়্যাহ, ৭/৮২।

লেখক: মুফতি যাকারিয়্যা মাহমূদ মাদানী
পরিচালক: ভয়েস অব ইসলাম।
প্রধান গবেষক: আস-সুন্নাহ ফাউন্ডেশন
সম্পাদক ও প্রকাশক: ডেইলি মাই নিউজ।
jakariyamahmud@gmail.com

আরও পোস্ট

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

Back to top button
Close