নারী অঙ্গনমুফতি যাকারিয়্যা মাহমূদ-এর কলাম

নারীর অনলাইন ব্যবসা: শরয়ী দৃষ্টিকোণ

ইসলামের বিধিবদ্ধ আইনে নারীর উপর ব্যয় নির্বাহের কোনো দায়বদ্ধতা নেই। নারীর যাবতীয় ব্যয়ভার নির্বাহ করবে পুরুষ। সুতরাং স্বাভাবিক নিয়মে নারীর কর্মসংস্থানের কোনো প্রয়োজন নেই এবং থাকার কথাও নয়।

আল্লাহ তা‘আলা বলেন, পুরুষ নারীর ব্যবস্থাপক। কারণ আল্লাহ তাদের এক জনকে আরেক জনের উপর মাহাত্ম্য দান করেছেন। এবং তারা তাদের ধনসম্পদ (নারীদের উপর) ব্যয় করে। সুতরাং সতী সাধ্বী নারীরা হয় অনুগতা এবং আল্লাহ তা‘আলা যেসব বিষয় হিফজতযোগ্য করেছেন লোকচক্ষুর অন্তরালে তারা তার হিফাজত করে। (‘সূরা নিসা-৩৪)

আল্লাহ তা‘আলা আরোও বলেন, আর পিতার উপর কর্তব্য, বিধি মোতাবেক তাদের (স্ত্রীদের) ভরণ-পোষণ করা। কাউকেও তার সাধ্যাতীত কার্যাভার দেয়া হয় না। (‘সূরা আল বাকারা-২৩৩)

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে স্ত্রীর প্রতি পুরুষের দায়িত্ব সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি বলেন, যখন তুমি আহার করবে তখন তাকেও (স্ত্রী) আহার করাবে, যখন তুমি বস্ত্র পরিধান করবে তখন তাকেও বস্ত্র পরিধান করাবে। (সুনানে আবু দাঊদ-২১৪২)

দ্বিতীয়ত প্রকৃতি ও স্বভাবজাতগতভাবেই নারীরা সংসারী। ঘরোয়া কাজের সাথে নারীর সম্পর্ক, সংশ্লিষ্টতা ও আগ্রহবোধ একান্তই সৃষ্টিগত। মায়া, মমতা, প্রেম, ভালোবাসার পাশাপাশি ঘর পরিচালানার এক অনন্য বৈশিষ্ট্য দিয়ে আল্লাহ্‌ তাআলা নারী জাতিকে সৃষ্টি করেছেন। তাই নারী জন্মগতভাবেই সংসার পরিচালনায় আগ্রহী। এটা তার সৃষ্টিগত বৈশিষ্ট্য ও অধিকার। তাই নারীদেরকে কর্মসংস্থানমুখী করতে বাধ্য করার কোনো সুযোগ নেই। তবে নারীর কর্মতৎপরতা কেবলমাত্র জ্ঞানার্জন, ও চিন্তা-গবেষণার ক্ষেত্র পর্যন্তই সীমাবদ্ধ থাকবে ইসলাম এমন কথা বলেনি; বরং ইসলামের দৃষ্টিতে নারী যেমন জ্ঞান-বিজ্ঞানে শিক্ষা লাভে অগ্রসর হতে পারে, তেমনি কৃষি ও ব্যবসা-বাণিজ্যেও অংশগ্রহণেরও সম্পূর্ণ অধিকার রাখে। সেই সঙ্গে সমাজ, দেশ ও জাতির কল্যাণমূলক কাজেও তারা ভূমিকা রাখতে পারে। কিন্তু তার অর্থ এই নয় যে, নারীদের এসব কাজে নেমে যেতে হবে। তবে পরিবার বা সমাজে এমন কিছু পরিস্থিতি সৃষ্টি হয় যার কারণে নারীদেরও কর্মসংস্থানের প্রয়োজন হয়ে পড়ে। তখন যথাসাধ্য শরঈ বিধান পালন সাপেক্ষে নারীদের জন্যও কর্মসংস্থানের অনুমতি ইসলাম দিয়েছে।

কুরআনুল কারীমে আল্লাহ্‌ তাআলা বলেন, ‘আমি ব্যবসাকে হালাল করেছি এবং সুদকে হারাম করেছি।’ (সূরা আল বাকারা-১৮৬)

এই আয়াতে ব্যবসা হালাল হওয়া এবং সুদ হারাম হওয়া নারী-পুরুষ সকলের জন্য সমভাবে প্রযোজ্য। একজন পুরুষ হালাল পন্থায় যেসব ব্যবসা-বাণিজ্য করতে পারে একজন নারীও সেসব ব্যবসা করতে পারে। সে বিবাহিত হোক কিংবা অবিবাহিত হোক। এবং সেই সাথে সে তার অর্জিত সকল সম্পদের ওপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণকারী। কোনো বিধি নিষেধ ছাড়াই সে তার সম্পত্তির ব্যাপারে সব ধরনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে পারে, যা একজন পুরুষের জন্যও প্রযোজ্য। নারীর অর্জিত অর্থে তার ইচ্ছার বিরুদ্ধে কারো হস্তক্ষেপ করার আইনগত কোনো অধিকার বা ক্ষমতা নেই। আল্লাহ্‌ তাআলা বলেন: ‘যা কিছু পুরুষরা অর্জন করবে, তা তাদেরই অংশ হবে; আবার নারীরা যা কিছু উপার্জন করবে, তাদেরই অংশ হবে।’ (সূরা নিসা-৩২)

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর যুগেও নারীরা পর্দা ও সম্ভ্রম রক্ষা করে বিভিন্ন কাজ-কর্ম করতেন বলে প্রমাণ পাওয়া যায়। যেমন, আসমা বিনতে আবু বকর রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, ‘যখন যুবায়ের আমাকে বিয়ে করেন, তখন তাঁর কোনো ধন-সম্পদ ছিল না, এমনকি কোনো স্থাবর জমিজমা, দাস-দাসীও ছিল না; শুধু কুয়া থেকে পানি উত্তোলনকারী একটি উট ও একটি ঘোড়া ছিল। আমি তাঁর উট ও ঘোড়া চরাতাম, পানি পান করাতাম এবং পানি উত্তোলনকারী মশক ছিঁড়ে গেলে সেলাই করতাম, আটা পিষতাম, কিন্তু ভালো রুটি তৈরি করতে পারতাম না। … রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যুবায়েরকে একখণ্ড জমি দিলেন। আমি সেখান থেকে মাথায় করে খেজুরের আঁটির বোঝা বহন করে আনতাম। ওই জমির দূরত্ব ছিল প্রায় দুই মাইল। একদিন আমি মাথায় করে খেজুরের আঁটি বহন করে নিয়ে আসছিলাম। এমন সময় রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সঙ্গে সাক্ষাৎ হলো, তখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সঙ্গে কয়েকজন আনসারও ছিলেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে ডাকলেন এবং তাঁর উটের পিঠে বসার জন্য উটকে আখ্! আখ্! বললেন, যাতে উটটি বসে এবং আমি তার পিঠে আরোহণ করতে পারি।’ (সহীহ বুখারী-৫২২৪)

কুরআন ও হাদীসের উপরোক্ত দলীলের আলোকে বুঝা যায় যে, ইসলাম একজন পুরুষকে যেমন অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের অনুমতি দিয়েছে, অনুরুপভাবে নারীকেও অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হতে কাজ-কর্ম ও ব্যবসা-বাণিজ্যে বা যেকোনো বৈধ উপার্জনের অধিকারও প্রদান করেছে। উপার্জনের প্রয়োজনে গৃহের বাইরে যাওয়রও অনুমতি দিয়েছে, যেমন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নারীদের উদ্দেশে বলেন, নিশ্চয়ই তোমাদের জন্য প্রয়োজনে বাহিরে বের হওয়ার অনুমতি আছে। (সহীহ বুখারী-৪৭৯৫, সহীহ মুসলিম-৫৭৯৬)

অতএব নারীরাও জরুরী প্রয়োজনে শরয়ী ঘন্ডির মধ্যে থেকে নিম্মক্ত শর্তের আলোকে অনলাইন, অফলাইনসহ যেকোনো বৈধ ব্যবসা পলিসির মাধ্যমে ব্যবসা বা চাকরি করতে পারে।

১. ব্যবসা বা কর্মটি হতে হবে হালাল ও হালাল পদ্ধতিতে ও শরীয়ত নির্ধারিত সীমারেখার মধ্যে।
২. সম্পূর্ণ শরয়ী পর্দা রক্ষা করতে হবে। মুখমণ্ডল ঢেকে রাখতে হবে।
৩. বিবাহিত হলে স্বামী আর অবিবাহিত হলে পিতা বা তার স্থলাভিষিক্ত অভিভাবকের অনুমতি লাগবে।
৪.  কর্মস্থলটি শুধুমাত্র নারীদের জন্যই হতে হবে, সেখানে ভিন পুরুষের সাথে মেলামেশার কোনো সুযোগ থাকবে না।
৫. ফেতনা-ফ্যাসাদে জড়িয়ে পড়ার ব্যাপারে সর্তক থাকতে হবে।
৬. পরপুরুষের সাথে কথা বলার ক্ষেত্রে প্রয়োজনের অতিরিক্ত কথা বলা যাবে না, এবং কোমল কণ্ঠ পরিহার করতে হবে।
৭. বাহিরে যাওয়ার সময় সুগন্ধি ব্যবহার করবে না।
৮. পর পুরুষের সামনে নিজের সৌন্দর্য প্রকাশ করবে না।
৯. অনলাইনে লাইভ করবে না, কারণ এতে বড় ধরণের ফেতনার আশঙ্কা রয়েছে।
১০. পর্যাপ্ত নিরাপত্তা থাকতে হবে।
১১. ব্যবসা বা চাকুরি হতে হবে জীবন ও জীবিকার প্রয়োজনে। বিনা প্রয়োজনে শুধুমাত্র শখের বসে বা বিলাসিতার জন্য হবে না।
১২. তার কাজ তাকে মাহরাম ছাড়া ভ্রমনে বাধ্য করবে না।
১৩. নারীর উপর ন্যস্ত দায়িত্ব পালনে বাঁধার সৃষ্টি করে এমন কাজ হতে পারবে না। যেমন, গৃহের দেখাশোনা, স্বামীর খেদমত ও সন্তানের যত্ন নেওয়া, ইত্যাদি।

লেখক: মুফতি যাকারিয়্যা মাহমূদ মাদানী
পরিচালক: ভয়েস অব ইসলাম।
প্রধান গবেষক: আস-সুন্নাহ ফাউন্ডেশন
সম্পাদক ও প্রকাশক: ডেইলি মাই নিউজ।
jakariyamahmud@gmail.com

 

আরও পোস্ট

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

Back to top button
Close