মুফতি যাকারিয়্যা মাহমূদ-এর কলাম

ইসলামে আশুরা ও মুহাররম

ইতিহাসে আশুরা:

হিজরী বর্ষের প্রথম মাস মুহাররম। কুরআনের ভাষায় মুহাররম ‘আরবাআতুন হুরুম’- অর্থাৎ চার সম্মানিত মাসের অন্যতম। এ মাসে পৃথিবীর বহু ঐতিহাসিক ঘটনা সংঘটিত হয়েছে। বনি ইসরাইলের জন্য সমুদ্রে রাস্তা বের করে দিয়েছেন এবং তাদেরকে নিরাপদে পার করে দিয়েছেন। আর একই রাস্তা দিয়ে ফেরাউন ও তার অনুসারীদেরকে ডুবিয়ে মেরেছেন। (সহীহ বুখারী ১/৪৮১)

‘আব্দুল্লাহ ইবনু ‘আব্বাস হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নাবী যখন মদীনায় আগমন করলেন তখন দেখলেন যে ইয়াহূদী সম্প্রদায় দশই মুহাররমে আশুরার সিয়াম পালন করছে। তিনি প্রশ্ন করলেন, একি বিষয়? তারা বলল, এ হলো পবিত্র দিন, যে দিনে আল্লাহ তা‘আলা বানী ইসরা-ঈলকে তাদের শত্রর হাত থেকে মুক্ত করেছেন, ফলে মূসা আলাইহিস সালাম সে দিনটি শুকরীয়াস্বরূপ সিয়াম রেখেছেন (আমরাও তার অনুসরণ করে রাখছি)। নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন: আমি তোমাদের চেয়ে মূসা আলাইহিস সালাম-এর মতো সিয়াম রাখার বেশী অধিকার রাখি, অতঃপর তিনি সিয়াম রাখেন এবং অন্যদের সিয়াম রাখার নির্দেশ দেন।

আশুরার ইবাদত:

এ মাসে আশুরার রোযা ব্যতিত অন্য কোনো ইবাদতের কথা কুরআন-হাদীসের বিশুদ্ধ বর্ণনায় পাওয়া যায় না। আশুরারা রোযা বা সিয়াম মূলত ইসলাম-পূর্বযুগ হতেই ছিল। অতঃপর  রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মদীনায় এসে এটাকে ইসলামের ইবাদত হিসেবে ঘোষণা করেন।

আয়েশা রা. বলেন, রাসূলুল্লাহ যখন মক্কা হতে মদীনায় হিজরত করে গেলেন তখন তিনি নিজে সিয়াম রাখলেন এবং অন্যদেরকে সিয়াম রাখার নির্দেশ দিলেন, অতঃপর যখন রামাযানের সিয়াম ফরয হলো তখন তিনি বললেন, যার ইচ্ছা হয় আশুরার সিয়াম রাখবে আর যার ইচ্ছা হয়, রাখবে না।

নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সর্বপ্রথম আশুরার সিয়াম হিসাবে মুহাররম মাসের দশ তারিখে শুধু একটি সিয়াম রাখেন এবং সে দিনটির ফযীলত বর্ণনা করেন। অতঃপর দশম হিজরীতে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে জিজ্ঞাসা করা হলো, ইয়াহূদী সম্প্রদায় এ দিনটিকে খুব মর্যাদা দেয় এবং সে দিনটিতে সিয়াম রাখে? তখন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, যদি আমি আগামী বছর বেঁচে থাকি তাহলে নবম তারিখও সিয়াম রাখব। কিন্তু আগামী বছর আসার পূর্বেই তিনি দুনিয়া হতে বিদায় নেন।

আবু হুরায়রা রা. থেকে বর্ণিত একটি হাদীসেও এমন এসেছে, নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, ‘আমি যদি আগামী বছর বেঁচে থাকি তাহলে ৯ তারিখেও অবশ্যই রোযা রাখব।’ (সহীহ মুসলিম ১/৩৫৯)

আশুরার রোযার সংখ্যা সম্পর্কে হাদীসে এসেছে,

صوموا عاشوراء وخالفوا فيه اليهود، صوموا قبله يوما أو بعده يوما

‘তোমরা আশুরার রোযা রাখ এবং ইহুদীদের সাদৃশ্য পরিত্যাগ করে; আশুরার আগে বা পরে আরো একদিন রোযা রাখ।’ (মুসনাদে আহমদ ১/২৪১)

উল্লেখিত হাদীসগুলো থেকে বুঝা যায়, আশুরার রোযা দুটি। মুহাররমের নয় ও দশ, অথবা দশ ও এগারো তারিখ। যেকোনো দু’দিন রোযা রাখা উত্তম।

আশুরার রোযার ফযিলত:

আশুরার রোযা অত্যন্ত ফযিলতপূর্ণ। হাদীসে এসেছে,

আবু হুরায়রা রা. থেকে বর্ণিত,  নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,

أفضل الصيام بعد رمضان شهر الله المحرم

‘রমযানের পর আল্লাহর মাস মুহাররমের রোযা হল সর্বশ্রেষ্ঠ।’ (সহীহ মুসলিম ২/৩৬৮; তিরমিযী ১/১৫৭)

আবদুল্লাহ বিন আব্বাস রা. থেকে বর্ণিত আরেকটি হাদীসে এসেছে, তিনি বলেন,

ما رأيت النبي صلى الله عليه وسلم  يتحرى صيام يوم فضله على غيره إلا هذا اليوم يوم عاشوراء وهذا الشهر يعني رمضان

‘আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে রমযান ও আশুরায় যেরূপ গুরুত্বের সঙ্গে রোযা রাখতে দেখেছি অন্য সময় তা দেখিনি।’ (সহীহ বুখারী ১/২১৮)

আলী রা.কে এক ব্যক্তি প্রশ্ন করেছিল, রমযানের পর আর কোন মাস আছে, যাতে আপনি আমাকে রোযা রাখার আদেশ করেন? তিনি বললেন, এই প্রশ্ন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট জনৈক সাহাবী করেছিলেন, তখন আমি তাঁর খেদমতে উপসি’ত ছিলাম। উত্তরে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, ‘রমযানের পর যদি তুমি রোযা রাখতে চাও, তবে মুহররম মাসে রাখ। কারণ, এটি আল্লাহর মাস। এ মাসে এমন একটি দিন আছে, যে দিনে আল্লাহ তাআলা একটি জাতির তওবা কবুল করেছেন এবং ভবিষ্যতেও অন্যান্য জাতির তওবা কবুল করবেন।’(জামে তিরমিযী ১/১৫৭)

অন্য হাদীসে এসেছে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,

صيام يوم عاشوراء أحتسب على الله أن يكفر السنة التي قبله

‘আমি আশাবাদী যে, আশুরার রোযার কারণে আল্লাহ তাআলা অতীতের এক বছরের (সগীরা) গুনাহ ক্ষমা করে দিবেন।’ (সহীহ মুসলিম ১/৩৬৭; জামে তিরমিযী ১/১৫৮)

মুহররম ও আশুরাকেন্দ্রিক নানা কুসংস্কার:

আশুরা সম্পর্কে সমাজে নানা রকম কুসংস্কার ও অজ্ঞতা প্রচলিত রয়েছে। এ দিনের গুরুত্ব গুরুত্ব প্রকাশ করতে গিয়ে অনেকে নানা ভিত্তিহীন কথাও বলে থাকেন। যেমন, এদিন ইউসুফ আ. জেল থেকে মুক্তি পেয়েছেন। ইয়াকুব আ. চোখের জ্যোতি ফিরে পেয়েছেন। ইউনুস আ. মাছের পেট থেকে মুক্তি পেয়েছেন। ইদরীস আ.কে আসমানে উঠিয়ে নেওয়া হয়েছে। আবার অনেকে বলে থাকে, এদিনেই কিয়ামত সংঘটিত হবে। বস্তুত এসব কথার কোনো ভিত্তি নেই। (আল আসারুল মারফূআ, আবদুল হাই লাখনবী ৬৪-১০০; মা ছাবাহা বিসসুন্নাহ ফী আয়্যামিস সানাহ ২৫৩-২৫৭)

এ মাসে যেসব অনৈসলামিক কাজকর্ম ঘটতে দেখা যায় তার মধ্যে তাজিয়া, শোকগাঁথা পাঠ, শোক পালন, মিছিল ও র‌্যালি বের করা, শোক প্রকাশার্থে শরীরকে রক্তাক্ত করা ইত্যাদি অন্তর্ভুক্ত। এসব রসম-রেওয়াজের কারণে এ মাসটিকেই অশুভ মাস মনে করার একটা প্রবণতা অনেক মুসলমানের মধ্যেও লক্ষ করা যায়। এজন্য অনেকে এ মাসে বিয়ে-শাদী থেকেও বিরত থাকে। মূলত এগুলো পথভ্রষ্ট শিয়ারা করে থাকে। তবে দুঃখজনক হলেও সত্য যে, শিয়াদের এসকল গর্হিত কাজে অনেক সুন্নীকেও দেখা যায়। বলাবাহুল্য এগুলো অনৈসলামিক ধারণা ও কুসংস্কার।

লেখক: মুফতি যাকারিয়্যা মাহমূদ মাদানী
পরিচালক: ভয়েস অব ইসলাম।
প্রধান গবেষক: আস-সুন্নাহ ফাউন্ডেশন
সম্পাদক ও প্রকাশক: ডেইলি মাই নিউজ।
jakariyamahmud@gmail.com

আরও পোস্ট

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

Back to top button
Close