সুলাইমানী হত্যা, শিয়া মতবাদ, ইরানী বিপ্লব ও আমাদের মায়াকান্না

পর্ব-১

ইহুদী, ইঙ্গ মার্কিন সভ্যতাকে মুসলিমরা তাদের এন্ট্রি হিসাবেই জ্ঞান করে। তাই বিশ্বের সকল মুসলিম তাদের ব্যাপারে সতর্কতা অবলম্বনের চেষ্টা করে। সঙ্গত কারণেই তাদের ব্যাপারে একরাশ ক্ষোভ ও ঘৃণা ছড়িয়ে আছে মুসলমানদের অন্তরে। ঠিক তার বিপরীতে আমাদের কিছু ভাইয়ের রয়েছে ইরানের জন্য অযাচিত গদগদে উপচে প্রেম ও ভালোবাসা। এটি এ কারণে যে, ইহুদী-খ্রিস্ট সভ্যতা সম্পর্কে আমরা জানলেও ওয়াকিফহাল নই ধূর্ত-চালাক শিয়াদের কূটকৌশল, অপরাধ ও ভ্রান্ত আকীদা-বিশ্বাস সম্পর্কে। এ দেশের বহু সাধারণ মুসলিমই শুধু নয় বরং অনেক আলেম-ওলামাকেও দেখা যায় তারা শিয়াদের ব্যাপারে বেশ ফ্লেক্সীবল। কেউ কেউ তো ইরানকে আবার ইসলামের ধারক-বাহকই মনে করে। অথচ শিয়া একটি কট্টরপন্থী ভ্রান্ত ধর্মীয় উগ্র মতবাদ। বহুদা বিভক্ত, বিভ্রান্ত কঠোর জঙ্গিভাবাপন্ন সুন্নি বিদ্বেষী একটি চরমপন্থি গুষ্ঠি।

এ দেশের সাধারণ মুসলিমরা জানে না যে, ঐতিহাসিকভাবেই শিয়ারা ইসলামের চিরদুশমন ইহুদীদের মাসতুতো ভাই। রাসূলূল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসালাম-কে যে ইহুদীরা একটি মুহূর্তের জন্যও শান্তিতে থাকতে দেয়নি, বারবার আঘাতের পর আঘাত করেছে, কুচক্রান্ত করেছে, ইসলামকে দুনিয়া থেকে মিটিয়ে দিতে চেয়েছে, সেই ইহুদীদের ঔরসে জন্মনেয়া শিয়ারা রাসূলূল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসালাম-এর ইন্তেকালের পরও ঠিক একইভাবে খেলাফতে রাশেদার সময় একই কাজ করেছে। পার্থক্য শুধু এই ছিলো যে, রাসূলের সময় তারা ছিলো চিহ্নিত ইহুদী আর খেলাফতে রাশেদার সময় নিজেদেরকে এরা ইসলামের সবচেয়ে বড় দরদি দাবি করে৷ পক্ষান্তরে এরা ছিল কপট ইহুদী। এদের পূর্বপুরুষ আব্দুল্লাহ বিন সাবার নেতৃত্বে এরা ইসলামের তিনজন খলীফাকে নিষ্ঠুরভাবে শহীদ করে। ওমর রা., ওসমান রা. ও আলী রা. খেলাফতে রাশেদার এই তিন নক্ষত্রকে শিয়ারা শহীদ করার মাধ্যমে ইতিহাসে ইসলামী খেলাফত ধ্বংসের একটি কলঙ্কিত কালো অধ্যায় রচনার সূচনা করেছে।

শিয়া মতবাদ বস্তুত এমন একটি নোংরা চিন্তা ও দর্শনে চালিত যে, এর পুরোটাই অসভ্যতা, অশ্লীলতা, যিনা ও ভ্যবিচারের উপর দাড়িয়ে আছে। এরা এমন এক নিকৃষ্ট সম্প্রদায় যে, ইসলামে হারাম মুতআ/যিনা-ভ্যবিচারকে তারা তাদের সবচেয়ে পবিত্র ইবাদত মনে করে। আর একে ঘিরে এমন সব অলীক বিশ্বাস লালন করে যা কোনো মুসলিম তো দূরের কথা কোনো কাফেরও করে না। তারা এ আকীদা পোষণ করে যে, মুতআর/যিনার পর গোসল করলে, সেই গোসলের প্রতি ফোটা পানি থেকে ৭০ হাজার ফেরেশতা জন্ম নেয় এবং মুতআকারীদের জন্য দোয়া করতে থাকে, (নাইউযুবিল্লাহ!)।

শিয়াদের অজু, গোসল, নামায, রোযা, হজ্জ যাকাতসহ সকল ইবাদতই আলাদা। তাদের দিনের শুরু ও শেষ হয় সাহাবায়ে কেরামকে গালিগালাজ ও লানত করার মাধ্যমে। শিয়ারা তাদের ইমামদের নিষ্পাপ/মাসুম মনে করে। শিয়ারা মনে করে আমাদের কুরআন সঠিক নয়, যে কারণে তারা নিজেরাই সূরা আলী নামে একটি সূরা বানিয়েছে। শিয়া এ ধারণাও পোষণ করে যে, নবুয়তের প্রকৃত হকদার ছিলেন আলী রা. কিন্তু জিবরীল আ. ভুল করে মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট ওহী নিয়ে আসেন। (নাউযুবিল্লাহ)। এভাবেই শিয়ারা ইসলামের প্রতিটি বিষয়ে নিজেদের উদ্ভাবিত অলীক ও উদ্ভট বিশ্বাস আর মনগড়া ভ্রান্ত আমল আবিষ্কারের মাধ্যমে ইসলামকে একটি তামাশার পাত্রে পরিণত করেছে।

তাই শিয়াদের এসব অবাস্তব, অসত্য ও অনৈসলামিক চিন্তাধারা এবং কার্যক্রমের ফলে মুসলিম বিশ্বের সকল শীর্ষস্থানীয় আলেম-ওলামা ও স্কলারদের মতে শিয়ারা কাফের। শাশ্বত সত্য ইসলামে তাদের কোনো স্থান নেই। ইসলামের মূল থেকে তারা তাদের আনিত বিশ্বাস ও কর্মের মাধ্যমে বেরিয়ে গেছে। কারণ কুরআন-সুন্নাহর মৌলিক বিষয়গুলোতে তারা অস্বীকার ও ব্যাপক পরিবর্তন-পরিবর্ধন সাধন করেছে।

ইরানী পুরুষদের মুখে চাপ দাড়ি, মাথায় সাদা/কালো পাগড়ী, গায়ে লম্বা জুব্বা তার উপর আলখেল্লা, ইসরাইল ও আমেরিকার বিরুদ্ধে ফাকা বুলি, আর নারীদের শুভ্র অনাবৃত অবয়বে দীঘল কালো বোরকা দেখে এদেশের সাধারণ মুসলিমরা খুব সহজেই ধোঁকায় পড়ে যায়। তাদেরকে ইসলামের ঠিকাদার ভাবে। অথচ তারা জানে না আজ ইসলামের প্রথম কিবলা বাইতুল মাকদিসকে বর্বর দখলবাজ ইহুদীরা জবরদখল করে আছে। ঠিক একইভাবে তাদের মাতুলগোষ্ঠী শিয়ারাও বিশ্বমুসলিমের শ্বাশত কিবলা পবিত্র মসজিদুল হারাম ও মসজিদে নববীকে দখল করতে চায়। সে লক্ষ্যে ইসলামের ভিত্তিভূমি সৌদি আরবকে ইরান ও তার শিয়া মিত্ররা ধ্বংস করতে মরিয়া হয়ে উঠেছে। চারিদিক থেকে চতুর্মুখী আক্রমণ চালাচ্ছে। শুধু সৌদি আরব নয় গোটা আরব বিশ্বে অশান্তির দাবানল ছড়িয়ে দিয়েছে শিয়ারা। তাদের এই হীন স্বার্থ চরিতার্থে গড়ে তুলেছে বিভিন্ন গোপন সংগঠন ও বাহিনী। লেবাননের জঙ্গি সংগঠন হিযবুল্লাহ, ইরান রেভুলিউশনারি গার্ডস, আল কুদস ফোর্স। এসব ইরানের আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসী গুষ্ঠি। এগুলোর বাইরেও বিভিন্ন মুসলিম দেশে নাশকতামূলক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত শিয়াতন্ত্রের প্রধান মোড়ল ও ভিত্তিদেশ এই ইরান।

আমাদের এক শ্রেণীর তথাকথিত উদার ভাইয়েরা তবুও বলবে, শিয়ারা মুসলিম! আসলে তারা শিয়াদের সম্পর্কে জানেন না। জানলে কোনো মুসলিম কখনোই শিয়াদের পক্ষ নিতো না। ভ্রান্ত মতবাদে বিশ্বাসী কেউ মুসলিম হতে পারে না, এই সহজ কথাটা আমাদের সরল ভাইগুলো বোঝতে চান না। তাদেরই অনেকে আবার ইরানের শিয়া বিপ্লবকে ভুল বুঝে বলে, ইসলামী বিপ্লব। এটা একদমই সঠিক নয়। শিয়া বিপ্লব আর ইসলামী বিপ্লব কখনো এক কথা নয়। যে শিয়াদের ইসলামে কোনো অংশই নেই তাদের নিজস্ব মতবাদ প্রতিষ্ঠার আন্দোলনকে ইসলামী আন্দোলন নামে অভিহিত করা চরম বোকামি সুলভ মূর্খতা। যারা ইসলামের বেসিক নলেজ বা নূন্যতম জ্ঞান রাখে, ইসলাম, ইসলামী আন্দোলন বা বিপ্লবের রূপরেখা, পথ ও পদ্ধতি এবং মানহাজ সম্পর্কে অবহিত তারা কখনো শিয়া বিপ্লবকে ইসলামী বিপ্লব বলতে পারে না। যারা এ সম্পর্কে অজ্ঞ বা তেহরান যাদের রাজধানী কেবল তারাই ইরানের শিয়া বিপ্লবকে ইসলামী বিপ্লব হিসেবে আখ্যা দিতে পারে।

পর্ব-২

শিয়ারা সুন্নিদের মারধর করা, গায়ে ইট মারা, থুতু নিক্ষেপ ও বিভিন্নভাবে কষ্ট দেয়াকে পুণ্যের কাজ মনে করে, সুন্নি হত্যাকে সওয়াবের কাজ বলে বিশ্বাস করে, এরপরও কীভাবে তারা মুসলিম হতে পারে?! যারা আবু বকর রা., ওমর রা., ওসমান রা. কে কে কাফের মনে করে, মদীনায় এসে তাদের কবরে থুতু মারে, তাদের উপর প্রতিদিন লানত করে তারা কীসের মুসলিম?! যারা উম্মুল মুমিনীন আয়েশা রা. কে ভ্যবিচারিনী মনে করে, মদীনায় তাঁর কবর খুঁড়ে লাশ বের করে তাঁর উপর যিনার হদ কায়েম করতে চায় তাদেরকেও কি আমরা মুসলিম বলবো!? এরকম হাজারো অপরাধ ও ধৃষ্টতা রয়েছে হোয়াইট এন্ড ব্লাক পাগড়ীধারীদের। কয়টা বলবো! পবিত্র মদীনায় এদের বহু বেয়াদবি ও আস্ফালন দেখেছি। দেখেছি এরা মদীনায় এসে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে সালাম না দিয়ে বাকীর পাশে দাড়িয়ে ‘আসসালামু আলাইকা ইয়া আলী’ বলে কান্নাকাটি করে। মসজিদে নববীতে এরা খুব কমই ঢুকে। সারাক্ষণ বাকীর আশেপাশে ঘুরঘুর করে আর আযান হলে হোটেলে চলে যায়, হারামে নামায পড়ে না।

শিয়ারা তো সেই লোক যারা ২০১৬ সালের ৫ জুলাই মসজিদে নববীতে আত্মঘাতী বোমা মেরে ত্রাসের ও আতংক সৃষ্টি করেছিলো। সে বোমায় গোটা হারাম এলাকা সেদিন থরথর করে কেঁপে উঠেছিলো। আমি সেদিন পাশেই ছিলাম। মহান আল্লাহ্‌ হেফাজত করেছেন। সে ভয়ংকর হামলায় সৌদি নিরাপত্তা বাহিনীর চারজন সদস্য প্রাণ হারিয়েছিলেন। কী ভয়ঙ্কর সেই দৃশ্য! কী নির্মম ও নিষ্ঠুর সেই অভিজ্ঞতা!

২০১৫ সালের হজ্জ মৌসুমে সংগঠিত মিনার সেই মর্মান্তিক ট্রাজেডি এখনো মানুষকে কাঁদায়। ২৪ জুলাই, স্মরণকালের ভয়াবহ সেই দুর্ঘটনায় সেদিন ৭৬৯ জন হাজী নিহত ও ৯৩৪ জন হাজী আহত হয়েছিলেন। ভয়াবহ এই ঘটনাটি ইরান খুব সচেতন ভাবেই ঘটিয়েছিলো। উদ্দেশ্য ছিলো, সৌদি আরবকে হজ্জ ব্যবস্থাপনায় বিশ্বের সামনে অযোগ্য ও দুর্বল প্রমাণ করে হজ্জ ব্যস্থাপনাকে নিজের কর্তৃত্বে নিয়ে আসা। তবে তাদের সে আশা পূরণ হয়নি। হবেও না ইন শা আল্লাহ্‌।

সারা পৃথিবীতে বিশেষ করে মুসলিম বিশ্বে ইরান তার শিয়া আকীদা ও আধিপত্যবাদ প্রতিষ্ঠার নেশায় বিভোর হয়ে আছে। বাংলাদেশেও ইরানী শিয়ারা চক্রান্ত শুরু করেছে। ইতিমধ্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্সি বিভাগকে ঘিরে শিয়াদের বিভিন্ন কার্যক্রম চোখে পড়ার মতো। একটি আনঅফিসিয়ালি সূত্র মতে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়েও ইরান তার নিজস্ব অর্থায়নে ফার্সি বিভাগ খোলার প্রপোজাল দিয়েছে। এভাবে দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ফার্সি বিভাগ চালু করার নামে পক্ষান্তরে তলে তলে তারা তাদের আসল টার্গেট শিয়া মতবাদের প্রচার-প্রসার করতে চায়। আর এ ক্ষেত্রে তারা তাদের স্বার্থ সিদ্ধির হাসিলের জন্য এ দেশীয় কিছু তথাকথিত মডারেট মুসলিম এজেন্ট ও ইসলামী পাড়ার কিছু চিহ্নিত মৌলভীকে ব্যবহার করছে। এই মানুষগুলো হয়তো সামান্য রুটি-রুযীর জন্য উম্মাহর ঘাতকদের সঙ্গে হাত মিলিয়েছে, না হয় না জেনেই হয়তো শিয়াদের চক্রান্তের শিকার হয়েছে।

আমাদের জেনে রাখা উচিৎ, মুসলিম উম্মাহর সবচেয়ে ভয়ংকর শত্রু হলো ইরান। ইহুদী ও খ্রিষ্টসভ্যতা মুসলিম উম্মাহর প্রকাশ্য দুশমন এটি যেমন সুস্পষ্ট সত্য, সেই সাথে এটিও অকাট্য সত্য যে, ইরান উম্মাহর প্রকাশ্য ও গোপন শত্রু। পরিতাপের বিষয় হচ্ছে আমরা ধূর্ত শিয়াদের চালাকি ধরতে পারছিনা, তাদের চক্রান্ত ও হীন কুটকৌশলগুলো অনুধাবন করতে পারছিনা। যার ফলে আমরা চিনতে পারছি না, কে আমাদের আসল শত্রু আর কে আমাদের আসল মিত্র। আমরা বারবার জাতীর পরিক্ষিত নির্ণীত শত্রুকেও এখন নির্ণয় করতে পারছিনা। অবশ্য শিয়ারা অতিশয় চালাক ও খুবই সুচতুর এক জাতি। মিথ্যা ও প্রতারনা এদের স্বভাবজাত ধর্ম। তাকিয়ার নামে সত্য গোপন ও মিথ্যাচার, মিডিয়া সন্ত্রাস, ও তথ্য বিভ্রাটের মাধ্যমে শিয়ারা তাদের সুন্নি বিদ্বেষ ও অপকর্মগুলোকে সুকৌশলে ঢেকে রেখেছে। তাই সাধারণ মানুষের পক্ষে তাদের সম্পর্কে খুব একটা জানতে পারছে না।

এবার আসা যাক কাসেম সুলাইমানী সম্পর্কে। কাসেম সুলাইমানী সম্পর্কে কে কতটুকু কী জানি আমরা? কে এই লোক? কী তার পরিচয়? কেন তাকে আমেরিকা মারতে গেলো? গত পর্বে আজকের উপরোক্ত আলোচনার দ্বারা শিয়াদের সম্পর্কে জানা হয়ে থাকলে এখানে এসব প্রশ্নের সংক্ষিপ্ত উত্তরে শুধু এটুকু বলাই যথেষ্ঠ যে, সুলাইমানীই মধ্যপ্রাচ্চে সন্ত্রাসের গডফাদার। ৭৯ থেকে তার হাত মানবতার রক্তে রঞ্জিত। সে লক্ষ সুন্নি মুসলিমের ঘাতক ও খুনি। সুলাইমানীর অপকর্ম ও সুন্নি নিধনে তার অন্যায় ও নীতিভ্রষ্ট ভূমিকার ফিরিস্তি দীর্ঘ। তার মৃত্যুতে সুন্নিদের মাঝে যেভাবে করুণ বিলাপ শুরু হয়েছে তার সম্পর্কে জানলে, তা কস্মিন কালেও হতোনা। বরং এই কসাইয়ের মৃত্যুতে খুশি হয়ে রাস্তায় আনন্দ মিছিল করতো।

সুলাইমানী ১৯৫৭ সালের ১১ মার্চ ইরানের কেরমান প্রদেশের কানাত-ই মালেক গ্রামে হতদরিদ্র এক কৃষক পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। কর্মজীবনের শুরুতে তিনি একজন নির্মাণ শ্রমিক ছিলেন। পরবর্তীতে সুলাইমানী ১৯৭৯ সালে শিয়া বিপ্লবের পর আল কুদস বাহিনীতে যোগ দেন। এটি ইরানের একটি সামরিক গুপ্ত সংস্থা। এই বাহিনীর কাজ হলো, বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে চোরাগুপ্তা হামলা বা অভিযান পরিচালনা করা। সুলাইমানী এই বাহিনীর প্রধান। তার হাত মানবতার রক্তে রঞ্জিত। মধ্যপ্রাচ্যে সন্ত্রাসী কার্যক্রম চালাতে ইরানের প্রধান হাতিয়ার হচ্ছে সুলাইমানীর এই কুদস ফোর্স। মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাইক পম্পেও গত বছরের এপ্রিলে ইরানের রেভুলিউশনারি গার্ডস ও কুদস ফোর্সকে সন্ত্রাসী গোষ্ঠী হিসেবে চিহ্নিত করেছেন।
আমাদের এটা মনে আছে যে, ইসরাইল ফিলিস্তিনকে দখল করেছে, কিন্তু আমরা এটা জানি না যে, ইরানই ইরাকের শিয়া মিলিশিয়াদের দিয়ে জর্জ বুশকে সেচ্ছায় ইরাকে ডেকে এনে ইরাককে ধ্বংস করেছে। এর একমাত্র কারণ, প্রয়াত সুন্নি শাসক সাদ্দাম হুসাইনকে হটিয়ে ইরাকের শিয়াদের হাতে ক্ষমতা তুলে দিয়ে সেখানে ইরানের প্রভাব বিস্তার করা। আর এ কাজটি যিনি করেছেন তিনি হলেন জেনারেল কাসেম সুলাইমানী। এই লোকটি নিতান্তই এজন সুন্নি বিদ্বেষী লোক। ইরান এই সুলাইমানীকে দিয়েই তার সুন্নি বিরোধী সকল এজেন্ডা বাস্তবায়ন করে আসছিলো।

ইরানের সরাসরি মদদে সুলাইমানী সিরিয়ার কুখ্যাত কসাই আওলায়ী শিয়া বাশার আল আসাদকে দিয়ে তথাকথিত সন্ত্রাস দমনের নামে সেখানে তারা মাত্র ২০% হওয়া সত্যেও ৮০% সুন্নি মুসলিমদের উপর রাষ্ট্রীয় গণহত্যা চালিয়েছে। একহাজারেরও বেশি সুন্নি ঈমাম ও খতীবকে অত্যন্ত পাশবিক কায়দায় হত্যা করেছে। বহু সুন্নি আলেমকে নিষ্ঠুরভাবে খুন করেছে। এখনও প্রতিনিয়ত সেখানে সুন্নিদের রক্ত ঝরছে। সুন্নিরা সেখানে রাষ্ট্রীয় সকল সুবিধা থেকে বঞ্চিত। আর ইরানে তো সকল সুন্নিকে হত্যা করে ফেলা হয়েছে ৭৯ শিয়া বিপ্লবের সময়ই। এখন যে কয়জন সুন্নি আছে সেখানে তাদের অবস্থা খুব নাজুক। তারা সুন্নি পরিচয় গোপন করে আছে। কারণ শিয়ারা জেনে গেলে তাদের উপর ভয়ঙ্কর বিপদ নেমে আসবে।

এর আগে আশির দশকে সুলাইমানী, বাশার আল আসাদের পিতা ও সিরিয়ার সাবেক স্বৈরশাসক হাফিয আল আসাদকে দিয়ে ইরাকের ২০ হাজার সুন্নি মুসলিম নর-নারী ও শিশুকে হত্যা করেছিলো। একই ভাবে আফগানিস্তানেও এই সুলাইমানীই হাজার হাজার তালেবানকে হত্যা করেছে। সেখানকার হাজার হাজার শিয়াকে ইরানে সরিয়ে নিয়েছে। ইরানের প্রত্যক্ষ সহযোগিতায় জেনারেল সুলাইমানী ইয়েমেনের বৈধ সুন্নি শাসক আলী আব্দুল্লাহ সালেহ্কে হটিয়ে সেখানকার হুছি শিয়ারা ইয়েমেনকে দখল করে নিয়েছে। সেই সাথে ইয়েমেনের সুদীর্ঘ ১,৩০০ কিলোমিটার বর্ডারের প্রতিবেশী দেশ সৌদি আরবকেও দখল করে সুন্নিমুক্ত করার ঘোষণা দিয়েছে। আর ইরান বহু আগেই মক্কা-মদীনা দখলের ঘোষণা দিয়েছে। এমতাবস্থায় সৌদি আরব যখন তার সুরক্ষার জন্য হুছিদের উপর আক্রমন করতে বাধ্য হলো তখনই শুরু হলো ইরান ও শিয়া প্রেমীদের আহাজারি!
সুতরাং আজকের যুদ্ধবিধস্ত ইয়েমেন পরিস্থিতির দায়ও সুলাইমানী ও তার দেশ ইরান কোনোভাবেই এড়াতে পারে না।

পর্ব-৩

ইসরাঈল ও আমেরিকা মুসলিমদের চিরচেনা দুশমন। পৃথিবীর প্রতিটা অস্থিরতায়, প্রতিটা যুদ্ধের দাবানলে এদের অশুভ হাত রয়েছে। এরা কথিত মানবতার প্রবক্তা হলেও প্রকৃতপক্ষে মানবতার শত্রু। মানবাধিকারের এই ধঝাধারিরা কেবলমাত্র নিজেদের আখের গোছাতেই ব্যস্ত। নিজেদের স্বার্থসংরক্ষণে এই সাম্রাজ্যবাদী অপশক্তিগুলো বারবার বিশ্বে আগ্রাসন চালিয়েছে, জমিনকে দাবানলে উত্তপ্ত করেছে। আজ যে, আমেরিকা ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধের হুমকি দেয় তা কেবলই নিজের ইমেজ রক্ষার্থে, নচেৎ আমেরিকা কখনো ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে আসবে না। কারণ এরা আদর্শিকভাবেই সুন্নিদের বিরুদ্ধে এক ও অভিন্ন। আর আমেরিকা অদূর ভবিষ্যতে সুন্নিদের শায়েস্তা করতে চাইলে ইরানকে তার দরকার হবে এটা আমেরিকা জানে। সুতরাং আমেরিকা সঙ্গত কারনেই ইরানের সঙ্গে কোনো সংঘর্ষে জড়াতে চাইবে না, যা ইতিমধ্যেই দৃশ্যমান, আমেরিকার সূর নরম হতে শুরু করেছে। ইরানও চাচ্ছে আমেরিকার সঙ্গে সহসাই কোনো দন্দে না জড়াতে, কারণ তার টার্গেট সৌদি আরবকে শায়েস্তা করা, আর এটা করতে হলে আমেরিকার সঙ্গে তার উষ্ণ সম্পর্ক বজায় রাখতেই হবে, তাই সেও এখন ভিন্নপথ খুঁজছে।

এবার চলুন ইতিহাসের বাঁকে বাঁকে আরেকটু ঘুরে আসি। আপনি কি দেখেছেন দুনিয়ার কোথাও শিয়ারা সুন্নিদের কল্যাণে কোনো কাজ করেছে? পৃথিবীর দেশে দেশে নির্যাতিত মুসলিমদের পক্ষে এগিয়ে এসেছে? মিয়ানমার, কাশ্মীর, চীনের উইঘুর, ফিলিস্তিন, সিরিয়া, ইরাক, ভারতের অযোদ্ধা ট্রাজিতে মুসলিম উম্মাহর পক্ষে কোনো ভূমিকা রেখেছে? পক্ষে কোনো কথা বলেছে? কোনো পদক্ষেপ নিয়েছে? নেয়নি। একটি বাক্য পর্যন্ত বলেনি। অথচ সন্ত্রাসবাদের অভিযোগে রাষ্ট্রদোহীতার মামলায় যখন শিয়া নেতা নিমর আল হাদিকে সৌদি আরব শিরোচ্ছেদ করলো সঙ্গে সঙ্গেই ইরানী শিয়ারা গর্জে ওঠলো! গোটা আরবে ত্রাস সৃষ্টি করলো! একইভাবে সুলাইমানীর জন্য তো রীতিমতো যুদ্ধের ঘোষণাই করলো। তেহরানের হুসাইন স্কয়ার এই মুহূর্তে প্রকম্পিত শিয়াদের মিছিলে মিছিলে। ইরানের সব শিয়ারা এখন হুসাইন স্কয়ারে সমবেত। কই আমরা তো ইরান ও শিয়াদের বিশ্বের নির্যাতিত মুসলিমদের পক্ষে এরকম কিছু করতে দেখি না! কেন? আসল কারণ হলো, উল্লেখিত মুসলিমরা সবাই সুন্নি, আর শিয়ারা সুন্নিদের শত্রু মনে করে। সুতরাং তারা শত্রুর পক্ষে কথা বলবে কেন?

ইতিহাস সাক্ষি, ইরান ও তার শিয়া মিত্ররা পৃথিবীতে কোথাও মুসলিম উম্মাহর স্বার্থে কোনো কাজ করেনি। উল্টো শিয়ারা যেখানেই গেছে সেখানেই মুসলিমদের ক্ষতি করেছে, সুন্নিদের উপর খড়গহস্ত হয়েছে, হত্যা করেছে, সুন্নি নারীদের ধর্ষণ করেছে, শিশুদের হত্যা করেছে, সুন্নিদের জায়গা-জমি দখল করে বসত-ভিটা থেকে তাড়িয়ে দিয়েছে। সুন্নি নিধনে উস্কানি দিয়েছে। সাম্রাজ্যবাদী আমেরিকা যখন আফগানিস্তানে আক্রমণ করে তখন ইরান অত্যন্ত নির্লজ্জভাবে শুধু সুন্নি হওয়ার জন্য আফগানিস্তানের পক্ষ না নিয়ে আমেরিকার সঙ্গে হাত মিলিয়েছিলো। জেনারেল সুলাইমানীর নেতৃত্বে আফগানিস্তানে সুন্নি তালেবানদের হত্যা করেছিলো। আমরা ইতিহাস ভুলে যাই, ইরাক-কুয়েত যুদ্ধে ইরান কার পক্ষ নিয়েছিলো? ফিলিস্তিন-ইসরাঈল ইস্যুতে ইরান কি আদৌ ফিলিস্তিনের পক্ষে? পক্ষে থাকলে এ পর্যন্ত সামরিক বা কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেয়নি কেন? আসলে ইরান কখনোই ইসরাঈলের বিরুদ্ধে কোনো একশনে যাবে না, এই মুরোদ তার নেই। কারণ ঐতিহাসিকভাবেই শিয়ারা ইসলামের চিরদুশমন ইহুদীদের মাতুল গোষ্ঠীর। সুতরাং ইরান তার মাসতুতো ভাইদের কোনোভাবেই রুষ্ট করবে না। এখানে কেউ কেউ হয়তো বলবে, তাহলে আমরা যে দেখি ইরান মাঝেমধ্যে ইসরাঈলের বিরুদ্ধে কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে এ ব্যাপারে কী বলবেন? আসল কথা হলো, ইসরাঈলের বিরুদ্ধে ইরানের দু একটা ঝাড়ি ধমকি যা দেখি আমরা তা নিছক রাজনৈতিক আইওয়াশ বৈ কিছুই নয়। এসব ঝাড়ি-তাড়িতে কিছু হয়না এটা সবাই জানে, আর এর দ্বারা যে, ইরান সুন্নিদের খুশি রাখতে চায় এটাও জ্ঞানীরা খুব ভালো করেই বোঝে। মূলত এটা ইরানের রাজনৈতিক ফন্দি। বস্তুত ইহুদী-শিয়া ভাই ভাই, ওরা সুন্নিদের পক্ষে নাই।

যদি ইয়েমেনের কথা বলি তো আমরা সেখানে কী দেখি? সেখানে ইরান কার পক্ষে কাজ করছে? কাদেরকে কী উদ্দেশ্যে সামরিক অস্ত্র-সস্ত্রের যোগান দিচ্ছে? হুছি কারা? তারা কেন ইয়েমেন দখল করতে চায়? একটি স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্রে হুছিরা কেন কোন কার সাহসে নিরপরাধ মানুষের উপর ঝাপিয়ে পড়লো? এতো অস্ত্র তারা কোথায় পেলো? হুছিদের কর্তৃক সৌদি আরবে নিক্ষেপিত মিসাইল ও ব্যলেস্টিক বোমাগুলোয় ইরানের নাম খুদিত কেন? ইয়েমেন-সৌদির এ যুদ্ধ কে বাঁধিয়েছে? আমাদের এসব জানতে হবে। তাহলেই ইরানের আসল চেহারা ও সুলাইমানীদের প্রকৃত মুখোশ উম্মোচিত হবে।

মুসলিমদের খুব ভালো করে জেনে রাখা উচিৎ, ইরান হলো গোটা মদ্ধপ্রাচ্যের সবচেয়ে বড় বিষফোঁড়া। কাতারে অস্থিরতা, বাহরাইনের সহিংসতা, লেবাননে সংকট, সৌদি আরবে বিশৃঙ্খলা এসবের মূল ক্রীড়নক এই ইরান। মধ্যপ্রাচ্য থেকে সুন্নিদের বিতাড়িত করে ইরান তার শিয়া আধিপত্যবাদ প্রতিষ্ঠার পরিকল্পিত নীলনকশা বাস্তবায়ন করতে চায়। ইরান চায়, যেকোনো ভাবেই হোক সৌদি আরবের ক্ষমতা দখলের মাধ্যমে মধ্যপ্রাচ্য হতে সুন্নিদের খতম করে সেখানে শিয়া মতবাদ প্রতিষ্ঠা করতে। এ লক্ষে ইরান কাজ করে যাচ্ছে এবং বেশকিছু দূর এগিয়েছেও। ইরাক, লেবানন, সিরিয়া এই তিনটি দেশ এখন শিয়া শাসিত। আরব আমিরাত, কাতার, বাহরাইন ও দুবাইয়েও রয়েছে প্রচুর শিয়া। এসব বিবেচনায় সৌদি আরব বড়ই একা। তার আশেপাশে শক্তিশালী কোনো সুন্নি রাষ্ট্র নেই। বিলাদুল হারামাইন ও ইসলামের এই ভিত্তিভূমিকে চারদিক থেকে শিয়ারা ঘিরে ফেলছে। সৌদি আরব এখন একটি সংকটময় মুহূর্ত অতিবাহিত করছে। আমার বিবেচনায়, স্থানীয় রাজনীতি ও মুসলিম বিশ্বের স্বার্থ সংরক্ষণে সৌদি আরবের অনেক ভুল পদক্ষেপ ও অন্যায় এ কথা ঠিক, তবে শুধুমাত্র সুন্নি রাষ্ট্র হিসাবে এবং পবিত্র হারামাইন শরীফাইনকে শিয়াদের কবল থেকে বাঁচাতে এই মুহূর্তে বিশ্বের সকল সুন্নি মুসলিমদের সৌদি আরবের পাশে দাঁড়ানো উচিৎ। নো বলা উচিৎ ইরান ও তার কুখ্যাত দোসরদের। সেইসাথে যদিও আমি এভাবে গুপ্ত হত্যাকে সমর্থন করিনা তথাপিও সুলাইমানীকে হত্যা করার জন্য প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে মুসলিমদের স্পেশাল ধন্যবাদ জানানো উচিৎ। কারণ তিনি চমৎকার ও যথোপযুক্ত একটি কাজ করেছেন। বরং আমার বিবেচনায় ট্রাম্প এই কসাইকে হত্যা করে তার জীবনের শ্রেষ্ঠ কাজটিই করেছেন। এতে তিনি ও তার দেশ যতোটা বেনিফিটেডই হোক না কেন মুসলিমদের বড় উপকার হয়েছে। যে কাজটি বিগত ২০ বছর চেষ্টা করেও অন্যরা করতে পারেনি সে কাজটি করার কৃতিত্ব নিঃসন্দেহে তাকে অমর করে রাখবে।

লেখক: মুফতি যাকারিয়্যা মাহমূদ মাদানী
প্রিন্সিপাল: মানাহিল মডেল মাদরাসা ও
মাদরাসাতুল মাদীনাহ লিল বানাত, মিরপুর, ঢাকা
পরিচালক: ভয়েস অব ইসলাম ও ইসলামিক গাইডেন্স।
[email protected]

এ সম্পর্কিত আরও পোস্ট

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

Back to top button