ঈমান-আকীদামুফতি যাকারিয়্যা মাহমূদ-এর কলাম

কুরআন-সুন্নাহর আলোকে

ইসলামী আকীদা

ঈমান ও আকীদা, কুরআন এবং সুন্নাহ নির্ভর একটি মৌলিক জীবনদর্শন। এই আদর্শকে ঘিরে একজন মানুষের জীবন পরিচালিত হয়। আর জীবন পরিচালনার এই মৌলিক জীবনদর্শনকেই ইসলামী পরিভাষায় ‘আকীদা’ বলে।

এই আকীদা এমন এক অতুলনীয় শক্তির আধার যা একজন মুসলিমকে তার আদর্শের প্রতি শতভাগ আস্থাবান করে তোলে এবং জীবনের প্রতিটি পদক্ষেপে সেই বিশ্বাসের প্রতিফলন ঘটাতে বিরামহীনভাবে সচেষ্ট রাখে। অপরপক্ষে মানবজগতের যাবতীয় পথভ্রষ্টতার মূলে রয়েছে এই মৌলিক আকীদা থেকে বিচ্যুত হওয়া। এজন্য একজন মুসলিমের জন্য ঈমান-আকীদার ব্যাপারে সুস্পষ্ট জ্ঞান রাখা এবং সে বিশ্বাসের যথার্থতা নিশ্চিত করা অতীব গুরুত্বপূর্ণ। কেননা বিশ্বাসের বিশুদ্ধতা ব্যতীত কোন ব্যক্তি প্রকৃত অর্থে মুসলিম হতে পারে না। প্রতিটি কথা ও কর্ম যদি বিশুদ্ধ আকীদা ও বিশ্বাস থেকে নির্গত না হয় তবে তা আল্লাহর কাছে গ্রহণযোগ্য নয়।

আল্লাহ তাআলা বলেন: “যে ব্যক্তি বিশ্বাসের বিষয়ে অবিশ্বাস রাখে তার শ্রম বিফলে যাবে এবং পরকালে সে ক্ষতিগ্রস্থ হবে”। (সূরা মায়িদা-৫)।

আল্লাহ তাআলা আরো বলেন: “এবং যে আল্লাহর প্রতি, ও তাঁর ফিরিশ্তাদের প্রতি, তাঁর কিতাব সমূহের প্রতি, এবং রাসূলগণের প্রতি ও কেয়ামত দিবসের প্রতি, বিশ্বাস স্থাপন করেনা তারা চরম পথভ্রষ্ট হয়ে পড়বে। (সূরা আন-নিসা, আয়াত-১৩৬)

মানুষ যুগে যুগে পথভ্রষ্ট হয়েছে মূলতঃ বিশুদ্ধ ঈমান ও আকীদার ক্ষেত্রে বিভ্রান্তি ঘটার কারণে। এজন্য বিষয়টি সূক্ষ্মতা ও সর্বোচ্চ গুরুত্ব সহকারে জানা অপরিহার্য। নিম্নে বিশুদ্ধ ঈমান ও ইসলামী আকীদার পরিচিতি, উৎস এবং মানব জীবনে ঈমান ও আকীদা গ্রহণের আবশ্যকতা, প্রয়োজনীয়তা, গুরুত্ব ও তাৎপর্য আলোচনা করা হলো।

ঈমানের সংজ্ঞা:

ঈমানের আভিধানিক অর্থ:  আরবী أمن (আমনুন) শব্দ থেকে ঈমান শব্দটির উৎপত্তি। এর অর্থ নিরাপত্তা, আস্থা, বিশ্বস্ততা, আশঙ্কা মুক্ত, হৃদয়ের স্থিতি ইত্যাদি। এর বিপরীত হচ্ছে ভয়-ভীতি। ঈমান শব্দের আভিধানিক অর্থ, নিরাপত্তা প্রদান, আস্থা ও বিশ্বাস স্থাপন ইত্যাদি।

ঈমানের পারিভাষিক অর্থ: পারিভাষিক অর্থে আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামা‘আতের নিকট ঈমান হলো, মূল ও শাখাসহ হৃদয়ে বিশ্বাস, মুখে স্বীকৃতি ও কর্মে বাস্তবায়নের সমন্বিত নাম।

আকীদার সংজ্ঞা:

আভিধানিক অর্থ: আকীদা একটি আরবি শব্দ। আরবি عَقْدٌ (আক্বদুন) মূলধাতু থেকে গৃহীত বা উৎপন্ন। এর শাব্দিক অর্থ শক্ত করে গিট দেওয়া, শক্ত করে বাঁধা বা শক্তভাবে আঁকড়ে ধরা।  عَقْدٌশব্দটি অন্যান্য অর্থেও ব্যাবহার হয় যেমন, দৃঢ় শপথ, প্রতিশ্রুতি ইত্যাদি। এতঃএব কোনকিছুকে শক্তভাবে আঁকড়ে ধরা বা মানুষ তার অন্তরকে কোনকিছুর সাথে দৃঢ়ভাবে বেঁধে ফেলার নামই আকীদা।

পারিভাষিক অর্থ: মানুষের সেই সুদৃঢ় বিশ্বাস ও অকাট্য কর্মধারাকে আকীদা বলা হয় যার সাথে সে তার অন্তরকে দৃঢ়ভাবে বেঁধে ফেলে বা তাকে শক্তভাবে আঁকড়ে ধরে। এবং এ ব্যাপারে তার মনে সামান্যতম সন্দেহেরও উদ্রেক হয়না।

ইসলামী আকীদার সংজ্ঞা:

ইসলামী আকীদা বলতে বুঝায়, আসমান, যমীন ও এতদুভয়ের মধ্যবর্তী সবকিছুর যিনি সৃষ্টিকর্তা সেই মহান প্রভুর প্রতি সুনিশ্চিত বিশ্বাস স্থাপন করা, তাঁর উলূহিয়্যাত, রুবূবিয়্যাত ও গুণবাচক নামসমূহকে দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করা। তাঁর ফেরেশতামন্ডলী, নবী-রাসূলগণ, তাঁদের উপর নাযিলকৃত কিতাবসমূহ, তাক্বদীরের ভাল-মন্দ এবং বিশুদ্ধ দলীল দ্বারা প্রমাণিত দ্বীনের মৌলিক বিষয় ও অদৃশ্য বিষয়াদি সম্পর্কিত সংবাদসমূহ ইত্যাদি যে সব বিষয়াদির উপর সালফে সালেহীন ঐক্যমত পোষণ করেছেন তার প্রতি সুনিশ্চিত বিশ্বাস রাখা। আল্লাহর নাযিলকৃত যাবতীয় আহকাম-নির্দেশনার প্রতি নিঃশর্ত আনুগত্য প্রদর্শন এবং রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর প্রচারিত শরীয়তের প্রতি পূর্ণ আনুগত্য ও অনুসরণ নিশ্চিত করা ইসলামী আকীদার অন্তর্ভুক্ত।

ইসলামী আকীদার বিষয়বস্তু:

ইসলামী আকীদায় প্রধানত নিম্নবর্ণিত বিষয়গুলো আলোচিত হয়েছে:

(১) التوحيد (তাওহীদ)
(২) الإيمان (ঈমান)
(৩) الغيبياتّ (গায়েবী অদৃশ্য বিষয়সমূহ)
(৪) النبواتّ (নুবুওওয়াত)
(৫) القدر (তাকদীর)
(৬) الأخبار (ওহীর মাধ্যমে প্রাপ্ত তথ্য ও সংবাদ)
(৭) أصول الأحكام القطعيةّ (অকাট্য মৌলিক বিধান)
(৮) الرد على أهل الأهواء والبدع والرد على الكفار والرد على الملل والنحل

(কুপ্রবৃত্তি ও বিদ‘আতের অনুসারী, কাফের এবং বিভিন্ন ধর্ম ও ফিরকার ভ্রান্ত আকীদার অপনোদন)।

বিশুদ্ধ ঈমান-আকীদার গুরত্ব ও তাৎপর্য:

মানুষের প্রকৃতি ও মানবজাতির ইতিহাস পর্যালোচনা করলে আমরা দেখতে পাই যে, সঠিক বিশ্বাসই মানুষের সকল সফলতা ও সৌভাগ্যের ভিত্তি। বিশ্বাসই মানুষের পরিচালিকা শক্তি। সঠিক বিশ্বাস মানুষকে মানবতার শিখরে তুলে দেয়, তার জীবনে বয়ে আনে অফুরন্ত শান্তি ও আনন্দ। আর ভুল বিশ্বাস বা কুসংস্কার মানুষের মনকে সদাব্যস্ত, অস্থির ও হতাশ করে ফেলে। আমরা এটাও জানি বিশ্বাস ও কর্মের সমন্বয় হলো ইসলাম। সঠিক বিশ্বাস বা ঈমান ইসলামের মূল ভিত্তি। আমরা যত ইবাদত বা সৎকর্ম  করি সবকিছু আল্লাহর নিকট কবুল বা গ্রহণযোগ্য হওয়ার প্রথম শর্ত শিরক ও কুফরমুক্ত বিশুদ্ধ ঈমান। আকীদা শুদ্ধ না হলে নামায, রোযা, হজ্জ, যাকাতসহ কোনো ইবাদই আল্লাহর নিকট গ্রহণযোগ্য হবে না। কুরআন করীমে বিভিন্ন স্থানে একথা বলা হয়েছে। এক স্থানে আল্লাহ্‌ বলেন:

“যদি শিরক করো তবে তোমার সকল আমল নিষ্ফল হবে এবং তুমি ক্ষতিগ্রস্তদের মধ্যে গণ্য হবে।” (সূরা যুমার-৬৫)

অন্যত্র আল্লাহ্‌  তাআলা বলেন, “এবং যে ব্যক্তি পরলৌকিক জীবনে কল্যাণ চায়, সে জন্য চেষ্টা করে এবং সে বিশ্বাসী বা মুমিন হয় তাহলে তার চেষ্টা ও কর্ম কবুল করা হবে। (সূরা বনী ইসরাঈল-১৯)

দুনিয়াতে আল্লাহর নিয়ামত ও বরকত অর্জনের এবং আল্লাহর ওয়াদাকৃত পবিত্র  জীবন লাভের শর্ত হলো সঠিক ঈমান।

আল্লাহ্‌ তাআলা বলেন: ‘‘যদি কোনো পুরুষ বা মহিলা সৎকর্ম করে এবং সে মুমিন হয়, আমি অবশ্যই তাদেরকে (দুনিয়াতে) পবিত্র জীবন দিয়ে জীবিত রাখব এবং (আখিরাতে) তাদের সর্বোত্তম কর্মের উপর ভিত্তি করে তাদের পুরষ্কার দান করব।’’ (সূরা আন-নাহল-৮৯)

আল্লাহর বন্ধুত্ব ও সন্তুষ্টি অর্জনের প্রথম ধাপই হলো বিশুদ্ধ ঈমান। আল্লাহ্‌ বলেন: “জেনে রাখ! আল্লাহ্‌র ওলীগণের কোনো ভয় নেই এবং তাঁরা চিন্তাগ্রস্তও হবে না- যারা ঈমান এনেছে এবং তাকওয়ার পথ অনুসরণ করে।” (সূরা ইউনুস-৬২, ৬৩)

কুরআনুল কারীমে ঈমান ও আকীদার গুরত্ব:

বিশ্বাস বা ধর্মবিশ্বাস বুঝাতে মুসলিম সমাজে সাধারণত দুটি শব্দ ব্যবহৃত হয়: ‘ঈমান’ ও ‘আকীদা’। কুরআনুল কারীম ও হাদীস শরীফে সর্বদা ‘ঈমান’ শব্দটিই ব্যবহার করা হয়েছে। আর ইমানদার বা বিশ্বাসী অর্থে মুমিন বা মুমিনুন শব্দ ব্যাবহার করা হয়েছে। এছাড়া ‘আকীদা’ বা অন্য কোনো শব্দ কুরআন, সুন্নাহ বা সাহাবীগণের যুগে ব্যবহৃত হয় নি। মূলত দ্বিতীয় হিজরী শতক থেকে ‘ধর্ম-বিশ্বাস’ বুঝাতে আকীদাসহ আরো কিছু পরিভাষা এ বিষয়ে পরিচিতি লাভ করে। যেমন, মহান আল্লাহ্‌ বলেন-

‘তারাই প্রকৃত মুমিন যারা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের প্রতি ঈমান আনার পরে আর কোন সন্দেহ পোষণ করে না’ (সূরা হুজুরাত-১৫)

আল্লাহ্‌ তাআলা আরও বলেন, ‘বলো, আল্লাহ যে কিতাব অবতীর্ণ করেছেন আমি তাতে বিশ্বাস করি’ (সূরা শূরা-১৫)।

অন্যত্র আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘তোমরা বলো, আমরা ঈমান রাখি আল্লাহর প্রতি এবং যা আমাদের প্রতি অবতীর্ণ হয়েছে এবং যা ইব্রাহীম, ইসমাঈল, ইসহাক, ইয়াকূব এবং তাদের বংশধরের প্রতি অবতীর্ণ হয়েছিল এবং মূসা ও ঈসা-কে যা প্রাদান করা হয়েছিল এবং অন্যান্য নবীগণকে তাদের প্রভু হ’তে যা দেয়া হয়েছিল। আমরা তাদের কারো মধ্যে পার্থক্য করি না এবং আমরা তাঁরই প্রতি আত্মসমর্পণকারী’ (সূরা আল-বাক্বারাহ-১৩৬)

সূরা কাহাফে আল্লাহ্‌ বলেন: “যে ব্যক্তি স্বীয় পালনকর্তার সঙ্গে সাক্ষাতের আশা রাখে, সে যেন সৎকর্ম করে এবং স্বীয় প্রভুর ইবাদতে অন্য কাউকে অংশীদার না করে”। (সূরা আল-কাহ্‌ফ-১১০)

আল্লাহ্‌ তাআলা আরো বলেন: ‘(হে নবী!) তোমাকে এবং এবং তোমার পূর্বসূরিদের আমি প্রত্যাদেশ করেছি যে, যদি তুমি আমার শরীক স্থাপন কর তবে তোমার যাবতীয় শ্রম বিফলে যাবে এবং তুমি ক্ষতিগ্রস্থদের অন্তর্ভুক্ত হবে’ (সূরা যুমার-৬৫)

তিনি আরো বলেন: “সুতরাং তুমি আল্লাহ্‌র আনুগত্যে বিশুদ্ধচিত্ত হয়ে তাঁর ইবাদত করো; জেনে রেখো, অবিমিশ্র দ্বীন আল্লাহ্‌রই জন্য”। (সূরা যুমার-২, ৩)

উল্লেখিত আয়াত সমূহ এবং এগুলোর ব্যাখ্যায় অসংখ্য হাদীস প্রমাণ করে যে, ঈমান ও কর্ম কেবল তখনই গ্রহণযোগ্য হবে যখন তা বিশুদ্ধ ও শির্‌কমুক্ত হবে। নবীগণ প্রথমত ও প্রধানত ঈমান-শুদ্ধির মাধ্যমে এগুলোর প্রতিই গুরুত্বারোপ করেছেন। এটাই কারণ যে, তাঁরা সর্বপ্রথম যে বিষয়টির প্রতি তাঁদের সম্প্রদায়কে আহ্বান করেছিলেন সেটি ছিলো: কেবলমাত্র আল্লাহ্‌ তাআলার ইবাদত করতে হবে এবং আল্লাহ্‌ ব্যতীত অন্য সকলের ইবাদত বর্জন করতে হবে।

হাদীসে ঈমান ও আকীদার গুরত্ব:

হাদীসে সর্বদা ‘বিশ্বাস’ বা ধর্মবিশ্বাসকে ঈমান নামেই অভিহিত করা হয়েছে। যেমন এক হাদীসে এসেছে,

عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ، قَالَ: كَانَ النَّبِيُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ بَارِزًا يَوْمًا لِلنَّاسِ، فَأَتَاهُ جِبْرِيلُ فَقَالَ: مَا الإِيمَانُ؟ قَالَ: «الإِيمَانُ أَنْ تُؤْمِنَ بِاللَّهِ وَمَلاَئِكَتِهِ، وَكُتُبِهِ، وَبِلِقَائِهِ، وَرُسُلِهِ وَتُؤْمِنَ بِالْبَعْثِ». قَالَ: مَا الإِسْلاَمُ؟ قَالَ: “الإِسْلاَمُ: أَنْ تَعْبُدَ اللَّهَ، وَلاَ تُشْرِكَ بِهِ شَيْئًا، وَتُقِيمَ الصَّلاَةَ، وَتُؤَدِّيَ الزَّكَاةَ المَفْرُوضَةَ، وَتَصُومَ رَمَضَانَ”.

আবূ হুরাইরা রা. থেকে বর্ণিত, “একদিন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম লোকজনের মধ্যে ছিলেন। এমতাবস্থায় একব্যক্তি (জিবরাঈল আ.) তাঁর নিকট আগমন করে বলেন, ঈমান কী? তিনি উত্তরে বলেন: (ঈমান এই যে,) তুমি বিশ্বাস করবে আল্লাহ্‌য়, তাঁর ফিরিশতাগণে, তাঁর পুস্তকসমূহে, তাঁর সাক্ষাতে, তাঁর রাসূলগণে এবং তুমি বিশ্বাস করবে শেষ পুনরুত্থানে এবং তুমি বিশ্বাস করবে তাকদীর বা নির্ধারণের সবকিছুতে। তিনি প্রশ্ন করেন: ইসলাম কী? তিনি বলেন: ইসলাম এই যে, তুমি আল্লাহর ইবাদত করবে, কোনো কিছুকে তাঁর সাথে শরীক বানাবে না, সালাত কায়েম করবে, ফরয যাকাত প্রদান করবে এবং রামাদানের সিয়াম পালন করবে। (সহীহ বুখারী-৫০, সহীহ মুসলিম-৯)

আরেকটি হাদীসে এসেছে: আব্দু কাইস গোত্রের প্রতিনিধিদের বিষয়ে ইবনু আব্বাস রা. বলেন,

أَمَرَهُمْ: بِالإِيمَانِ بِاللَّهِ وَحْدَهُ، قَالَ: «أَتَدْرُونَ مَا الإِيمَانُ بِاللَّهِ وَحْدَهُ» قَالُوا: اللَّهُ وَرَسُولُهُ أَعْلَمُ، قَالَ: «شَهَادَةُ أَنْ لاَ إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ وَأَنَّ مُحَمَّدًا رَسُولُ اللَّهِ.

“রাসূলুল তাদেরকে ‘একমাত্র আল্লাহর প্রতি ঈমানের’ নির্দেশ প্রদান করেন এবং বলেন, তোমরা কি জান যে, একমাত্র আল্লাহর প্রতি ঈমান কী? তাঁরা বলেন, আল্লাহ্‌ ও তাঁর রাসূলই অধিকতর অবগত আছেন। তিনি বলেন (একমাত্র আল্লাহর প্রতি ঈমান এই যে,) তুমি সাক্ষ্য প্রদান করবে যে, আল্লাহর ছাড়া কোনো মাবূদ (ইবাদত যোগ্য বা উপাস্য) কেউ নেই এবং মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁর রাসূল…। (সহীহ বুখারী-৫৩, সহীহ মুসলিম-১৫৯)

এখানে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ঈমান ও ইসলাম উভয়ের পরিচিতি প্রদান করেছেন। ইসলাম শব্দটি আরবী ‘সালাম’ (ﺴـﻠﻡ) শব্দ থেকে গৃহীত। এর অর্থ শান্তি, নিরাপত্তা, সমর্পন ইত্যাদি। আর ইসলাম অর্থ আত্মসমর্পন করা, অনুগত হওয়া ইত্যাদি। আভিধানিক ভাবে ঈমান বিশ্বাসের দিক এবং ইসলাম কর্মের দিক। তবে ব্যবহারিক ভাবে ঈমান ও ইসলাম অবিচ্ছেদ্যভাবে জড়িত। ইসলাম ছাড়া কোনো ঈমান হয় না আর ঈমান ছাড়া ইসলামের কোনো অস্তিত্ব পাওয়া যায় না। সুতরাং বলা যায় যে, ঈমান ও ইসলাম হলো, পেটের সাথে পিঠের ন্যায়। পিঠ ছাড়া যেমন পেট অচল, অচল পেট ছাড়া পিঠও। তদ্রুপই ঈমান ও ইসলাম। একটি ছাড়া আরেকটি হতে পারে না।

মানব জীবনে আকীদার প্রভাব:

মানব জীবনে সব চেয়ে বেশী প্রভাব সৃষ্টিকারী হচ্ছে ঈমান ও আকীদা। আকীদায় বিশুদ্ধ ঈমানে পরিপূর্ণ একজন নির্ভেজাল মুসলিম যে পরিমান ত্যাগ ও কঠিন কর্ম সম্পাদন করতে সক্ষম হয়, তা অন্যকারো পক্ষে সম্ভব নয়। ঈমান ও আকীদা এমন এক প্রভাবশালী দর্শন যে, যার মধ্যেই এর উপস্থিতি থাকবে সেই আলোকিত হবে, ঐশী নূরে বিকশিত হবে। একে যে আলিঙ্গন করবে সে এর রঙে রঙিন হবে। এর ফলে স্বেচ্ছাচারীতা বন্ধ হয়, সর্বক্ষেত্রে আত্মনিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হয় এবং নিজ দায়িত্ববোধ সদা জাগ্রত থাকে ইসলামি আকিদায় বিশ্বাসী মুসলিম জাতির মধ্যে প্রাতিষ্ঠানিক কর্মচাঞ্চল্যতার বৃদ্ধি ঘটে। যার প্রমাণ ঐক্যবদ্ধ প্রচেষ্টায় স্বল্পতম সময়ে বিশ্বব্যাপী ইসলামের প্রসার। সঙ্গে সঙ্গে আরবি ভাষারও বিস্তার। এ আকিদার ফলে বিশ্বব্যাপী ইসলামি সভ্যতার আন্দোলন ঘটে। যে আন্দোলনের বৈশিষ্ট্য হচ্ছে শারীরিক ও আত্মিক সাধনার মধ্যে সমন্বয় ঘটানো। ইহকাল ও পরকালের মাঝে যোগসূত্র স্থাপন করা।

আকীদা সর্ম্পকে জ্ঞানার্জনের আবশ্যকতা:

ইসলামী আকীদা সম্পর্কে জ্ঞানার্জন করা প্রতিটি মুসলিমের জন্য আবশ্যক। আকীদা বলতে কী বুঝায়, আকীদার উপর আর কী কী জনিসি নির্ভর করে, বিপরীত আকীদাগুলো কী কী, কী কারণে আকীদা নষ্ট হয় বা তাতে কমতি সৃষ্টি হয় যমেন বড় শিরক, ছোট শিরক ইত্যাদি বষিয়ে প্রতিটি মুসলিমের জানা বা শিক্ষা অর্জন করা অপরিহার্য।

আল্লাহ তাআলা বলেন: “অতঃএব, জেনে রাখো যে, আল্লাহ ছাড়া ইবাদতের উপযুক্ত আর কেউ নেই। এবং তোমার গুনাহের জন্য তার নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করো।” (সূরা মুহাম্মাদ-১৯)

ইমাম বুখারী রহ. সহীহ বুখারীতে একটি অধ্যায়ের শিরনাম রচনা করেছেন এভাবে-

بَاب الْعِلْمُ قَبْلَ الْقَوْلِ وَالْعَمَلِ

“অধ্যায়ঃ কথা বলা এবং আমল করার আগে জ্ঞানার্জন করা।” এরপর তিনি এ শিরনামের স্বপক্ষে পূর্বোক্ত আয়াতটিকে প্রমাণ হিসেবে পেশ করেছেন।

বিশুদ্ধ ঈমান-আকীদার প্রতি নবী-রাসূলদের আহবান:

আল্লাহ্‌ তাআলা যুগে যুগে পৃথিবীতে যতো নবী-রাসূল পাঠিয়েছেন তাদের সকলের সবচেয়ে গুরত্বপূর্ণ ও প্রধানতম দায়িত্ব ছিলো মানুষকে তাঁরই একাত্মবাদ তথা তাওহীদের প্রতি দাওয়াত দেওয়া, যা ঈমান ও আকীদারই অন্যতম প্রধান বিষয়। পবিত্র কুরআনের বিভিন্ন জায়গায় এ সংক্রান্ত বহু আয়াত রয়েছে, যেমন  আল্লাহ্‌ তাআলা বলেন,

“আর নিশচয়ই আমি প্রত্যেক সম্প্রদায়ের মধ্যেই একজন করে রাসূল প্রেরণ করেছি (এই মর্মে যে,) তোমরা আল্লাহর এবাদত করো এবং তাগুত থেকে দূরে থাকো”। (সূরা আন-নাহল-৩৬)

অন্যত্র আল্লাহ্‌ তাআলা বলেন, “আপনার পূর্বে আমি যে রাসূলই প্রেরণ করেছি, তাকে এ আদেশই প্রেরণ করেছি যে, আমি ব্যতীত অন্য কোন উপাস্য নেই। সুতরাং আমারই এবাদত করো” (সূরা আল-আম্বিয়া-২৫)

আল্লাহ্‌ তাআলা বলেন, “নিশ্চয় আমি নূহকে তার সম্প্রদায়ের প্রতি পাঠিয়েছি। সে বলল, হে আমার সম্প্রদায়, তোমরা আল্লাহর এবাদত কর। তিনি ব্যতীত তোমাদের কোন উপাস্য নেই”। (সূরা আল-আর’আফ-৫৯)

অন্যত্র তিনি বলেন, “তিনি ফেরেশতাদের আপন নির্দেশে ওহী দিয়ে নাযিল করেন তাঁর বান্দাদের মধ্যে যাকে ইচ্ছা তার প্রতি, যেন তোমরা সতর্ক করো যে, আমি ছাড়া কোনো ইলাহ নেই। অতএব, তোমরা আমাকে ভয় করো”। ((সূরা আন-নাহল-২)

মহান আল্লাহ্‌ তাআলা পবিত্র কুরাআনুল কারীমে বেশ কয়েকজন নবী-রাসূলের দাওয়াতের বক্তব্যকে উল্লেখ করেছেন। এ সকল বক্তব্যের সারমর্মও কেবল তাওহীদ তথা এক আল্লাহ্‌র প্রতি ঈমান ও আকীদাকেই নির্দেশ করে। যেমন আল্লাহ্‌ তাআলা নূহ আলাইহিস সালামের বক্তব্য উল্লেখ করতে গিয়ে বলেন, “আমি নুহকে তাঁর কওমের নিকট প্রেরণ করেছি। অতপর সে বলল, হে আমার সম্প্রদায় তোমরা আল্লাহ্‌র ইবাদত করো। তিনি ছাড়া তোমাদের কোনো ইলাহ নেই”। (সূরা আল-আর’আফ-৫৯)

হুদ আলাইহিস সালামের বক্তব্য উল্লেখ করতে গিয়ে আল্লাহ্‌ তাআলা বলেন, “আদ সম্প্রদায়ের কাছে প্রেরণ করেছি তাদের ভাই হুদকে। সে বলল, হে আমার সম্প্রদায়, তোমরা আল্লাহর এবাদত করো। তিনি ব্যতিত তোমাদের কোনো উপাস্য নেই”। (সূরা আল-আর’আফ-৬৫)

সালেহ আলাইহিস সালামের বক্তব্য উল্লেখ করতে গিয়ে আল্লাহ্‌ তাআলা বলেন, “সামুদ সম্প্রদায়ের কাছে প্রেরণ করেছি তাদের ভাই সালেহকে। সে বলল, হে আমার সম্প্রদায়, তোমরা আল্লাহর এবাদত করো। তিনি ব্যতিত তোমাদের কোনো উপাস্য নে… (সূরা আল-আর’আফ-৭৩)

শোয়াইব আলাইহিস সালামের বক্তব্য উল্লেখ করতে গিয়ে আল্লাহ্‌ তাআলা বলেন, “আমি মাদায়েনবাসীর প্রতি তাদের ভাই শোয়াইবকে প্রেরণ করেছি। সে বলল, হে আমার সম্প্রদায়! তোমরা আল্লাহর এবাদত করো। তিনি ব্যতীত তোমাদের কোনো উপাস্য নেই”। (সূরা আল-আর’আফ-৮৫)

ইবরাহীম আলাইহিস সালামের বক্তব্য উল্লেখ করতে গিয়ে আল্লাহ্‌ তাআলা বলেন, “আর (স্মরণ করো) ইবরাহীমকে, যখন সে তাঁর কওমকে বলেছিলো, তোমরা আল্লাহ্‌র ইবাদত করো এবং তাঁর তাকওয়া অবলম্বন করো”। (সূরা আল-আনকাবূত-১৬)

লেখক: মুফতি যাকারিয়্যা মাহমূদ মাদানী
বি.এ. অনার্স, এম.এ, এমফিল (ইসলামী আইন, বিচার ব্যবস্থা ও রাষ্ট্র বিজ্ঞান): মদীনা বিশ্ববিদ্যালয়, সৌদি আরব।
বি.এ. অনার্স (আরবি ভাষা ও সাহিত্য): আন্তর্জাতিক ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় চট্টগ্রাম (IIUC)।
প্রধান গবেষক: আস-সুন্নাহ ফাউন্ডেশন , ঢাকা।
পরিচালক: ভয়েস অব ইসলাম।
সম্পাদক ও প্রকাশক: ডেইলি মাই নিউজ ও প্রবাসীকাল ডটকম।
jakariyamahmud@gmail.com

আরও পোস্ট

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

Back to top button
Close