শিশুদের প্রতি নবীজীর মমতা

রাইয়ান বিন লুৎফর রহমান

নবীজী শিশুদের অনেক ভালবাসতেন, অনেক আদর করতেন। তিনি শিশুদের মাথায় হাত বুলিয়ে দিতেন, কোলে তুলে নিতেন। তাদের জন্য দুআ করতেন। শিশুরাও নবীজীকে অনেক আপন মনে করত। তাঁকে ঘোড়া বানিয়ে খেলা করত। কাঁধে চড়ত, পিঠে চড়ত। তুমি যদি নবীজীকে দেখতে তুমিও তার কোলে উঠতে চাইতে, নবীজী তোমাকেও আদর করে কোলে তুলে নিতেন।

নবীজী নিজে যেমন শিশুদের আদর করতেন, তার উম্মতকেও বলে গেছেন- শিশুদের আদর করতে। হযরত আবু হুরাইরা রা. বলেন, নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর নাতি হাসানকে চুমু খেলেন। সেখানে আকরা ইবনে হাবিস নামে এক সাহাবী বসা ছিলেন। হাসানকে চুমু খাওয়া দেখে তিনি বললেন, আমার দশটি সন্তান রয়েছে। আমি তাদের কাউকে চুমু খাইনি। নবীজী তার দিকে তাকিয়ে বললেন, যে দয়া করে না, তার প্রতিও দয়া করা হবে না। -সহীহ বুখারী, হাদীস ৫৬৫১; সহীহ মুসলিম, হাদীস ৬৫; সুনানে আবু দাউদ, হাদীস ৫২১৯

আরেক হাদীসে আম্মাজান আয়েশা রা. বলেন, এক গ্রাম্যব্যক্তি নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে আসল। নবীজী তাকে বললেন, তোমরা কি তোমাদের শিশুদেরকে চুমু খাও? সে বলল, আমরা তাদেরকে চুমু দেই না। নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তোমাদের অন্তরে যদি দয়া-মায়া না থাকে তাহলে আমার কী করার আছে? -সহীহ বুখারী, হাদীস ৫৬৫২; সহীহ মুসলিম, হাদীস ৬৪

অন্য এক হাদীসে আবু হুরাইরা রা. বলেন, একবার এক ব্যক্তি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট উপস্থিত হল। লোকটির সাথে একটি শিশুও ছিল। নবীজী লোকটিকে বললেন, তুমি কি এই শিশুর প্রতি দয়া কর? সে বলল, হাঁ। নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তাহলে এই শিশুর প্রতি তুমি যতটুকু দয়া করবে তারচে বেশি আল্লাহ তোমার প্রতি দয়া করবেন। তিনি দয়ালুর মধ্যে সবচে বড় দয়ালু। -আল আদাবুল মুফরাদ, হাদীস ৩৭৭

তাহলে এ হাদীসগুলো থেকে আমরা জানতে পারলাম, যারা শিশুদের প্রতি দয়া করবে আল্লাহ তাআলা তাদের প্রতি আরো বেশি দয়া করবেন। আর যারা শিশুদের প্রতি দয়া করবে না আল্লাহও তাদের প্রতি দয়া করবেন না। সুতরাং আমার চেয়ে যে ছোট তার সাথে আমাকে দয়া করতে হবে, তাহলে আল্লাহ আমার প্রতি দয়া করবেন। আমার ছোট ভাই-বোনদের প্রতি যদি আমি দয়া করি; তাদেরকে আদর করি, তাদেরকে না মারি, তাহলে আল্লাহ আমার প্রতি দয়া করবেন।

আজ থেকেই তাহলে প্রতিজ্ঞা করি, ছোট ভাই-বোনদের বা অন্য শিশুদের প্রতি দয়া করব, কখনো তাদের গায়ে হাত তুলবো না।

ছোটদের প্রতি দয়া না করলে নবীজী অনেক রাগ করতেন। হযরত উবাদাহ ইবনে ছামিত রা. বলেন, নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন, ঐ ব্যক্তি আমার উম্মতের অন্তর্ভুক্ত নয় যে আমাদের বড়কে সম্মান করে না এবং আমাদের ছোটকে দয়া করে না এবং আমাদের আলিমের হক রক্ষা করে না। -মুসনাদে আহমাদ, হাদীস ২২৬৫৪

ছোটদের প্রতি দয়া না করলে, নবীজী বলেছেন, সে আমার উম্মতের অন্তর্ভুক্ত নয়। কত বড় কথা!

আমাদের ভাই-বোন, আত্মীয়-স্বজন ছাড়াও কিন্তু আরো ছোট মানুষ আমাদের বাসায় থাকে। যেমন ছোট কাজের মেয়ে বা কাজের মানুষের ছোট সন্তান। আমরা কিন্তু অনেক সময় তাদের সাথে খারাপ আচরণ করি, তাদের গায়ে হাত তুলি। অথচ নবীজী বলেছেন, যে ছোটর প্রতি দয়া করে না সে আমার উম্মতের অন্তর্ভুক্ত নয়। সুতরাং আর কখনো এমনটি করবে না।

আনাস রা. নবীজীর খেদমত করতেন, কিন্তু নবীজী কখনো তার গায়ে হাত তোলেননি, এমনকি কখনো এমন কথাও বলেননি যে, আনাস! তুমি এই কাজটি কেন করেছ, আর ঐ কাজটি কেন করনি। অথচ আমরা পানি আনতে একটু দেরি হলেই আমার মত ছোট্ট কাজের মানুষের সাথে কত খারাপ ব্যবহার করি।

উপরের হাদীসে কি আরেকটি বিষয় খেয়াল করেছ? নবীজী বলেছেন, যে বড়র সম্মান করে না, আলেমের হক আদায় করে না, সেও আমার উম্মতের অন্তর্ভুক্ত নয়। তাহলে বড়দের সাথেও আমরা কখনো খারাপ আচরণ করবো না। বড়দের কথা শুনবো, আলেমের সম্মান করব।

ছোট বড়কে সালাম দিবে, এটাই নিয়ম। কিন্তু এর অর্থ এই নয় যে, বড়রা ছোটদের সালাম দিবে না। নবীজী সবার বড়, কিন্তু তিনি নিজে ছোটদের সালাম দিতেন। আমরা সব সময় চেষ্টা করব বড়কে আগে আগে সালাম দিতে। সাথে সাথে আমি আমার ছোটকেও সালাম দিব। আমি যদি ছোটকে সালাম না দিই তাহলে সে কার কাছ থেকে সালাম দেওয়া শিখবে? আনাস রা. বলেছেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন আনসারদের সাথে সাক্ষাৎ করতে যেতেন তখন তাদের শিশুদের সালাম দিতেন। মাথায় হাত বুলিয়ে দিতেন এবং তাদের জন্য দুআ করতেন। -সুনানে কুবরা নাসাঈ, হাদীস ৮২৯১; সহীহ ইবনে হিব্বান, হাদীস ৪৫১

আরেক হাদীসে হযরত ইউসুফ ইবনে আব্দুল্লাহ রা. বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম  (শৈশবে) আমার নাম ইউসুফ রেখেছেন। তিনি আমাকে তাঁর কোলে বসিয়েছেন এবং আমার মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়েছেন। -আল আদাবুল মুফরাদ, হাদীস ৩৬৭

নামাযের মত মহান ইবাদতেও রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম শিশুদের প্রতি খেয়াল রাখতেন। তিনি বলেন, আমি কখনো নামায দীর্ঘ করার ইচ্ছা করি। কিন্তু কোনো শিশুর কান্নার আওয়াজ শুনে নামায সংক্ষিপ্ত করে ফেলি। কেননা বাচ্চার কান্নার কারণে মায়ের কষ্ট 

হয়। -সহীহ বুখারী, হাদীস ৬৭৭; সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদীস ১৬১০; সহীহ ইবনে খুযায়মা ৯৮৯’ সুনানে ইবনে মাজাহ ৯৮৯; সহীহ ইবনে হিব্বান, হাদীস ২১৩৯

আবার এমন ঘটনাও ঘটেছে, রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সিজদায় গিয়েছেন আর হাসান বা হুসাইন রা. তাঁর পিঠে চড়ে বসেছেন। ফলে তিনি দীর্ঘ সময় সিজদায় থাকতেন। (অপেক্ষা করতেন কখন তারা পিঠ থেকে নামবে)। -সুনানে নাসাঈ, হাদীস ১১৪১; মুসনাদে আহমাদ, হাদীস ২৭৬৮৮; মুসতাদরাকে হাকেম, হাদীস ৪৭৭৫

হাদীসের কিতাবে আরো অনেক ঘটনা আছে। একদিনে তো সব ঘটনা বলা সম্ভব না। আজ এটুকুই থাক। তবে মনে রাখতে হবে আমার যারা বড় তাদের সম্মান করব। আর আমার থেকে যারা ছোট তাদের সাথে ভালো ব্যবহার করব, আদর করব। আর নবীজী যেমন আমাদের ভালোবাসতেন আমরাও নবীজীকে ভালোবাসবো, নবীজীর সুন্নতকে ভালোবাসবো।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

Back to top button
Close