স্বপ্ন ও সুদৃঢ় সিদ্ধান্তই সাফল্যের রহস্য

প্রকৃত অর্থে আমরা কেউ কখনো একটি অট্টালিকা বানাই না। আর বানাই না একটি ভবন বা ছোট্ট একটি বাড়ীও। আর না তা আমরা বানাতে পারি! বস্তুত আমরা একটি ইটের সাথে আরেকটি ইট জোড়া লাগাই। পাথরকণা বা ইটের সুরকির সাথে সিমেন্ট-বালু মিশিয়ে রডের সাথে সম্মিলন ঘটিয়ে চির বন্ধনে ওদের একাকার করে দেই। এভাবেই বন্ধন ও জোড়া লাগতে লাগতে এক সময় একটি মনোরম অট্টালিকা হয়ে যায়। হয়ে যায় সুন্দর ও দৃষ্টিনন্দন একটি সুরম্য ভবন কিংবা বিল্ডিং বাড়ী। আর এভাবেই কিছু সুরম্য স্থাপনার সমন্বয়ে গড়ে ওঠে একটি সুবিশাল রাজ প্রাসাদ।

আমরা একটি ফুলের বাগান গড়ে তুলতে পারিনা। আর না পারি একটি পুষ্পোদ্যান বানাতে! আমারা তো কেবল একটি একটি করে চারা লাগিয়ে যাই। গোলাপ, জবা, টগর, বেলী…। একটার পর একটা সযতনে বুনে যাই। এভাবে একসময় একটি মোহনীয় মনোমুগ্ধকর চমৎকার বাগান হয়ে যায়। সুভাস ছড়ায়। নানা ফুলের সুতীব্র সুঘ্রাণে আন্দোলিত করে তার চারিদিক।

আমরা একটি গাড়ী একসাথে কখনোও বানাতে পারি না। আমরা কিছু পার্স তৈরি করি। কিছু স্ক্রুর সহায়তায় এগুলোকে একটির সাথে আরেকটির জোড়া লাগিয়ে দেই। ব্যস একটি গাড়ী হয়ে যায়। এখানেও সেই জোড়াই!

আমরা কেউ একটি পরিবার গড়তে পারিনা। বস্তুত আমরা একটি জীবনের সঙ্গে আরেকটি জীবনের জোড়া লাগিয়ে দেই। হয়ে যায় একটি পরিবার। জোড়া এখানেও।

দেখুন আমরা কেউ একটি গল্পও রচনা করতে পারি না। আর পারি না কোনো বইও লিখতে! আমরা কেবল একের পর এক ক্রমান্বয়ে কিছু শব্দ লিখে যাই, কিছু শব্দকে জোড়া লাগিয়ে বাক্য বানাই। ব্যাস সুন্দর একটি গল্প হয়ে যায়। আর টেকসই শব্দের গাঁথুনিতে একসময় হয়ে যায় একটি অনবদ্য অনন্য বই বা কালের পরিক্রমায় অবিস্মরণীয় কিংবা ঐতিহাসিক কোনো গ্রন্থ। এখানেও আমরা জোড়ার কাজটাই করি।

ঠিক তদ্রূপই আমরা কেউই মায়ের পেট থেকেই আলেম, ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, উকিল, ব্যারিস্টার হয়ে জগতে আসি না। আর না এটি সম্ভব। আমরা তো কেবল পাঠশালায় কিছু পাঠের তালিম নেই। বিদ্যালয় থেকে নেই কিছু বিদ্যা। কিছু সেমিষ্টার, কিছু ইয়ার আমরা অধ্যয়ন করি, মাঝে শেষ করি কিছু কোর্স। সময়ের সঙে সময়ের সন্ধি করে দেই এখানেও। এভাবে আমরা একসময় হয়ে যাই কাংখিত আলেম, স্কলার, ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, উকিল, ব্যারিস্টার ইত্যাদী।

প্রিয় ভাই ও বোন আমার!
জীবনটাও এমনই। এ জীবনের পরতে পরতে রয়েছে কেবলই জোড়া। আর জোড়ার এই জীবনে একের পর ইট গেথেই যেতে হয়। কাংখিত বস্তুগুলোকে জোড়া লাগিয়েই যেতে হয় বারবার। তবে এক্ষেত্রে খেয়াল রাখতে হয়, গাথুনিগুলো টেকসই ও মজবুত হচ্ছে কি না। তাই ভীমে বাশঁ নয়, রডই ব্যবহার করুন। পিলারে ইট নয় সম্ভব হলে পাথর ব্যবহার করুন। কেননা মজবুত ভিত্তিই মাথা উঁচু করে দৃঢ়ভাবে দাড়িয়ে থাকতে পারে। কমজোর ও দূর্বল ভিত্তির কিছু বেশিদিন টিকে না, গড়িয়ে পরে, সময়ের কশাঘাতে অসময়ে নিশেষ হয়ে যায়। মনে রাখুন, যার ফাউন্ডেশন যত শক্ত তার অবস্থান ততো দৃঢ়। যর অবস্থান যত দৃঢ় সে ততো সফল। ততো আলোকোজ্জ্বল, উদ্ভাসিত।

হয়তো আপনি এখন ভাবছেন এসব তাত্ত্বিক কথার কী ভেলু আছে? এসব তো কেবল কিছু কথার কথা। কীভাবে জীবনে এই জোড়াতত্ত্ব কাজ করতে পারে? তাহলে শুনুন-

জোড়াতত্ত্বের এই হিসাবটা একেবারেই সোজা। আপনার প্রথম করণীয় হলো, মনের ভিতরে একটি সুন্দর স্বপ্নের কল্পিত আল্পনার বীজ বপন। একটি গ্রিন ড্রিমের চেতনা লালন। এবং এরই আলোকে যুগোপযোগী, বাস্তব ভিত্তিক একটি চমৎকার সিদ্ধান্ত গ্রহণ। অর্থাৎ আপনি ভবিষ্যতে কী হতে চান বা কী করতে চান এসম্পর্কে আপনি সিরিয়াসলি একটি ক্লিয়ার ডিসিশন নিবেন। যদি সফল হতে চান তবে আপনাকে একটি দৃঢ় সিদ্ধান্ত নিতেই হবে। এটিই আপনার প্রথম কাজ। আপনার মনে রাখা উচিত যে, জগতের সবকিছুই মানুষই করেছে। সবাই ছোট থেকেই বড় হয়েছে। সবাই আপনার মতোই মানুষ। তাই শুরু করেই দেখুন না পারেন কি না। দেখুন না কি হয়।

হ্যাঁ এটা ঠিক যে, আপনি হয়তো সব পারবেন না, কিন্তু তার মানে এই নয় যে, আপনি কিছুই পারবেন না। বিশ্বাস রাখুন নিজের প্রতি যে, আপনিও অনেক কিছু পারেন। আপনার মধ্যেও মেধা, মনন, প্রতিভা, নতুন নতুন সৃষ্টির প্রেরণা ও সৃজনশীলতা রয়েছে। কোন কাজে হেরে গেলে ভাবুন পৃথিবীর কোন মানুষই জগতের সব কিছু পারেনা। আর না তা কখনো সম্ভব। এ একমাত্র মহান আল্লাহ্‌রই গুণ। তিনি সবকিছুই পারেন। তিনি মহা শক্তির মহা আঁধার। জীবনের সর্বক্ষেত্রেই এই কথাগুলো স্মরণ রাখুন। যেখানে হেরে যাবেন সেখান থেকেই আবারো নতুন করে শুরু করুন। দমে যাবেন না। দমে গেলেন তো পরে গেলেন, পরে গেলেন তো থেমে গেলেন, থেমে গলেন তো হেরে গেলেন। আর নিশ্চয়ই আপনি কখনও হারতে চান না। তাই ভালো কিছুর সিদ্ধান্ত নিন। এগিয়ে স্বপ্ন বাস্তবায়নের পথে অবিচল ভাবে। ভয়কে জয় করুন। জয়কে উপভোগ করুন।

দ্বিতীয় কাজ হলো, আপনি যদি কোন কিছু ব্যাপারে ফুল ডিসিশন নিতে সক্ষম হন, তবে এবার আপনি আপনার কাংখিত স্বপ্নের ব্যাপারে আল্লাহ্‌র প্রতি পূর্ণ ভরসা রাখুন।

মহান আল্লাহ্‌ বলেন, فَإِذَا عَزَمْتَ فَتَوَكَّلْ عَلَى اللَّهِ إِنَّ اللَّهَ يُحِبُّ الْمُتَوَكِّلِينَ
“যখন তুমি দৃঢ়ভাবে ইচ্ছা করবে, তখন আল্লাহর উপর ভরসা করবে। নিশ্চয় আল্লাহ্ ভরসা কারীদের ভালবাসেন”। (আল ইমরান-১৫৯)।

আল্লাহ তাআলা আরও বলেন: وَمَنْ يَتَوَكَّلْ عَلَى اللَّهِ فَهُوَ حَسْبُهُ
“যে ব্যক্তি আল্লাহর উপর ভরসা করবে, তিনিই তার জন্য যথেষ্ট হবেন।” (সূরা ত্বলাক-৩)।

আপনার তৃতীয় কাজ হলো সবর ও সালাতের মাধ্যমে এবার মাঠে নেমে পড়া। অর্থাৎ এবার আপনি শুরু করে দিন। ব্যবসা, উদ্যোগ, শিক্ষা আপনি যা করতে চান সেটাকে গুরুত্ব দিন। কাজে মনোযোগ দিন। ভিশনকে মিশন হিসাবে নিন। স্বপ্নকে আপন মনে করে একাগ্রচিত্তে এগিয়ে যান।

মহান আল্লাহ্‌ বলেন, “যখন নামায শেষ হবে, তখন তোমরা রিজিকের সন্ধানে জমিনে ছড়িয়ে পড়ো”
(সূরা আল জুমা)।

রাসূলুল্লাহ সাল্লালাহু আহাইহি ওয়াসালাম বলেন, “তোমরা যদি সঠিকভাবে আল্লাহর উপর তাওয়াক্কুল করতে তবে তিনি তোমাদেরকে রিযিক দান করতেন- যেমন পাখিকে রিযিক দান করে থাকেন- তারা খালি পেটে সকালে বের হয় এবং পেট ভর্তি হয়ে রাতে ফিরে আসে”। (আহমাদ, তিরমিযী, নাসাঈ ও ইবনু মাজাহ্)।

আপানর চতুর্থ কাজ হল, একই সাথে অনেক কাজ করার চিন্তা করবেন না। কারণ যখন একাধিক বা অনেকগুলো কাজ একসঙ্গে হাতে নেওয়া হয় তখন কোন কাজেই ভালোভাবে মনযোগ দেয়া সম্ভব হয় না। ফলে কোন কাজই পরিপূর্ণতা পায়না। বৃথা যায় শ্রম, সময় ও অর্থ।

আপনার পঞ্চম কাজ হল, সবসময় পজিটিভ বা ইতিবাচক লোকদের সাথে চলুন। তাদের সাথে ভাবনা শেয়ার করুন। পরামর্শ নিন। কখনোই নেতিবাচক চিন্তাধারার মানুষের সঙ্গে চলবেন না। চাই আপনার যত কাছের মানুষই হোক না কেন। সচেতনভাবে তাদের পরিহার করুন। এটি একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

নেতিবাচক লোকেরা আপনার মধ্যে হতাশা ছড়াবে। আপানাকে মানসিকভাবে দুর্বল করে তুলবে। জগতের সবখানেই এ ধরণের লোকজন সাফল্যের পথে সবচেয়ে বড় অন্তরায়। এরা খুব দুর্বল প্রকৃতির মানুষ। এদের ভাবনা শক্তি খুবই ক্ষীণ। মনোবল খুবই দুর্বল। আপনি চিন্তা ভাবনা করে সুন্দর একটি ভাবানাকে ঘুছিয়ে আনবেন। তারা সেটাকে সমূলে ধ্বংস করে করে দিবে। যেটাকে আপনি সম্ভব বলে মনে করছেন তারা সেটাকে আপনার কাছে অসম্ভব মনে করাবে। বস্তুত এরা না নিজেরা ভালো কিছু করতে পারে আর না অন্যকে ভালো কিছু করতে দেয়। না নিজেরা সফল হয় না অন্যকে সফল হতে দেয়।

হ্যাঁ এখানে আমি আপনাকে এখানে এলেখার শুরুর কথাগুলো আবারো একবার স্বরণ করিয়ে দিতে চাই। আপনি বিল্ডিং, গাড়ী ও তার পরের দৃষ্টান্তগুলো স্বরন করুন। কি কিছু বুঝতে পারছেন? অর্থাৎ এখানে আপনাকে ধৈর্য ধরতে হবে। ধরেই যেমন বাড়ী-গাড়ী হয়না, ঠিক এখানেও ধরেই সাকসেস হওয়ার স্বপ্ন দেখবেন না। একটু সময় তো লাগবেই বৈ কি! ফল খেতে হলে তো গাছের পরিচর্যা লাগবেই, তাই নয় কি? সুতরাং কাজ চালিয়ে যান। হীনমান্যতায় ভুগবেন না। আল্লাহ্‌ রহমত থেকে নিরাশ হবেন না। স্বপ্ন আপনার সফল হবেই ইনশা আল্লাহ্‌।

অনেকেই অন্যদের সাথে নিজেকে তুলনা করেন। ফলে কখনো অহংকারী আবার কখনো হীনমন্ম্যতায় ভোগেন। কিন্তু সফল মানুষেরা কখনোই সেটা করেন না। তারা তুলনা করেন। তবে অন্য কারো সাথে নয়। নিজের সাথেই। আজকের আপনি আর গতকালের আপনিকে তুলনা করুন। দেখুন গতকালের ভুল থেকে একটু হলেও এরিয়ে আসতে পেরেছেন কিনা আপনি। অন্যের নয়, নিজের খুঁতগুলো বের করার চেষ্টা করুন। তাহলেই সফলতা ধরা দেবে আপনার হাতে।

আপনার লাইফে আপনি কি হতে চান, সেটা ফাইনাল করা লাগবে। ড্রিম এচিভ করার জন্য ক্রেজি হতে হবে। নিজের স্বপ্ন অর্জন করার তাড়না তীব্র করতে হবে। চাহিদা ঝাঁঝালো হলে, চেষ্টা করার প্রেরণা আপনা আপনিই চলে আসবে। তারপর একটার পর একটা ইট গাথতে পারলে, আপনারও বিল্ডিং হয়ে যাবে। আপনিও সফল হতে পারবেন।

লেখক: মুফতি যাকারিয়্যা মাহমূদ মাদানী
প্রিন্সিপাল: মানাহিল মডেল মাদরাসা, মিরপুর, ঢাকা
পরিচালক: ভয়েস অব ইসলাম ও ইসলামিক গাইডেন্স।
jakariyamahmud@gmail.com

‘আপনিও হোন ইসলামের প্রচারক’
ইসলাম প্রচারের স্বার্থে প্রবন্ধের লেখা অপরিবর্তিত  রেখে এবং উৎস উল্লেখ্য করে আপনার Facebook, Twitter, ব্লগ, বন্ধুদের Email Address সহ অন্যান্য Social Networking ওয়েবসাইটে শেয়ার করতে পারেন। মানবতার মুক্তির লক্ষ্যে ইসলামের সুমহান আলো ছড়িয়ে দিতে পারেন। “কেউ হেদায়েতের দিকে আহবান করলে যতজন তার অনুসরণ করবে প্রত্যেকের সমান সওয়াবের অধিকারী সে হবে, কিন্তু যারা অনুসরণ করেছে তাদের সওয়াবে কোনো কমতি হবে না” (সহীহ্ মুসলিম: ২৬৭৪)

এ সম্পর্কিত আরও পোস্ট

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

Back to top button